একুশের বইমেলা ২০১৮ ও কিছু এলোমেলো ভাবনা

আমার বই পড়ার অভ্যাস খুব ছোট বেলা থেকে। আমরা যারা গত শতাব্দীর শেষভাগে শৈশব কাটিয়েছি আবার এই শতাব্দীও দেখছি, তারা খুব ভালো করে সমাজ, দেশ, বিশ্ব সব কিছুর মধ্যে যে বড় ধরণের পরিবর্তন হয়েছে তা উপলব্ধি করতে পারি।

ছোট বেলার কিছু কথা কিছু টুকরো স্মৃতি বলে নেয়া দরকার। আমার বইয়ের হাতেখড়ি বড় ভাইয়ের হাত ধরে। বড় ভাইয়ের বই পড়ার নেশা ছিল। আমি তা দেখেই বড় হয়েছি। আমার বাবাও বই কেনা, পড়া-শুনার ব্যাপারে উৎসাহ দিতো। ছোট বেলার কিছু টুকরো স্মৃতি এখনো মনে আছে। ঢাকা সেনানিবাসে যেখানে এখন ‘বিজয় কেতন’, আগে সেখানে লাইব্রেরি ছিল। মাঝে মাঝে বাবার হাত ধরে আমরা সেখানে যেতাম, বইয়ের মধ্যে যে জ্ঞান তা জানার আকর্ষণ অনুভব করতাম। জানার আগ্রহ ছোট বেলা থেকেই ছিল।

১৯৯৬-৯৭ সালের দিকের ঘটনা। তখন ‘ঢাকা বইমেলা’ নামে একটি বই মেলা বড় করে আয়োজন করা হত। বইমেলাটি হত এখন যে জায়গায় বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার ও আর্মি মিউসিয়াম রয়েছে সে জায়গায়, মাঝে মাঝে আগারগাঁও-এর ফাঁকা জায়গায় বসতো। মেলাটি হত ডিসেম্বর মাসে। পাক্ষিক, ১-১৫ ডিসেম্বর। মেলায় শুধু দেশের নয়, বিদেশের পাব্লিকেশনের বই পাওয়া যেতো। এই মেলাও বন্ধ হয়ে গেছে অনেকদিন।

তখন ফেব্রুয়ারী মাসে একুশে বইমেলা হতো বাংলা একাডেমী চত্বরে। খুব ছোট পরিসরে। শুধু দেশের পাব্লিকেশনরাই অংশগ্রহণ করতো। প্রচার- প্রচারণা বর্তমান সময়ের মত ছিল না।

ডিসেম্বর মাস ছুটি থাকতো বলে প্রতিবারই একাধিকবার ঢাকা বই মেলায় যাওয়া হতো। আর মাঝে সাঝে ফেব্রুয়ারি মাসে একুশে বইমেলায়। বিকালে গিয়ে রাত পর্যন্ত থেকে সব স্টল ঘুরে আমরা পরিবারের সবাই হাত ভরে বই কিনতাম। বই আমরা ভাইবোনরাই কিনতাম। বাবা-মা সাথে যেতো আর বই কেনার আনন্দ উপভোগ করতো। তখনকার শৈশব ছিল সাদা-কালো, কিন্তু নির্মল আনন্দের আর মজার। আমরা বই কিনে পড়তাম আর বইয়ের ভিতরে প্রথমে গোটা গোটা অক্ষরে নিজের নাম, শ্রেণী, রোল নং, স্কুল লিখে রাখতাম।

তখনকার মেলায় এত স্টল ছিল না, এত মানুষ আসতো না। অনেক ফাঁকা আর পরিছন্ন ছিল। শুধু জ্ঞান পিপাসুরা আগ্রহভরে মেলায় আসতো। আজ সেই সময়ের বিশ বছর পরে জাঁক জমকের সাথে একুশে বই মেলা পালিত হচ্ছে। লোকে লোকারণ্য। মানুষের আর বইয়ের মেলা। প্রত্যেক বইমেলায় তার আগের বছরের চেয়ে বেশি বই প্রকাশিত হচ্ছে। আর দেদারসে পাবলিশার্স বাড়ছে। আমরা কি কখনো চিন্তা করেছি বই মেলায় প্রকাশিত বইগুলো কতটি মানসম্পন্ন? বোধকরি এবছর সাড়ে পাঁচ হাজারের মধ্যে সাড়ে চারশোর কিছু বেশি বই মানসম্পন্ন বলেছে বাংলা একাডেমী। এই তথ্য নিরপেক্ষভাবে বিচার- বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সত্যিই কি এত সংখ্যক বই মানসম্পন্ন? সত্যিই?

বিষয়গুলো জটিল ও গভেষণর দাবী রাখে। এখানে সমাজের একটি চিত্র ফুটে উঠে। চিত্রটি ভয়ংকর। আমরা শুধু হয়ত ছবির একটি কোনা দেখতে পাচ্ছি। সম্পূর্ণ ছবিটি নয়। ধরুন এটি একটি চিত্রকর্ম। আমরা চিত্রকর্মের এক কোনায় দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছি। একটু দূর থেকে দাড়িয়ে সম্পূর্ণ চিত্রকর্ম টি দেখছি না। আবার ছবির ভিতরে পিছনে আরেকটি ছবি থাকতে পারে। কতজন আমরা উপলব্ধি করছি সেই ছবি?

এখন চাকুরী, পড়াশুনা, শহুরে ব্যস্ততার জন্য একবারের বেশি দুবার সময় করে বই মেলায় যাওয়া হয়ে উঠে না। বই মেলায় যাই আর হতাশ হই। আসলেই কি শিক্ষিত পাঠক সমাজ গড়ে উঠেছে এ দেশে? আমার দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছুই একটু আলাদা আলাদাভাবে উপস্থাপন করছি।

প্রথমেই পাব্লিকেশন্স এর কথায় আসি। সর্বত্রই নামসর্বস্ব স্টলের ছড়াছড়ি। পুরানো নামকরা প্রকাশকদের স্টল গুলো ঘুরে দেখলাম। তারা হয়তো পুরানো বই আবার ছাপিয়ে এনেছেন। যে কয়টি স্টলে বেশি বই বিক্রি হচ্ছে, তা ওই ঘুরে ফিরে কয়েকজন লেখকের বই। নতুন লেখক বা সব বয়সীর মানুষের জন্য বই তারা আনছেন না। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জ্ঞানী হচ্ছে প্রকাশক। কারণ লেখক বই লেখার পর ছাপার জন্য প্রকাশকের কাছে যান। আর প্রকাশক বই পড়ে মতামত দেন, বইটি ছাপার যোগ্য, নাকি নয়। কাজটি নিজেও করতে পারেন বা অন্য কাউকে দিয়ে করাতে পারেন। তারপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল প্রুফ রিডার। সে বই পড়ে ভুলগুলো সংশোধন করে। এরাই হল প্রথম দুজন ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুজন যারা বইটি পাঠকের আগে পড়ে। এখন তারা তাদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছেন বলে মনে হয়না। ভুলে ভরা বই বাজারে চলে আসছে। কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। ভুল একটু বলে পাশ কাটিয়ে যেতে চায়। কিন্তু এই ভুলগুলো মারাত্মক। কি রকম একটু উদাহরণ দেই। ধরুন কেউ একটি বই লিখলো। বইয়ের বিষয়বস্তু, লেখা কোনটিও মান সম্পন্ন নয়। বইটি লেখকের ইচ্ছায় (কিভাবে নিজ দায়িত্বে বুঝে নিবেন) প্রকাশক ও সবার বন্ধ চোখের সামনে দিয়ে বাজারে আসলো। এখন পরবর্তীতে যখন দেখা গেলো বইটি ভুলে ভরা, ত্রুটিপূর্ণ, তখন সিদ্ধান্ত হলো তা আর প্রকাশ করা হবে না বা বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হলো। কিন্তু যা ক্ষতি তা হয়ে গিয়েছে। কারণ বাজারে আসলে কেউ না কেউ কিনবে, সে পড়বে, একবার প্রকাশিত হয়ে গেলে সব অসম্ভব এবং তার (পাঠকের) চিন্তা-চেতনাকে তা প্রভাবিত করবে। সে যখন সেটি আরও অনেকের সাথে আলোচনা করবে লেখকের সেই চিন্তাধারা ছড়িয়ে পড়বে। এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে কেউ যদি না কিনে? না কিনলেও বইটি কিন্তু থেকে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে না। আগেকার মত হাতে লেখা বই একটি বা দুটি নয় যে তা নষ্ট হয়ে গেলে জ্ঞান হারিয়ে যাবে। এখনকার লেখা বই, লেখকের চিন্তাধারা ধরুন কম করে এক শতাব্দী টিকে থাকবে। ভাবুন, আপনার লেখা একটি ভুলে ভরা বই, অসচ্ছ চেতনার একটি বই, আজ থেকে ৪০-৫০ বছর পর কেউ পড়ছে। আপনার চিন্তা, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা সম্বন্ধে জানছে। কি মর্মান্তিক!!!

লেখকদের কথায় আসি। লেখকেরা পাঠকের কথা চিন্তা করে লিখবে কিম্বা তার মনের আবেগ প্রকাশ করবে, এটি তার ব্যক্তিগত। কিন্তু যখন লেখার পর তিনি সেটা ছাপাতে যাবেন, তখন চিন্তা করবেন সেটি ছাপানোর জন্য উপযুক্ত কিনা। এখনকার লেখকদের সম্মান রেখেই বলছি, এখন অনেকেই হয়তো একটু নামের আশায়, যশের আশায় কিছু একটা লিখে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছেন। সমাজের ক্ষয়িষ্ণু দিকের চিত্রটি তখন ফুটে উঠে। লেখকের দৈন্যতা প্রকাশ পায়। প্রকাশকের আব্দার মেটাতে বইমেলায় ১২-১৪ খানা বস্তাপচা লেখা যখন কেউ লেখে, তখন তিনি হয়তো তার রয়্যালটি, প্রকাশক কাঁচা টাকা চিন্তা করেন। কিন্তু বৃহৎ পরিসরে সমাজের ক্ষতিটি নজরে পড়ে না। বইটি একটি দালিলিক প্রমাণ হিসেবে যুগ যুগ থাকবে। এখনকার বেশিরভাগ লেখকেরা লেখার আগে নিজে জানার চেষ্টা করেনা, অন্যের লেখা পড়ে না। নিজের কলম আছে, কাগজ আছে তো লেখা শুরু করো, জ্ঞান তৈরি করতে ঝাঁপিয়ে পড়ো।

পাঠকের কথা ও মেলায় দর্শকের পালা এবার। মেলায় বোধকরি পাঠকের চেয়ে দর্শক বেশি। যেখানে সেখানে আড্ডা-গুলতাপ্পি মারছে, অধিকার ও আছে। অনেকেই সেলফি তুলছে, অবশ্যই সব কিছু করার অধিকার তাদের আছে। ফেব্রুয়ারি মাসে কতটা ভাষার তাগিদে, কতটা শহীদের স্মরণে, কতটা নতুন বইয়ের গন্ধ শোঁকার জন্য, আর কতটা স্রেফ মজা করার জন্য আসে বলা বাহুল্য, তবে দর্শকের অনেকাংশই যে সার্কাসের দর্শকের ন্যায় ৫২ এর শহীদদের জন্য, মা-বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে এই জ্ঞানে দুষ্ট। দর্শক বেড়েছে, জ্ঞান বাড়েনি। শিক্ষা বেড়েছে, শিক্ষায় শিক্ষিত (পড়ুন আলোকিত) মানুষ বাড়েনি। বই কেনা, পড়া, বইয়ের বিষয়বস্তু উপলব্ধি করা, ধারণ করা এসব অনেক বিষয় পাঠকের সাথে জড়িত। কবে এই দেশে শিক্ষিত পাঠক সমাজ গড়ে উঠবে বলা যায় না।

প্রকাশক, লেখক, পাঠক সবাই দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রের মত। সবাই পরস্পর যুক্ত। সমাজের গতিধারা যেভাবে যাচ্ছে তবে সামনে কোন সমাধান আসবে বলে মনে হচ্ছে না। আমাদের আগের প্রজন্মের জ্ঞানের মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে আমরা শিক্ষিত হয়েছি, আলোকিত হয়েছি। এখনকার লেখকদের মুড়ি, চিপস, চাউমিন পড়েই পরবর্তী প্রজন্ম গড়ে উঠবে। সমাজের কর্তাব্যক্তিরা বইমেলায় পাঁচকোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে বলে তৃপ্তির ডেকুর তুলছে, কিন্তু তা যে অম্ল ডেকুর কে তা বোঝাবে। শিক্ষা ব্যবস্থার মত শিক্ষার মাধ্যম বইও যে ঘুণপোকার ছোট্ট কামড়ে দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে তা কে বোঝাবে?

এখন শুধু নিয়ম রক্ষার্থে বইমেলায় যাওয়া হয়, বই মেলার বই সারা বছরের জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটায় না। মন তৃষ্ণার্ত থেকে যায় আর হতাশা বাড়ায়।

২৮৬ বার দেখা হয়েছে

১টি মন্তব্য “একুশের বইমেলা ২০১৮ ও কিছু এলোমেলো ভাবনা”

  1. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    ভাবনাগুলো মোটেই এলোমেলো নয়। বেশ গুছিয়েই সেগুলো শেয়ার করেছো আমাদের সাথে।
    ২০১৬ আর ২০১৭ এর বই মেলায় আমার তিনটে বই প্রকাশিত হয়েছিল। তাই আমার কিছুটা অভিজ্ঞতা হয়েছে একুশে বইমেলায় বই প্রকাশনার ব্যাপারে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের টাকার দাপটে কবি লেখক হবার তীব্র বাসনাজনিত কিছু কার্যকলাপ অনেক সময় আমার বিরক্তির কারণ হয়েছিল।
    বই পড়ার সময় খেয়ে ফেলছে ফেইসবুক এবং সেলফোনের বিভিন্ন এ্যাপস। তরুণদের আজকাল বই পড়ার সময় নেই।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য