মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির – দৌলতপুর

বহু দিন ধরে’ বহু ক্রোশ দূরে

বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে

দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপরে

একটি শিশির বিন্দু।।

       ৭ই পৌষ ১৩৩৬

       শান্তিনিকেতন          শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সত্যজিৎ রায়’র খাতায় লিখে দেওয়া বিশ্বকবির এই কালজয়ী বাণী সবার মতো আমিও পড়েছি বহুবার, তবে বুঝতেই পারছেন গোবেচারা এই আমি গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিন গুজরান করছিলাম। যখন বোধোদয় হলো তখন বেলায় বেলায় দিন গড়িয়েছে অনেক…

প্রিয় বন্ধুর সাথে এক পশলা আড্ডা মেরে, রাতে শান্তির ঘুম ঘুমিয়ে আরো এক রাত পার করে সকালে একটি ‘শ্বতশ্চলরিক্সা’ (আজকাল রিক্সার সাথে মোটর জুড়ে যে গতিময় বাহন, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর Automobile এর বাংলা তরজমা করেছিলেন ‘শ্বতশ্চলশকট’, সেখান থেকে অনুকরণ করা) নিয়ে রওনা হলাম বাড়ির পিছনের মহল্লা – মহেশ্বরপাশা।

মহেশ্বরপাশা প্রাচীন এক গ্রাম যা সুদূর অতীতে সুন্দরবনের অংশ ছিল। স্থানীয় কোন এক জমিদার তার মহেশ্বর নামের কর্মচারীকে এখানে আবাদ করতে পাঠায়। বর্তমানে খুলনা শহরের স্টীমার ঘাটে যে বট গাছ ছিল তা দক্ষিণ সীমানা, পশ্চিমে আড়ং ঘাটার বট গাছ, উত্তরে টিবি হাসপাতাল ও পূর্ব সীমানা ভৈরব নদ পর্যন্ত এলাকায় জঙ্গল পরিষ্কার করে মহেশ্বর আবাদি জমিতে রূপান্তর করে। ক্রমে এই অঞ্চল তার নামে ‘মহেশ্বরপাশা’ নাম ধারন করে। তবে এই তথ্যের কোনো প্রামাণিক দলিল নেই, কেবলই লোকশ্রূতি।

জঙ্গল পরিষ্কার, আবাদ করা ইত্যাদি আয়োজনে মহেশ্বরের সাথে নিশ্চই আরো অনেক মানুষজন তার কাফেলায় সামিল হয়েছিল। তারা এখানেই পর্যায়ক্রমে থিতু হয়, বসতি গড়ে তোলে। স্থানটি বসতি-বান্ধব হলে একে একে অন্যান্যরাও আসতে থাকেন। এভাবে মল্লিক বংশীয় একটি পরিবারও এখানে এসে বসতি গাড়েন। তার পরিবারের কল্যাণে সেস্থানের নাম হয় মল্লিকপাড়া – আজও সেখানে তার বংশধররা বসবাস করছেন। বাংলা যখন নবাবী শাসনের (১৭০৭ – ১৭৫৭ খ্রীঃ) যাতাকলে পিষ্ট, তখন এই পরিবারের গোপীনাথ মল্লিক নবাবের কাচারীতে চাকরী করতেন। নবাবী মসনদে তখন মীর্জা মুহম্মদ আলী যিনি নবাব আলীবর্দী খাঁ (রাজত্বকাল ২৯ এপ্রিল ১৭৪০ – ০৯ এপ্রিল ১৭৫৬ খ্রীঃ) নামেই আমাদের কাছে বেশী পরিচিত। গোপীনাথ মল্লিক নবাবের কর্মচারী হবার সুবাধে যথেষ্ট অর্থকড়ি উপার্জন করেন এবং আশেপাশের জমিদারদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

গোপীনাথ মল্লিক সম্ভবতঃ বৈষ্ণব ধর্মের অনুরাগী হয়ে পড়েন এবং বৈষ্ণবগুরুর উপাধি ধারন করে গোপীনাথ গোস্বামী বলে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ক্রমে তিনি একজন মহান সাধকে পরিনত হন এবং সেই সময় যশোরের বিখ্যাত চাঁচড়ার জমিদার তাকে একটি মন্দির নির্মাণে অনুরোধ করেন। ফলশ্রূতিতে তিনি মল্লিকপাড়ায় ১৭৪৯ খ্রীঃ একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, সেই মন্দিরই আজকের ‘মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির’। গোপীনাথ গোস্বামী মন্দিরে গোবিন্দ রায়-এর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেবতার প্রতি তার নৈবেদ্য ও পরবর্তী প্রজম্মের উপাসনার মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করেন। ২৬৯ বছরের প্রাচীন মন্দিরটি আজ খুলনা অঞ্চলের এক অনবদ্য প্রত্ন-নিদর্শন।

মন্দিরটি একটি বর্গাকার মঞ্চের উপর স্থাপিত, ভূমি থেকে এর উচ্চতা ০.৯১ মিটার ও প্রতিবাহুর দৈর্ঘ্য ৭.০১ মিটার। মঞ্চের ভূমির উপর পূর্ব-পশ্চিমে আরেকটি দেওয়াল উঠিয়ে পুরো মন্দিরটিকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। উত্তরের ঘরটি গর্ভগৃহ আর দক্ষিণের ঘরটি বারান্দা। এই বিভাজক দেওয়ালের পুরুত্ব ১.০৭ মিটার, গর্ভগৃহের আয়তনঃ দৈর্ঘ্য ৫.৪৫ মিটার ও প্রস্থ ২.২৯ মিটার এবং বারান্দার আয়তনঃ দৈর্ঘ্য ৫.৪৫ মিটার ও প্রস্থ ১.৫২ মিটার। গর্ভগৃহের উত্তর দেওয়ালের মাঝখানে বেদীর উপর রাধা-কৃষ্ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। স্থানীয় পাথরের তৈরী বিগ্রহটিতে এক সময় সোনার অংলকার ও মুকুট শোভা পেত। এখনো দেবতার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন ৩ বার পূঁজা নিবেদন করা হয়। বারান্দা ও গর্ভগৃহের পূর্ব ও পশ্চিম দেওয়ালে এক জোড়া করে কারুকাজময় কুলুঙ্গী রয়েছে। মন্দিরের পূর্বদিকের বাহিরের দেওয়ালে যে আগুনে পোড়ানো মৃৎলিপিটি রয়েছে সেখান থেকে স্থাপনার নির্মাণ তারিখ ও নির্মাতার নাম জানা যায়। লিপিফলকের দু’টি অংশের একটি কখন যে হারিয়ে/নষ্ট হয়ে গেছে তা কেউ বলতে পারেন না। কুলুঙ্গি আকারের একটি খোপের ভিতর লিপিফলকটির বাকী অংশ এখনো দেখতে পাওয়া যায়।

মন্দিরটি দক্ষিণমুখী আর প্রবেশের জন্য ৩টি খিলানাকৃতির প্রবেশপথ রয়েছে। খিলানগুলো চারকোণাকার, সূচাঁলু ও অলংকার সম্মৃদ্ধ। খিলানসমূহের বিপরীতে বিভাজক দেওয়ালের মাঝখানে গর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য একটি দরজা ও পাশের দু’টিতে জানালা রয়েছে। গর্ভগৃহের উত্তর-পশ্চিম কোণায় একটি খিড়কি দরজা রয়েছে যা ব্যবহার করে উত্তর দিক হতে মন্দিরে প্রবেশ কিংবা বের হওয়া যায়। দরজা ও জানালা কাঠ দ্বারা নির্মিত ছিল। খিড়কি দরজার বাহিরের দিকে পশ্চিম পাশে ছোট আরেকটি কুলুঙ্গি আছে। বাংলার ঐতিহ্যময় কুঁড়েঘরের আদলে মন্দিরের উপর ধনুকের মতো বাঁকা কার্ণিশযুক্ত ২টি দোচালা ছাদ ছিল – তাই এটি জোড়বাংলা মন্দির। জোড়বাংলা বা জরূবাংলা স্থাপত্যে ৪টি চাল থাকে। ইমারতটিকে শক্ত, মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে ২টি দোচালা পাশাপাশি জোড়া দেওয়া থাকে এবং যার একটি সাধারনত বারান্দা আর অপরটি গর্ভগৃহ হয় – এখানেও সেই স্থাপত্যরীতিই অনুসৃত হয়েছে। ইট-চুন-সুরকীর গাঁথুনীতে মন্দিরের কাঠামো নির্মিত। ছাদের উপরে বহু গোলকযুক্ত ফিনিয়াল দন্ড, ত্রিশূল ও কলশ সংযোজিত ছিল।

মন্দিরটি বাংলার মধ্যযুগের এক অনন্য স্থাপত্য কীর্তি। মন্দিরের সামনের দিকের দেওয়াল সুদৃশ্য টেরাকোটার ফলকে আবৃত। খিলানসমূহে অলংকৃত ইটের ‘বহুফলা খাঁজকাটা নকশা’ যেমন রয়েছে তেমনি এর স্প্যানড্রেলে ব্যবহৃত টেরাকোটার অলংকার অসাধারন কারুকাজে সম্মৃদ্ধ। মাঝের খিলানটিতে রাম ও রাবনের যুদ্ধ কাহিনী আর পাশের দু’টিতে নগ্ন নারী, রাজপুরুষ, ছুটন্ত ঘোড়-সওয়ার ও সশস্ত্র যোদ্ধাদের অপরূপ চিত্রফলক খিলানগুলোকে আকর্ষনীয় করে তুলেছে। টেরাকোটার চিত্রফলকে প্রাণীর চিত্র যেমনঃ ময়ূর, ঘোড়া, গরু/মহিষ ইত্যাদি স্থান পেয়েছে। ফুল ও লতাপাতার নকশা, জ্যামিতিক ক্যারিকেচার ও নকশা করা ইটের পাশাপাশি রং-এর বাহারী ব্যবহারও দেখতে পাওয়া যায়। পুরো মন্দির জুড়ে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির সমাজ ও রোজকার দিনের নানান কাজকর্ম সুনিপুনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফলে দেশীয় লোকজ সংস্কৃতির সহজাত বৈশিষ্ট্য অত্যন্ত চমৎকারভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তবে সামনের দেওয়াল ছাড়া বাকী দেওয়ালগুলো সাধারন পলেস্তরা করা ও কোনো কারুকাজ নেই।

গোপীনাথ গোস্বামী’র পর একে একে বংশ পরম্পরায় শান্তিগোপাল মল্লিক, ভবনাথ মল্লিক, রাখালনাথ মল্লিক, যশোনাথ মল্লিক হয়ে এখন হারাধন মল্লিক ও তার উত্তরসূরীরা পূর্ব-পুরুষের বাতি টিমটিম করে জ্বালিয়ে রেখেছে। কিন্তু বংশের সেই আভিজাত্য আর জৌলুস খুইয়ে তারা এখন যেমন প্রায় নিঃস্ব ঠিক তেমনি জীর্ণদশা মন্দিরটিরও। গোপীনাথ গোস্বামীর ১০০ একর জমি মন্দিরের ঠাকুরের নামে নিষ্কর করা ছিল – সেসব এখন কেবলই ইতিহাস। ১৯৭১ খ্রীঃ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মন্দিরের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। এরপর সম্ভবতঃ ১৯৮৮ খ্রীঃ বন্যায় মন্দিরটি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে এবং এই সময় এর বারান্দার দোচালাটি ধ্বসে পড়ে। মন্দিরটি সংষ্কার করা হয়েছিল তবে সময় মনে করতে পারলেন না হারাধন মল্লিক।

দৌলতপুর উপজেলার মহেশ্বরপাশা গ্রামের মল্লিকবাড়ির জোড়বাংলা মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভূক্ত নয়। ব্যক্তি মালিকানায় থাকায় এবং বেসরকারি ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ঐতিহ্যময় মন্দিরটি আজ জঙ্গলে আবৃত, সারা কাঠামোয় নোনা ধরা ইট, পলেস্তরা খসা গর্ভগৃহ, ভাংগা ছাদ আর চারিদিকের দৈন্যদশা নিয়ে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে অত্যন্ত জীর্ণাবস্থায় কোনো রকমে টিকে আছে। সংরক্ষণের আশু ব্যবস্থা গ্রহন করা না হলে অচিরেই যবনিকা ঘটবে বাংলার আরেকটি জোড়বাংলা মন্দিরের।

————————————————————————————————————————————————

২৯ এপ্রিল ২০১৮/

mamun.380@gmail.com

তথ্যসূত্রঃ

১. Terracotta Ornamentation in Muslim Architecture of Bengle, Muhammad Hafizullah Khan, পৃঃ ২১৫/

২. বাংলায় ভ্রমণ, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে (১৯৪০)/BANGLAY BHRAMAN, a `Travelogue on historical documents and legends by E. B. RAILWAY (1940), পৃঃ ১৩৫/

৩. বাংলাদেশের মন্দির, ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, পৃঃ ৮৩/

৪. বাংলাপিডিয়া/উইকিপিডিয়া/

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য