<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?> <rss version="2.0" xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/" xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/" xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/" xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom" xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/" xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/" ><channel><title>ক্যাডেট কলেজ ব্লগ &#187; ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</title> <atom:link href="http://www.cadetcollegeblog.com/author/noorafza/feed" rel="self" type="application/rss+xml" /><link>http://www.cadetcollegeblog.com</link> <description></description> <lastBuildDate>Thu, 29 Jul 2010 21:09:14 +0000</lastBuildDate> <language>en</language> <sy:updatePeriod>hourly</sy:updatePeriod> <sy:updateFrequency>1</sy:updateFrequency> <item><title>অতীত বয়ান &#8211; কেউ যদি শুনতে চায় (জীবনের টুকরো দেশে-বিদেশে)</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/26391</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/26391#comments</comments> <pubDate>Wed, 14 Jul 2010 11:06:19 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[দিনলিপি]]></category> <category><![CDATA[ভ্রমণ কাহিনী]]></category> <category><![CDATA[ময়মনসিংহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=26391</guid> <description><![CDATA[১ মাঝে মধ্যে রাতের খাবারের সময়টাতে আমরা পরিবারের সদস্যরা মিলে গল্প গল্প খেলি। খেলাটা হচ্ছে কোন একটা বিষয়বস্তু নিয়ে পালাক্রমে সবাই একটা করে গল্প বলবে। যেমন কোন একদিনের বিষয়বস্তু ছিল এম্বুলেন্স। রাইসা গল্প বললো এইভাবে যে ফেইরী গড মাদারের দেরি দেখে সিন্ডারেলা ৯১১ (আমেরিকার জরুরী বিভাগের নাম্বার) নাম্বারে ফোন করে এম্বুলেন্স ডেকে এনে তাড়াতাড়ি রাজপুত্রের নাচের [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>১<br /> মাঝে মধ্যে রাতের খাবারের সময়টাতে আমরা পরিবারের সদস্যরা মিলে গল্প গল্প খেলি। খেলাটা হচ্ছে কোন একটা বিষয়বস্তু নিয়ে পালাক্রমে সবাই একটা করে গল্প বলবে। যেমন কোন একদিনের বিষয়বস্তু ছিল এম্বুলেন্স। রাইসা গল্প বললো এইভাবে যে ফেইরী গড মাদারের দেরি দেখে সিন্ডারেলা ৯১১ (আমেরিকার জরুরী বিভাগের নাম্বার) নাম্বারে ফোন করে এম্বুলেন্স ডেকে এনে তাড়াতাড়ি রাজপুত্রের নাচের অনুষ্ঠানে চলে গেল। রাসীনের গল্পটা হলো এম্বুলেন্স আর ফায়ার ট্রাক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। এই দুটো গাড়িকে আগে যেতে দেওয়ার জন্য রাস্তার আর সব গাড়িরা থেমে ছিল। তারপরও নিজেরা নিজেদের সাথে একসসিডেন্ট করে ফেললো। এতে দুজন ফায়ারফাইটার আহত হলো আর এম্বুলেন্সে আগুন ধরে গেল। ফায়ার ট্রাক এম্বুলেন্সের আগুন নিভিয়ে দিল আর এম্বুলেন্স দুজন ফায়ারফাইটারকে নিয়ে ভোঁ দৌড় দিল।</p><p>একদিন আমি ঠিক করলাম সেদিন হাসির গল্প বলা হবে এবং আমি প্রথম শুরু করবো। শুরু করার আগেই রাসীন বলে উঠলো, ‘বাবা, মামনি হাসির গল্প বলতে চাচ্ছে। এটাই কী সবচেয়ে বড় হাসির গল্প না?’ নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সে কিছু না বলে ওর সেই বিখ্যাত ঠোট চাপা হাসিটা দিল। আমি রাসীনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি কী কখনও হাসির গল্প বলি না?‘<br /> ‘সরি তোমাকে খুশি করার জন্য আমি মিথ্যা বলতে পারবো না। ওটা বাবার ডিপার্টমেন্ট।‘ রাসীনের নিস্পৃহ উত্তর।</p><p>হু, পরিবারের মধ্যে আমি যে রসিকতা কম করি শুধু তাইই নয়, বুঝিও কম। তাই নির্ঝরের দৃষ্টি আকর্ষন করে আমাকে বাচ্চাদের বোর্ডে বড় বড় করে লিখে রাখতে হয়, ‘আমার সাথে কোন রসিকতা করা যাবে না।’</p><p>২<br /> একদিন খুব ভালোমানুষী ভাব নিয়ে আমার পাশে বসে নির্ঝর বললো, ‘বুয়েটে আমার এক বন্ধু ছিল। সে বলতো ইঞ্জিনিয়ার পরিচয়ে নয়, আমি বেশি গর্বিত বোধ করি আমার কবি পরিচয়ে। আমি বললাম বাংলাদেশে দুটো ঢিল ছুরে মারলে তার একটা পরবে কবিদের মাথায়।‘<br /> বেশ বুঝতে পারছিলাম আমাকে রাগানোর চেষ্টা চলছে। আমি মুখটা ভাবলেশহীন করে বললাম, ‘আমি কবিতা লিখি না।‘<br /> ‘কী বলো? তুমি তো তাহলে এখনও এবিসি পর্যায়ে আছো। সাহিত্যের সবচেয়ে কঠিন পর্ব হলো কবিতা লেখা।’<br /> প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য বললাম, ‘উপন্যাসটার জন্য নিজের ছোটখাট একটা জীবনী লিখতে হবে। বলো তো কী লেখা যায়?‘<br /> ‘ভেতরের লেখা যেমনই হোক, লেখকের জীবনীটা একটু অন্যরকম হলে পাঠক কিছুটা আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।‘<br /> ‘সেই অন্যরকমটা কী জিনিষ?‘<br /> ‘এই যেমন লেখিকার একদিন জানতে ইচ্ছে হলো ডুবে যেতে কেমন লাগে, তাই তিনি জাহাজের ডেক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে ঝাঁপ দিলেন।‘<br /> এতোক্ষন আগডুম বাকডুম বলে যা করতে পারছিলো না, এ কথা বলেই সে তার সিদ্ধি হাসিল করে ফেললো। আমি হেরে গেলাম রেগে গিয়ে।</p><p>আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ এই রসিকতার পেছনে প্রতিক্রিয়া দেখানোর একটা ইতিহাস আছে।</p><p>৩<br /> সালটা ছিল ১৯৯৯। তখন সবে মাত্র আমেরিকায় এসে স্যান হোজে স্টেইট ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স শুরু করেছি। ইউনিভার্সিটিকে এখানে স্কুল বলে। স্কুল থেকে বাসার দূরত্ব প্রায় ২০ মাইল। আমেরিকাতে বড় বড় ফ্রীওয়ে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দূরত্বকে কমিয়ে এনেছে। একেকটা ফ্রীওয়ে থেকে শাখা প্রশাখা বেরিয়ে বিভিন্ন শহরের মধ্যে ঢুকে পরেছে। জিপিএসবিহীন সে সময়টায় নতুন কেউ একবার শাখা-প্রশাখা নিতে ভুল করলে তাকে গোলক ধাঁধার ভোগান্িততে পড়তে হয়।</p><p>একদিন রাতের বেলা ক্লাসের পর ল্যাব করে বাসায় ফিরতে গিয়ে ভুল রাস্তায় ঢুকে পরলাম। সোজা সরু সে রাস্তাতে কারণে গাড়ি উলটো ঘুরাতে পারছিলাম না। প্রায় আলোশূন্য রাস্তাটা ক্রমশ গভীর বনের মধ্যে দিয়ে সোজা পাহাড়ের উপর উঠে যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে যাওবা দু একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু সেখানে থামাবার সাহস করে উঠতে পারছিলাম না। একে তো অপরিচিত বাড়ি তার উপর সময়টা ছিল অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ। এ সময়টাতে আমেরিকানরা তাদের বাড়ির সামনে, উঠোনে পাল্লা দিয়ে ভয়ংকরভাবে সাজিয়ে রাখে। সদ্য বাংলাদেশ থেকে আসা অমাবস্যার রাতে পথ হারানো এক পথিকের কাছে এসব মেকী ভুত-প্রেত, কবরস্থান, কংকালেরা তখন বড্ড বেশি বাস্তব। তার উপর আবিষ্কার করলাম পেছন থেকে একটা পিক-আপ ধরনের গাড়ি আমাকে অনুসরণ করছে। আমি ডানে গেলে সে গাড়িও ডানে যায়, বায়ে গেলে বায়ে। সামনের আয়নায় ভয়ংকর চেহারার ড্রাইভারকে দেখে ততক্ষনে আমার আত্মরামের খাঁচার মধ্যে ছুটোছুটি । আগের রাতেই কী যে কুক্ষনে ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস মুভিটা দেখতে গিয়েছিলাম! মুঠোফোন বেজে উঠলো। ফোনটা ব্যাগের মধ্যে পিছনের সিটে রাখা। এই নির্জন জায়গা থেকে যদি হারিয়ে যাই তাহলে আর কেউই কোনদিন আমার খোঁজ পাবে না। আজ রাতই আমার জীবনের শেষ রাত হতে পারে না &#8211; কথাটা বার বার বলে নিজেকে সাহস দিচ্ছিলাম।</p><p>বাসায় ফিরে দেখলাম পার্কি লটেই নির্ঝর দাড়িয়ে অস্থিরভাবে পায়চারী করছে।<br /> বললো ‘ আরেকটু দেরী করলে আমাকে হসপিটালে পেতে। ত্রিশ পৌছনোর আগেই প্রথম হার্ট এটাকে পরতে যাচ্ছিলাম।’<br /> আহা, বরের কী ভালবাসা। আমিও সুইট করে বললাম,<br /> ’কেন খুব ভয় পেয়েছিলে বুঝি?’<br /> ’ভয় &#8211; তা বলতেই পারো। কিছুক্ষন আগে তোমার ভাই, সাদি মামা ফোন করে বললো তারা এখন বাসায় আসছে। এদিকে বাসায় এসে যদি তোমাকে লা-পাত্তা দেখে তাহলে আমার দিকে আঙ্গুল উঠবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমেরিকাতে বৌ গুম করে তাদের স্বামীরা।’</p><p>বলাবাহুল্য ভালবাসার এই রূপ দেখে খুব অভিমান হলো। এরপর থেকে ওর  নিয়ে পথ হারানো কিম্বা পানিতে ঝাপ দেওয়া ধরনের রসিকতাগুলোতে কোন রস খুঁজে পায়না।</p><p>৩<br /> ক্যালিফোর্নিয়ার রাজধানী স্যাক্রামেন্টো। আমাদের এখান থেকে দুইশ মাইল উত্তরে। একবার রিনো থেকে স্কী করে থেকে আসার পথে সেখানটায় থামলাম কিছু খাওয়ার জন্য। মেজবান নামের একটা পারসিয়ান রেস্টুরেন্ট দেখে ঢুকলাম। পারসিয়ান খাবারদাবার আমাদের দুজনেরই খুব পছন্দ। অর্ডার দিয়ে বসে আছি। দেখলাম দুই পারস্য সুন্দরী ঢুকলো। কিছুক্ষন পর কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ করে ঝুনঝুন শব্দ সাথে আরব্য রজনীর সুর ভেসে উঠলো। দেখি সেই দুই পারস্য সুন্দরী নাচতে শুরু করেছে। তাও আবার যেই সেই নাচ না &#8211; একেবারে বেলী ড্যান্স। বেছে বেছে  ছেলেদের চারপাশ ঘিরে ঘিরে নাচছে, টিপস পেয়ে খুশি মনে আরেকজনের কাছে চলে যাচ্ছে। নির্ঝরের মুখ ছিলো অডিয়েন্সের দিকে আর আমার ছিল দেয়াালের দিকে।  জায়গা বদল করা নিরাপদ ভেবে দুজনের জায়গা বদল করালাম। মাঝে মধ্যে নাচ দেখতে দেখতে ভাবছিলাম এরা আর অন্য কোন কাজ যোগার করতে পারলো না?</p><p>রেস্টুরেন্ট থেকে যখন বেরুলাম তখন দেখি পতিদেবতার মুখ গোমড়া। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার?‘<br /> ‘আমাকে দেখতে দিলে না ভালো কথা, তুমি দেখলে কেন?‘<br /> ‘কী ব্যাপার আমার ওরিয়েন্টেশন নিয়ে তোমার কি কোন সন্দেহ আছে?’</p><p>জানি নেই। তবে একবার এক ঘোরালো পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলাম।</p><p>৪<br /> ইন্টেলে প্রতিবছরই খুব ঘটা করে ডাইভারসিটি ডে পালন করা হয়। বুথের সাজসজ্জা, আর হরেক রকম খাবারের পরিবেশনায় ইন্টেল বাংলাদেশ এসোাশিয়েশনের বুথ থাকে জমজমাট। বুথের সামনে আসতে লম্বা লাইনে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ মিনিট দাড়িয়ে থাকতে হয়। গত কয়েক বছর আগে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপক সুসান ডে ঠিক করলো যেহেতু এই বুথের সামনে খুব ভিড় হয়, এরপর থেকে সবচেয়ে কম ভিড় হওয়া বুথকে এর পাশে রাখবে। সকালবেলা বুথ ঠিকঠাক করতে গিয়ে দেখি, পাশে দিয়েছে গে, লেসবিয়ান আর  ট্র্যান্সজেনডারদের সংগঠনকে। অনুষ্ঠানের সময় নিজ বুথে দাড়িয়ে নিস্পাপ কৌতুহলে পাশের বুথে খেয়াল রাখছি কারা আসে দেখার জন্য। প্রথমে প্রায় সত্তুর বছরের এক তরুন কানে আইপড লাগিয়ে এলেন। এরপর এলো এক মহিলা যার সাথে প্রায়ই করিডোরে চলতে আসতে দেখা হয়। অফিসে অধিকাংশই সাধারণত ফরম্যাল ড্রেস পড়ে আসে। কিন্তু এই মহিলাকে দেখি সবসময়ই আবৃত থাকে মিনিস্কার্ট, হাইহিল আর  কড়া মেকাপের মোড়কে। তখনও ব্লগার হয়নি। ভবিষতে কাজে লাগতে পারে ভেবে কিছু তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য পাশের বুথে গেলাম। মহিলা খুব আগ্রহ নিয়ে আমাকে তাদের সংগঠনের কার্যপ্রনালী বোঝাতে লাগলেন। হঠাৎ পাশে তাকিয়ে দেখি আমাদের বুথ থেকে এক তবলিকী ভাই সূক্ষ্ম চোখে আমাদের কথাবার্তা পর্যবেক্ষণ করছেন। তড়িঘড়ি করে সেখান থেকে সরে আসলাম। ভাইজান কী না কী ভেবে বসেন বলা তো যায়না।</p><p>এরপর করিডোরে মহিলার সাথে দেখা হলে হেসে কুশল বার্তা জিজ্ঞেস করতো। জানতে চাইতো তাদের সংগঠনের ই-মেল লিস্টে আমি নাম ঢুকাতে চাই কিনা। আমার মতো সোজাসাÌটা মানুষকে এ কী প্রশ্ন! একটা বিশেষ বুথে  দেখার কারণে আমার কু-মন মহিলার নিষ্পাপ হাসির মাঝেও অতিরিক্ত উৎসুক্য খুঁজে পায়। দূর থেকে মহিলাকে দেখলেই অন্যপথ ধরি।<br /> একদিন ল্যাবে কাজ করছি। সহকর্মী জর্জ পাশে এসে বললো, ‘আজকে রেস্টরুমে ঢুকেই ঘাবড়ে গিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলাম। একটা বন্ধ টয়লেটের দরজার নীচে তাকিয়ে দেখি মেয়েদের জুতো।‘<br /> ‘তুমি না এখানে বিশ বছর ধরে কাজ করছো। এখনও ভুল করে মেয়েদের রেস্টরুমে পড়ো?’<br /> ‘প্রথমে আমিও তাই ভেবেছিলাম। পরে বুঝতে পারলাম মেয়েদের জুতোটা আসলে মার্টির।‘<br /> মার্টি প্রাইস হচ্ছে সেই মহিলা যাকে আমি এড়িয়ে চলছি। বুঝলাম সে আসলে  ট্র্যান্সজেনডার। অপরা উইনফ্রের  অনুষ্ঠানে কয়েকবার ট্র্যান্সজেনডারদের সমস্যার কথা শুনেছিলাম। এক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বৌ বাচ্চা নিয়ে  বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু সবসময়ই তার মনে হতো যে সে আসলে একজন মেয়ে। ভুল করে ছেলেদের দেহে বন্দি হয়ে আছে। তাই সে হরমোন থেরাপীর মাধ্যমে লিঙ্গ পরিবর্তন করে আইনত মেয়ে হয়ে গেল। এদিকে বৌকেও ছাড়তে চায় না আর বৌও সাথে থাকতে চায় না। কারণ সাথে থাকলে সে অফিসিয়ালি লেসবিয়ান হয়ে যাবে যা সে চাইছে না। আমেরিকাতে এখন অনেক অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েই লিঙ্গ পরিবর্তন করছে। দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে ছেলে হয়ে প্রেমে পড়ছে আরেকটা ছেলের। টেকনিক্যালি তো তার মেয়ের প্রেমে পড়ার কথা যদি তার দেহের মধ্য আসলেই একজন ছেলে বাস করে থাকে। হিসেব বড় গরবরে।</p><p>এসব দেখলে মনে হয় এই পৃথিবীতে আসলে মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখের পরিমান সমান। থাকতো যদি ক্ষিদের কষ্ট তাহলে আর ভাবতে হতো না দেহটা ভুল না ঠিক। তখন পেটই সব।</p><p>৫<br /> প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ে শীতকালে বৃষ্টি হয়। আস্ত আস্ত একেকটা বড় বড় পাহাড় তার মেটে বদলে সবুজ হতে শুরু করে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই বৃষ্টি শুধু জানালা থেকে দেখা যায়। ছোঁয়া যায় না। উত্তর মেরুর কনকনে বাতাস এতে মিশে থাকে। আবার আটলান্টিকের পাড়ে একেবারে অন্যরূপ। ফেçারিডার গাছপালা জলবায়ু সব বাংলাদেশের মতো। সেখানে গরমের সময় বৃষ্টি পরে। একেবারে বাংলাদেশের মতো বিদ্যুৎ চমকানো বৃষ্টি। গত বছর তা দেখে রাইসা বলে উঠেছিলো, ‘বিদুৎ চমকানো ব্যাপারটা তাহলে সত্যি। আমি ভেবেছিলাম এটা বুঝি শুধু কার্টুনের দেখা যায়।‘</p><p>ফেçারিডার সমুদ্র সৈকত দেখলে কক্সবাজারের কথা মনে হয়। তবে ফেçারিডার সৈকতের পানি অনেক স্বচ্ছ। রংটা একটু নীলচে, সবুজাভ। বালুর বদলে একটু আধটু সামুদ্রিক আগাছা ভেসে আসে। অরল্যান্ডো শহরটাতে অনেক সৈকত আছে খুব সুন্দর আবার একেবারেই নিরিবিলি। তবে মায়ামীতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। পুরো শহরটা মনে হয় সমুদ্রের উপর ভাসছে। আবাসিক এলাকা, বানিজ্যিক এলাকা, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, মানুষজন কোন কিছুর সাথেই আমেরিকার অন্যান্য শহরের অতো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। পাহাড় বাদ দিয়ে টেকনাফের রাস্তাটা মিলিয়ে দিয়ে চিটাগাংকে আরেকটু পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন আর কম ভিড় করলে যে রূপটি পাওয়া যাবে তার সাথে এই শহরটার মিল আছে। আছেই বাহামা আর কিউবা। শহরের মানুষগুলো অধিকাংশই সেখান থেকে এসে এখানে বসতি গড়েছে।</p><p>আমেরিকান সংস্কৃতির একটা অংশ হলো এদের বাথরুম কিম্বা শুধু টয়লেট (এখানে রেস্টরুম বলে) খুব সুন্দর হয়। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, সাজানো-গোছানো, ঝকঝকে ফিটিংশ। কিন্তু মায়ামী থেকে যতোই দক্ষিনে যাচ্ছিলাম বাথরুমগুলো ততোই বেশি অ-আমেরিকান হচ্ছিল। বিভিন্ন পাবলিক সার্ভিসের অবস্থাও তথৈব।</p><p>আমেরিকার দক্ষিনের শেষবিন্দুটির নাম কী-ওয়েস্ট। যে রাস্তাটা দিয়ে সেখানে যেতে হয় সেটা কখনও ব্রীজ কখনও রাস্তা &#8211; আটলান্টিকের উপর ভেসে থাকা কতোগুলো ছোট্ট ছোট্ট দ্বীপকে সুতোর মতো জোড়া দিয়ে একতানে ধরে রেখেছে। কী-ওয়েস্ট একরত্তি একটা দ্বীপ। চারপাশ দিয়ে গালফ অফ মেক্সিকো, ক্যারিবিয়ান আর আটলান্টিক ঘিরে রয়েছে। দ্বীপটার দক্ষিন-পূর্বে আটলান্টিক ছুঁয়ে যাওয়া এক সৈকতে থামলাম। পানি উষ্ণ, স্বচ্ছ। নীল-নীল। কিছুটা শান্ত তবে তীরের পানিতে অনেক শ্যাওলা, মস ধরনের সামুদ্রিক উদ্ভিদ ভেসে আসে। তীরে গিয়ে পানি ধরলাম। জীবনে সেই প্রথম সরাসরি কোন মহাসাগরকে স্পর্শ করা। এর আগে যা ছুঁয়েছি তার সবই ছিল উপসাগর।</p><p>সৈকতের পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে আমরা রাতের খাবারের জন্য ঢুকলাম। তখনও দিনের আলো নিভে যায়নি। আটলান্টিকের পাশে বসে আটলান্টিকে ধরা মাছের স্বাদ নিচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে আলো নিভে আসলো। রেস্টুরেন্টের ভেতরকার বৈদুতিক আলোয় বাইরের অতলান্িতক এক রহস্যোময় রূপ নিচ্ছিল। দূরে টিম টিম করে ভেসে যাওয়া কোন জাহাজের আলো দেখে বার বার ফিরে যাচ্ছিলাম অতীতে। কলম্বাস,ভাস্কো দ্যা গামা বা জেমস স্মিথ মতোই হয়তো কোন অদম্য সাহসী কোন অভিযাত্রী একদিন এখানে থেকে মাস্তুল করে দক্ষিন আমেরিকা আর আফরিকার পাশ দিয়ে সোজা দক্ষিন-পূর্বে চলে গিয়েছিল নতুন কোন ভূখন্ডের সন্ধানে। কিন্তু হায় এখানে থেকে অতলান্টিক যে সোজা শেষ হয়েছে দক্ষিন মেরুর আন্টার্টিকায়। হয়তো সে নাবিকের আর ফিরে আসা হয়নি। আমরাও জানতে পারিনি তার নামটি। এভাবে না ফেরা নাবিকেরা জানিয়ে দিয়েছে আর নতুন কোন পৃথিবী ওখানে ঘুমিয়ে নেই। এভাবে হাজারো সফলতা আর ব্যর্থতার ইতিহাস মানবসভ্যতার জ্ঞানভান্ডার করেছে সমৃদ্ধ। দূরের জাহাজের ঐ টিমটিমে আলোর মতোই আমরা মশাল নিয়ে এগিয়ে চলছি। ঠিক যেন রিলে রেস।</p><p>মালা গাঁথার সুতোর মতো কীওয়েস্টের সেই রাস্তাটা দিয়ে মায়ামী ফেরার পথে মু© আমি নির্ঝরকে বললাম, ‘এমন একটা সুন্দর ভ্রমনের জন্য উপহার স্বরূপ ঠিক করলাম আগামী তিনমাস তোমার সাথে কোন ঝগড়া করবো না। এমন কী তুমি শুরু করলেও না।’<br /> ’আমি আবার কবে ঝগড়া শুরু করলাম?’<br /> অনেক সময় এ কথার উত্তর দিতে গিয়েই ঝগড়া বেঁধে যায়। যেহেতু মনে এখন মোগল সাম্রাজ্যের প্রাচুর্য তাই কোন কথা না বলে বাইরের অপূর্ব দৃশ্যাবলী দেখতে লাগলাম।</p><p>দুঃখের বিষয় সে রাতেই ঝগড়া হলো।</p><p>৬<br /> মায়ামী এসে যখন পৌছলাম তখন রাত বারটা বাজে। হোটেলের মানুষগুলো জানি কেমন। বোধহয় কিউবান, মেক্সিকান আর স্প্যনিস বংশোদ্ভুত হবে। পোষাক-আশাক চালচলনে একটা মাফিয়া মাফিয়া গন্ধ পাচ্ছিলাম। মেয়েগুলোকে দেখে জুলিয়া রবার্টসের প্রেটি ওমেনের কথা মনে পড়ছিল। হোটেল লবী অপরিসর। বসার জায়গা নেই। রেজিস্টারের জায়গাতেই বার। সেখানে আবার মাফিয়া আর প্রেটি ওমেনরা ভীড় করে বসে আছে। রুমের চাবি হাতে দিয়েই নির্ঝর চলে গেল গাড়ি ঠিক জায়গায় পার্কিং করতে। বাচ্চাদেরকে শ্বশুর-শারুরীর রুমে রেখে লবীতে গেলাম ব্যাগ আনতে। এক মাফিয়ারূপী (অ)ভদ্রলোকের থেকে কিছু খারাপ কথা শুনলাম। আমার এগারো বছরের প্রবাস জীবনে সেই প্রথম ইভ টিজিং শোনা। দেশে থাকতে পারার মাস্তানরা পর্যন্ত সম্মান করতো। এখন এই বয়সে এসব কী? মেজাজটা টং করে খারাপ হয়ে গেল। রুমে গিয়ে বাথরুমের অতি অ-আমেরিকান অবস্থা দেখে টং-টা ঢং ঢং করতে লাগলো। বাচ্চারা রুমে এসে এমন লাফালাফি শুরু করে দিল যে কোনভাবেই তাদের শান্ত রাখা যাচ্ছিল না। নির্ঝর রুমে ঢুকে সাথে সাথেই আমি টগবগ খই ফোটাতে লাগলাম,‘নিশ্চয় তুমি খুব ভালো ডিল দেখে সস্তার এই হোটেল ঠিক করেছো। এখানে কোন ভদ্র মানুষ থাকে?’ ইত্যাদি ইত্যাদি &#8212;-<br /> হোটেল ঠিক করার সময় মায়ামীর সবচেয়ে বিখ্যাত সৈকতকে প্রাধান্য দিয়েছিল যাতে হেটেই সৈকতে যাওয়া যায়। পরদিন সকাল বেলা বাচ্চাদেরকে ওদের দাদা-দাদির জিম্মায় রেখে দুজনে হেটে হেটে বীচে গেলাম। এরকম জীবনত বেওয়াচ চোখের সামনে অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। উন্নত দেশের উষ- সৈকতের উষ-তার আঁচে এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠিনি। সিলিকন ভ্যালির শীতল সৈকত নিয়ে যে দুঃখ ছিল তা এক নিমেষে উবে গেল। আসলে সুখ-দুঃখ, সফলতা-ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনার মাঝের সীমারেখাটা যে আসলেই খুব সূক্ষ্ন সেটা বেশ বুঝতে পারলাম। যাকে এতোদিন বেদনার কারণ হিসেবে ভেবে এসেছি, তাই এখন আনন্দময়ীর রূপে প্রতিভাত। কোন সেন্সরশীপের চিন্তাভাবনা করতে হয় না। যখন তখন যে কোন সৈকতেই আমরা বেড়িয়ে আসতে পারি। দুজনেই স্বীকার করলাম বাচ্চা-বুড়োদের আর এই সৈকত দেখিয়ে কাজ নেই। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে বেরুতে হবে। গতরাতে<br /> গাড়ি রাখতে গিয়ে নির্ঝরের অভিজ্ঞতাও খুব একটা ভালো হয়নি। গ্যারাজে নাকি ওকে দুজন প্রেটি ওমেন ধরেছিল।</p><p>আমার এই হাজি সাহেব বরটাকে নিয়ে প্রেটি ওমেনদের টানাটানি এর আগেও খেয়াল করেছিলাম।</p><p>৭<br /> বিয়ের প্রথম প্রথম সুযোগ পেলেই আমরা ঘুরতে বেড়িয়ে পড়তাম। যেহেতু নির্ঝর ক্যাডেট কলেজে পড়েনি তাই সে জানে না নিয়ম ভাঙ্গার মজাটা কী। একদিন রাত তিনটার সময় সান ফ্রান্সিসকো যেতে চাইলাম। ‘ঐ সময়টায় তো শহরটা অতো নিরাপদ থাকে না &#8211;‘<br /> ]‘ ও এরকম হালকা হালকা কিছু বললেও শেষ পর্যন্ত সেখানে গেলাম। ঘুরেফিরে রাতের শহর দেখতে লাগলাম। ফিশারম্যান ওয়ার্ফের সেই জমজমাট ভীড়টা নেই, ফাস্ট স্ট্রীট আর মার্কেট প্লেসের কোনায় এক মনে বাজিয়ে চলা সেই বেহালাবাদক তখন উধাও। তার বদলে দেখলাম হঠাৎ করেই একটা গাড়ি ঘ্যাচ করে ব্রেক কষলো। দরাদরি শেষে এক প্রেটি ওমেন সে গাড়িতে উঠে পরলো। লালবাতি জ্বলতে থাকায় আমাদের গাড়ি থেমে ছিল। পাশেই আরেক গাড়ি থামলো। সে গাড়িতে চারটা অল্পবয়সী ছেলে। কোন গ্যাঙ্গের সদস্য হবে বোধহয়। আর বেশিক্ষন সেখানে থাকার ইচ্ছে হলো না। ভাবলাম স্টারবাস্ট থেকে একটা ফ্রেঞ্চ ভ্যানিলা ক্যাপাচিনো কিনে ফেরত যাই। এখানে পার্কিং এর ঝামেলা। গাড়িতে নির্ঝর অপেক্ষা করছিলো। কফি কিনে ফেরত এসে দেখি দুজন প্রেটি ওমেন গাড়ির জানালা ঘেষে দাড়িয়ে আছে। নির্ঝরের খুব কাছাকাছি।</p><p>৮<br /> অনেকেই দেশ বলতে শুধু আত্নীয়স্বজন মূলত বাবা-মাকেই বোঝে। কিন্তু আমি দেশ বলতে দেশই বুঝি। যেখানে আমার শেকড়, বেড়ে উঠা। আমার শৈশব কৈশোর তারুন্যের প্রতিটি পরতে পরতে হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, আশা-নিরাশা, স্বপ্ন দেখা, হতাশ হওয়া, জেগে উঠা, প্রেমে পড়া &#8211; এরকম নানান অনুভূতি পসফুটিত হয়েছে দেশেরই জলবায়ুতে। কালবৈশাখীর দমকা হাওয়া, বর্ষার বৃস্টি, শরতের কাশফুল &#8211; শেফালী ফুলেরা, শীতের শিশির, বসন্েতর বাহারী রং থেকে শুরু করে পথের বাহারী পথিক, হরতাল-ধর্মঘট, ধূলাবালি, দৈনিক পেপার, বাংলা সাহিত্য, টিভি নাটক সব কিছুই কাছেই কৃতজ্ঞ ভেতরের মানুষটা। তাই প্লেন দেশের মাটি স্পর্শ করলেই এখন কেঁপে উঠি। চোখে পানি চলে আসে। এয়ারপোর্টের দেশি মানুষগুলোকে খুব আপন মনে হয়। উত্তরা থেকে বাড়ি ফেরার পথে যখন গাড়ির সামনে ঘ্যাচ করে লোকাল বাসটা থেমে যায়, কন্ট্রাকট্র নেমে রিক্সাচালকের পিঠে একটা বাড়ি দিয়ে রাগত স্বরে রিক্সা সরাতে বলে তখন একটা বড়সর শ্বাস নিয়ে অনুভব করি আসলেই বাড়ি ফিরে এসেছে। এত্তোদিন বড়ই একুইরিয়ামে ছিলাম।<br /> শেষবার যখন দেশে গিয়েছিলাম তখন বর্ষাকাল ছিল। সেই বর্ষার মধ্যে মেঘনার বুকে নৌকায় চড়েছি, বৃষ্টির ঝালরের মধ্যে দিয়ে মাধবকুন্ডের জলপ্রপাতকে নেমে যেতে দেখেছি, ইলশে গুঁড়ি মাথায় নিয়ে কক্সবাজারের সৈকত ধরে অনেকদূর হেঁটে গিয়েছি। সেই সমুদ্র সৈকতের সামনে দাড়িয়ে রাসীন আমার হাতটা চেপে ধরেছিল। আস্তে করে বললো, ‘মামনি তোমার কথাই ঠিক।’ এর আগে সে বিশ্বাসই করতে চায়নি যে বাংলাদেশে আমেরিকার থেকে বড় কিছু থাকতে পারে।<br /> আমি একটু গর্বিত ঠং এ বললাম, ‘আসল মজাটা তো এখনও দেখনি। এখানে আমরা ইচ্ছে মতো লাফালাফি করবো। ঢেউয়ের সাথে খেলা করবো। তোমরা শুধু সাবধানে আমাদের হাতটা ধরে রাখবে। যখন বলবো তখন একটা লাফ দেবে। দেখবে পেছন থেকে ঢেউ  এসে তোমাদের সামনের দিকে অনেকদূর ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।‘<br /> রাইসার তখনও তিন বছরও পূর্ণ হয়নি। সিলিকন ভ্যালির শীতল সৈকতে এর আগ পর্যন্ত শুধু হাটু ভেজানোর অভিজ্ঞতা ছিল। ঢেউয়েরা যে এতো দুষ্টুমি করে বন্ধুর মতো খেলতে পারে তা ওদের জানা ছিল না। ওদের সাথে সাথে আমাদেরও বয়স কমে যায়। নির্ঝর অনেক ভেতরে চলে যায়। মাঝে মধ্যে শুধু মাথাটা ভেসে থাকতে দেখি।</p><p>ঢেউয়ের সাথে বাচ্চাদের খেলা করা দেখি আর দেখি অনেক দূরে দাড়িয়ে বাচ্চাদের দাদা-দাদিদের শুকনো সমুদ্র দর্শন। মনে পড়ে যায় এই সৈকতের সাথে মিশে থাকা আমার নিজের জীবনের কৈশোর আর তারুন্যের উচ্ছ্বাস্ময় স্মৃতি। এই একই সৈকতে এসেছিলাম একবার ক্যাডেট কলেজে থাকতে পুরো ক্লাসসহ। আরেকবার বুয়েটে থাকতে  আমাদের ব্যাচের ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্ট। সবাই মিলে দুবারই এত্তো এত্তো মজা করেছিলাম। এখনও পুরোনো বন্ধু-বান্ধবীরা এক হলে সেসব দিনের স্মৃতিচারন করতে করতে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠি। মনে হলো সেসব তো এই  সেদিনের কথা। কীরকম মুহূর্তের মধ্যে সেসব দিন পার করে ফেললাম! আরো কয়েক মুহূর্ত পড়েই তো বুড়ো হয়ে যাব। তারপর তো মরে যাব, ক্ষয়ে যাব। অথচ এই সৈকত ঠিকই তার তারুন্য ধরে রাখবে। যে এখনও জন্মেনি, সে তরুনকে প্রভাবিত করে তার বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসবে। অসম পাঞ্জা লড়ার এক হাস্যকর ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।</p><p>ঢেউএর পিঠে ঢেউ এসে গড়ে উঠে মহাসমুদ্র। ঠিক তেমনি জীবনের পরে জীবন এসে সৃষ্টি করে চলে মহাজীবনের। মহাজীবন মহাসমুদ্রের শক্তিকে জয় করার চেষ্টা করে বুদ্ধি দিয়ে। এর শুরুটা আদি, শেষটাও হোক অন্তত। কিন্তু এই অন্তত্বের মাঝে বাঁধা হয়ে দাড়ায় দুজনকার দ্বন্ধ। একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগটাও সমানে সমান। কখনো আইলা, কখনো নার্গিসরূপে মহাসমুদ্র কেন এতো নিষ্ঠুর হয়ে উঠে? আবার নদী দূষিত করে, সৈকত কলুষিত করে, এমনকি মহাসমুদ্রের গর্ভে যতোসব আবর্জনার স্তুপ জমিয়ে মহাজীবনও রাগিয়ে দিচ্ছে তাকে।</p><p>এর শেষ কোথায়?</p><p>৯<br /> শেষবার যখন দেশে গিয়েছিলাম তখনকার কথা। ছয়জন সদস্য তিনটা রিক্সা নিয়ে ভোরবেলা বাসা থেকে বেরুলাম কক্সবাজারের বাসের উদ্দেশ্য। রাইসা আর আমি মধ্যের রিক্সায় ছিলাম। সামনের রিক্সায় রাসীন আর নির্ঝর। পেছনে শ্বশুর আর শাশুরী।  সেবার ছোট ভাইয়ের বিয়ে নিয়ে এতো ব্যস্ত ছিলাম যে ভ্রমনের কোন কিছুই আমি জানতাম না। সব পরিকল্পনাই নির্ঝরের করা।</p><p>ঢাকা শহরে ভোরেও ভীড়ভাট্টা একেবারে কম থাকে না। এই ভীড়ের মধ্যে হঠাৎ করে মাঝে আমাদের রিক্সাটাই দলছুট হয়ে গেল। রিক্সাচালক যেখানে থামালো নেমে দেখি পরিবারের বাকি সদস্যরা সেখানে নেই। এদিকে আমার কাছে মুঠোফোন নেই। কারু ফোন নাম্বারও মুখস্ত নেই। রিক্সায় উঠার আগে হাতব্যাগটা নির্ঝরকে দিয়ে দিয়েছিলাম। মহা বিপদ। লক্কর ঝক্কর বাসগুলোকে দেখে মনে হলো আর যাই হোক নির্ঝর এ বাসগুলোর টিকিট কাটবে না। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে একই রিক্সা করে বাস ছাড়ার পাঁচ মিনিট আগে আসল জায়গায় এসে পৌছলাম। শ্বশুর ব্যস্ত পায়ে হাটাহাটি করছিলেন। শাশুড়ি দোয়াদরুদ পরতে শুরু করে দিয়েছিলেন। তাদের আশংকা ঢাকা শহরের জনারন্যে হারাতে তো আর বেশি সময় লাগে না। বলা যায় না কোন মলম পার্টির খপ্পরেও পরতে পারি। ছিনতাই, হাইজ্যাকারেরও তো কমতি নেই।</p><p>একেবারে শেষ মুহূর্তে আমাদের দেখে ওনাদের ধরে প্রাণ ফিরে আসলো। আর নির্ঝর আমাকে দেখে ওর সেই চিরচেনা ঠোট চাপা রহস্যময় হাসিটি দিল। সে মুহূর্তে যার মানে দাড়ায় &#8211; আমি জানতাম এমনটা হবে।</p><p>নির্ঝরের ধারণা অঘটন আর আমি &#8211; দুটোই যেন সমার্থক শব্দ, একজন আরেকজনের ছায়াসঙ্গি। আমি কোন মিশনে থাকলে একটা না একটা অঘটন ঘটবেই। তবে পরিশেষে সব বাঁধা জয় করে কিভাবে কিভাবে জানি মিশন সফল করে ফেলি। ঠিক যেন জেমস বন্ড।</p><p>৭-১৪-১০</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/26391/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>73</slash:comments> </item> <item><title>নতুনের আগমন</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/24569</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/24569#comments</comments> <pubDate>Wed, 19 May 2010 18:56:34 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[খবর]]></category> <category><![CDATA[ময়মনসিংহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=24569</guid> <description><![CDATA[দিন আসে দিন যায়। সময়ের ঘোড়সওয়ার আমরা পুরাতন হতে হতে নতুনদের দেখি। আবার আশান্বিত হই। উদ্বেলিত হই। নিজের এক হাতের জায়গায় দশ হাতের অস্তিত্ব অনুভব করি। একতাই বল &#8211; সেই ছোটবেলায় শেখা বাণীটার মর্ম অনুধাবন করি। স্বপ্ন শাণিত করি। ভাবনায় ভেসে উঠে &#8211; হবে। যা হওয়ার কথা ছিল, হয়নি &#8211; তা হবে। যা হওয়ার কথা [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>দিন আসে দিন যায়। সময়ের ঘোড়সওয়ার আমরা পুরাতন হতে হতে নতুনদের দেখি। আবার আশান্বিত হই। উদ্বেলিত হই। নিজের এক হাতের জায়গায় দশ হাতের অস্তিত্ব অনুভব করি। একতাই বল &#8211; সেই ছোটবেলায় শেখা বাণীটার মর্ম অনুধাবন করি। স্বপ্ন শাণিত করি। ভাবনায় ভেসে উঠে &#8211; হবে। যা হওয়ার কথা ছিল, হয়নি &#8211; তা হবে। যা হওয়ার কথা &#8211; তাও হবে। নতুন প্রাণ, নতুন আশা। আবারও নতুন করে স্বপ্ন দেখা।</p><p>আমি তখন তৃতীয় কী চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ি। সে সময়টাতে কুমিল্লায় ছিলাম। একদিন এক বান্ধবীর সাথে তার বাসায় গেলাম। বান্ধবীর ছোট বোনকে দেখলাম। চোখদুটো ছিল খুব দৃষ্টিকাড়া। তারপর আবার ঢাকায় চলে আসলাম &#8211; ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলাম। তখন দশম শ্রেনীতে ছিলাম। কলেজে একটা উৎসব উৎসব ভাব। নতুন একটা ব্যাচ আসছে। মনে মনে আমি নিজে কিছুটা উত্তেজিত ছিলাম কারণ এই ব্যাচে আমার এক খালাতো বোন আসছে। নাম প্রীতি। ডাইনিং রুমে নিজের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি &#8211; হঠাৎ দেখি এক জোড়া খুব গভীর কালো চোখ। চোখদুটোকে খুব পরিচিত বলে মনে হলো। কিন্তু ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না কোথায় দেখেছি। পরের প্যারেন্টস ডেতে দেখা হলো আমার সেই কুমিল্লা শহরের ছোট্টবেলার বান্ধবীর সাথে। ওর সেই ছোটবোনটি সে বছর ক্যাডেট কলেজে ঢুকেছে। সমাধান হলো সেই গভীর কালো চোখের রহস্যের।</p><p>ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হওয়ার পর জুনিয়রদের সাথে তেমন একটা যোগাযোগ থাকে না &#8211; যদি না কমন কোন প্রেক্ষাপট থাকে। কিভাবে কিভাবে জানি ক্ষীণ হলেও আমার সেই মেয়েটির সাথে যোগাযোগ ছিল। সেই মেয়েটিই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল সিসিবির সাথে। বলার মতো মেয়েটির অনেক গুণ। সেসব কারণে নয়, মেয়েটির অসম্ভব উন্নত মানবীয় গুণাবলীর কারনে সে আমার একজন খুব পছন্দের মানুষ।<br /> গত ১৩ই মে সেই মেয়েটি প্রথম মা হলো। ছেলের নাম ইয়ান। আমি মনে প্রাণে দোয়া করছি ইয়ানের সুস্থ সুন্দর জীবন এবং এই নতুনের আগমনে উড়ে যাবে ধরনীর বুকে অনেকদিন ধরে জমে থাকা কিছু ময়লা।</p><p>যারা বুঝে যাওয়ার তারা এতোক্ষণে সেলিনার কথা বুঝে গেছে নিশ্চয়।</p><div id="attachment_24573" class="wp-caption aligncenter" style="width: 650px"><a href="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2010/05/GetAttachment.jpg"><img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2010/05/GetAttachment.jpg" alt="" title="GetAttachment" width="640" height="480" class="size-full wp-image-24573" /></a><p class="wp-caption-text">Yan's photo</p></div> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/24569/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>54</slash:comments> </item> <item><title>দুখিনী দুঃখ করো না</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/23330</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/23330#comments</comments> <pubDate>Sat, 10 Apr 2010 14:57:10 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[উপন্যাস]]></category> <category><![CDATA[ময়মনসিংহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=23330</guid> <description><![CDATA[[ বখাটের দৌরাত্ম্যে কিশোরীর আত্মহত্যা - পত্রিকার এরকম দুঃখজনক সংবাদে ইচ্ছে হলো কিশোরী হয়ে আত্মহত্যার আগের মুহূর্তটিকে অনুভব করার। কেন অকাল মৃত্যু? কী তার প্রতিকার? ভাবনার ফলস্বরুপ এক উপন্যাসের প্লট মাথায় আসলো। জীবনের বিভিন্ন সময়টা দেখানোর জন্য উপন্যাসের সময়কালের পরিধিটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে।  জানি না শেষ পর্যন্ত কী দাড়ায়।] অধ্যায়ঃ১ কুমিল্লা &#8211; ১৯৭৬, ডিসেম্বর ইচ্ছেটা অনেকদিনের। [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>[ বখাটের দৌরাত্ম্যে কিশোরীর আত্মহত্যা - পত্রিকার এরকম দুঃখজনক সংবাদে ইচ্ছে হলো কিশোরী হয়ে আত্মহত্যার আগের মুহূর্তটিকে অনুভব করার। কেন অকাল মৃত্যু? কী তার প্রতিকার? ভাবনার ফলস্বরুপ এক উপন্যাসের প্লট মাথায় আসলো। জীবনের বিভিন্ন সময়টা দেখানোর জন্য উপন্যাসের সময়কালের পরিধিটা অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে।  জানি না শেষ পর্যন্ত কী দাড়ায়।]<br /> অধ্যায়ঃ১</p><p>কুমিল্লা &#8211; ১৯৭৬, ডিসেম্বর</p><p>ইচ্ছেটা অনেকদিনের। ছোট মামিকে নিয়ে ধর্মসাগরের পাড়ে বেরাতে যাব। আসলে ঠিক অনেকদিনের না, মামি এখানে আসার পর থেকেই এরকমটা ভাবছিলাম। আবার উনার জন্যই সেখানে যেতে চাচ্ছি ঠিক সেটাও আসল কারণ নয়। একটা সুযোগ নেওয়া আর কি। মনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা ডাহুকটা প্রায়ই হু হু করে কেঁদে উঠে। ওখানটায় গেলে অন্তত দুধের স্বাদ ঘোলে মিটতো।</p><p>আজ সকালে ঢাকা থেকে আমাদের দোকানে ছোটমামার ফোন আসার পর থেকেই খুব জোরসে ইচ্ছা পূরণে লেগে গেলাম এবং সফলও হলাম। আম্মা মামাতো ভাই দুবছরের আকাশকে দেখবে। শুধু আমি আর মামি যাব।<br /> ঠাকুরপাড়ার রামকৃষ্ণ মিশন থেকে ধর্মসাগরের পাড় খুব একটা কম দূরের পথ নয়। আমাকে যাতে ছোট মেয়ে ভেবে ঠকাতে না পারে সে জন্য রিক্সাওয়ালার সাথে বেশ দরদাম করছিলাম। শেষে দফারফা হলো পাঁচ টাকায়। আমার দরদাম করা দেখে ছোট মামি মনে হয় একটু মুখ টিপে হাসছিলেন। অবশ্য এটা আমার মনের ভুলও হতে পারে। কারণ উনি আমার থেকে বয়সে সাত-আট বছরের বড় হলেও আমাদের সম্পর্কটা একদম বন্ধুর মতো। কোন লুকোচুরি নেই।</p><p>শীতের মাঝামাঝি। কিন্তু দিনটা খুব ভালো। কুমকুম শীতের শিশিরে ভেজা ভেজা ঘাস। অথচ মিষ্টি রোদে ঝলমল করে হাসছে দিনটা। আজকে বাইরে না বেরুলে অপরাধ হতো। দুদিন পর মামি চলে গেলে আমার কতো খারাপ লাগবে টুকটুক করে সে কথাই বলছিলাম। রিক্সাটা যখন মর্ডান স্কুলের সামনের রাস্তাটার উপর বাঁক নিল তখন প্রসঙ্গ পালটে মামি বলে উঠলো, ’তোদের এই শহরটা তো মনে হয় পানির উপর ভাসছে। ঘর থেকে বেরুলেই তো দিঘি দেখি। আবার আরেকটা দিঘি দেখতে এতোদূর যাওয়া কেন?’<br /> ’ওখানে গেলে বুঝবে কেন যাওয়া।’<br /> পাশে তাকিয়ে দেখলাম দীপিকা সিনেমা হল। ছোট মামীর খুব সিনেমা দেখার শখ।  বাইরে যাবার প্রসঙ্গ উঠলেই উনার প্রথম পছন্দ থাকবে  সিনেমা দেখা। গত পনের দিনে অন্তত তিনটা সিনেমা দেখেছি। তার মধ্যে মামির পাল্লায় পরে নয়নমণি ছবিটা দুইবার দেখতে হয়েছে।  ছবিটা আসলেই খুব ভালো। তবে তা আমার দুঃখ বাড়িয়ে দিয়েছে দ্বিগুন। তাই চারবারের বার মামিকে সিনামা হলমুখো না করে দিঘিমুখো করলাম। উনি চলে গেলে সেখানে আমি আর কার সাথে যাব? আর ঠিক করেছি মামিকে সব বলে দিব। ভেতরের চাপটা একদমই সহ্য করতে পারছি না। তবে উনি বিশ্বাসঘাতকতা করলে খুব বিপদে পড়ে যাব। তখন সবাই আসল চেহারাটা জেনে আমাকে খুব খারাপ ভাববে। সবচেয়ে বেশি ভয় দাদামনুকে নিয়ে। আমার থেকে মাত্র দুবছরের বড়। কিন্তু মাথার উপর ছড়ি ঘোরাবে এমন ভাবে যেন আমার আরেক বাবা।  আগামী বছর থেকে নবম শ্রেনীতে ক্লাস শুরু করবো। এ বছরের মাঝামাঝিতে যখন বিভাগ ভাগাভাগির প্রশ্নটা আসলো তখন কোন ঝুঁকি না নিয়ে ঠিক করলাম মানবিক বিভাগেই পড়বো। বিজ্ঞান নিয়ে পড়লে যে পারতাম না তা নয়। ইতিহাস আসলে আমার প্রিয় বিষয়। আর তাছাড়া অংকে আমার একটু দুর্বলতা আছে। কিন্তু এই নিয়ে দাদামনু আমাকে অযথা যন্ত্রণা করতে ছাড়বে না। অংকে একশতে চল্লিশ পাওয়াটা যেন মানুষ খুন করার মতো মহা অপরাধ। দাদামনুটা আসলে বড্ড বেশি হিংসুটে। সব সময় সবাই আমার ভালো বলছে তো এটা তার সহ্য হয় না। তাই খালি আমার পেছনে লেগে থাকে।</p><p>স্কুল থাকার কারণে এ রাস্তার উপর আস্তে ধীরে একটা দুটো করে বইপত্র, স্কুল কলেজের প্রয়োজনীয়  উপকরণের দোকান গড়ে উঠছে। গত বছর আব্বা একটা বইয়ের দোকান কিনলেন। সরস্বতি স্টোর নামটা বদলে আইভি স্টেশনারী করে দিয়েছেন। আমার নামে নাম। এ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তাই খুব লজ্জা হয়। ভাগ্যিস এখন আর মর্ডান স্কুলে পড়ি না। আব্বার নিজের ভালবাসাটা এভাবে প্রকাশ করাটা মাঝে মধ্যে আমার কাছে আদিখ্যতা বলে মনে হয়। আরোও তো তিন ভাইবোন আছে। দাদামনু এমনি এমনিই আমার পেছনে লেগে থাকে না।</p><p>আইভি স্টোরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ছোটমামি বললেন, ‘ দেখবি তোর মামার আর কোন টেলিফোন আসলো কিনা?‘<br /> অগ্যতা নামতে হলো। সেই সাথে বুঝে গেলাম মামির চলে যাওয়া নিয়ে আমি যতোটা বিরহে আছি, উনি ঠিক ততোটাই অস্থির নিজের সংসারে ফিরে যাওয়া নিয়ে।<br /> হায়দার ভাই এই দোকান দেখাশোনা করেন। আমাকে দেখে হই চই শুরু করে দিলো। দোকানে দুজন খরিদ্দার ছিল। তাদেরকে আমাকে দেখিয়ে বললো, ‘এই যে আইভি। এর নামেই দোকান।‘<br /> হায়দার ভাইকে নিয়ে এই ভয়টাই আমি পাচ্ছিলাম। আম্মা যে  কেন এই রকম একটা লোককে চাকুরী দিল কে জানে। শুধু শুধু বেশি কথা বলে। দুজনের মধ্যে একজন বলে উঠলো, ‘তোমার বড় ভাই আপন জেলা স্কুলে থাকতে আমার দুই ক্লাস নীচে পড়তো। মর্ডান স্কুলে যখন পড়তে তখন টাউন হলে তোমার নাচ দেখেছিলাম।’<br /> অচেনা কেউ আমার তিন বছরের পুরোনো নাচের কথা বলাতে অনুভব করলাম মাটি থেকে আমার পা দু ইঞ্চি উপরে উঠে গেল। দুম করে হায়দার ভাইয়ের উপর তেতে উঠা রাগটা হয়ে গেল পানি। এই দুজনের সাথে ভাইয়ার এখন কোন যোগাযোগ থাকার কথা নয়। আমাদের সাথেই দেখা হয় কালেভদ্রে। সেই ক্লাস সেভেনে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে চলে যাওয়ার পর সেখান থেকে বের হয়ে ভাইয়া সামরিক বাহিনীতে ঢুকলো। আম্মাকে প্রায়ই মজা করে বলি, তোমার বড় ছেলে দূরে দূরে থাকবে বলেই কি নাম রেখেছিলে আপন?<br /> আমি যখন হায়দার ভাইয়ের সাথে কথা বলছিলাম, সেই দুজন তখন আমার দিকে তাকিয়েই ছিল। একটু ভাব দেখানোর জন্য ফোনটা চাইলাম। হায়দার ভাই সেটা টেবিলের উপর উঠিয়ে দিলেন। এখন কুমিল্লা শহরে  টেলিফোন এক মহার্ঘ বস্তু। বাসায় না হোক দোকানে হলেও একটা টেলিফোন যে আমাদের আছে সুযোগ পেলেই বিষয়টা আর দশজনকে  জানাতে ইচ্ছে করে। নাম্বার ঘোরানোর গোল চাকতিটার শুন্যের ঘরে ছোট্র একটা তালা লাগানো আছে। চাবিটা থাকে আম্মার কাছে। ভান করে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে এমন ভাবে উকিঁঝুঁকি মারলাম যেন ফোনের চাবিটা খুঁজছি। আমি আবার অভিনয়েও খুব পাকা। আমাদের শাপলা শালুক ক্লাবের পরিচালক ফজলু ভাই আগে থেকেই বলে রেখেছেন আগামী বছর রক্ত করবীর নন্দিনীর চরিত্রটা একদম আমার জন্যই বাঁধা। নাচবো, গাইবো মঞ্চ মাতাবো &#8211; এসব এখন আর আমাকে অতো আহলাদিত করে না। বিষয়টা হয়ে গেছে মাছ-ভাতের মতো। তবে এখন এরকম দুজোড়া চোখের তাকিয়ে থাকার মতো নতুন এক উপসর্গ শুরু হয়েছে। বুঝতে পারছি বড় হয়ে যাচ্ছি। এই বুঝতে পারাটা কখনও রোমাঞ্চিত করে, আবার কখনও খুব মন খারাপ করে দেয়। একরামের কী দরকার ছিল আমাকে প্রেমপত্র দেওয়ার? কী ভালো বন্ধু ছিলাম আমরা। আমার নাচ বা গানের ও ছিল বাঁধা তবলাবাদক। ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায় যে আমি একজন বন্ধু হারালাম। হারালাম এতোদিনকার তবলাবাদককে। তাও আবার আমারই সুপারিশে।<br /> শেষ পর্যন্ত চাবিটা পেলাম না এমন ভাব করে কোনদিকে না তাকিয়ে গট গট করে সোজা রিক্সায় উঠে পরলাম। আমি নিশ্চিত যে পেছনে দুজোড়া অভিভূত চোখ তখনো আমাকে অনুসরণ করে চলছে।</p><p>রিক্সাটা যখন ঝাউতলার পথ ধরে প্রায় ধর্মসাগরের কাছে চলে আসলো তখন ছোটমামিকে বললাম চোখ বন্ধ করতে। ছোটমামি খুব ভালো। আমি কিছু বললে শুনে। চোখবন্ধ মামির হাতটা ধরে এই বিশাল দিঘির এক পাশে বাঁধানো বেঞ্চিতে এসে দুজনে মিলে বসলাম।<br /> ‘এবার চোখ খোলো।‘ অধির আগ্রহে কথাটা বললাম।<br /> ছোটমামি তাকিয়ে আছে দিঘির দিকে। আর আমি তাকিয়ে আছি ওনার চোখের দিকে। ধীরে ধীরে মু©তার মায়াবী রঙ্গে সে চোখ রঙ্গিন হয়ে উঠলো। উনি শুধু মুখে বললেন, ‘আমার কল্পনাকে ছাড়িয়ে গেছে।‘<br /> আসলেই খুব সুন্দর। দিঘির বিশালত্ব, স্বচ্ছ টলমল জল, চারপাশের শুনশান নিরবতা সব মিলিয়ে কেমন জানি এক মায়াবী পরিবেশ। ছোটমামি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা এই শীতকালে পানিতে ছোট ছোট ঠেউ কেন?‘<br /> ‘এটা এই দিঘির রহস্য।‘ কথাটা বলতে গিয়েই বুকের ভিতর ঘাপটি মেরে থাকা ডাহুকটা একটা কুহু ডাক দিলো। গত বছর হিরণ ভাইকে আমি ঠিক এই প্রশ্নটাই করেছিলাম আর উত্তরে উনি ঠিক এ কথাটাই বলেছিলেন।</p><p>আরো কিছুক্ষণ এখানটায় বসে রানী কুঠিরের দিকে এগুলাম। আজ মামিকে কথায় পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় খুব তড়িঘড়ি করে ওনাদের বিয়েটা হয়েছিলো। সে বছর মামির মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। সেসময়টাতে তো সবার জান নিয়ে পালিয়ে বাঁচা। কারো বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া এক চরম বিলাসিতা। আর তাছাড়া ছোট মামার বিয়েতে সেরকম আনুষ্ঠানিকতাও কিছু ছিল না। দেশ স্বাধীন হবার পর পরের বছর যখন প্রথম ছোটমামিকে দেখলাম তখন থেকেই আমাদের খুব ভাব হয়ে গেল। ঢাকায় থাকলেও ছোটমামির সাথে আমার প্রায়ই চিঠিতে যোগাযোগ হয়। মামির কাছ থেকেই জেনেছিলাম ওনাদের এলাকার এক ছেলে নাকি মামিকে খুব পছন্দ করতো। যুদ্ধের সময় শান্িত কমিটি যোগ দিয়ে প্রায়ই মামিদের বাসার সামনে টহল দিতো আর ওনার বাবাকে কোন ভয় নাই বলে আশ্বস্ত করতো। তার হাত থেকে বাঁচাতেই নাকি মামিকে তড়িঘড়ি করে বিয়ে দেওয়া হয়। আমিও দুষ্টুমী করে জিজ্ঞেস করি,‘তোমারও কি একটু একটু পছন্দ ছিল?’<br /> ’বালাই শাট। ঐ মোনাফেক রাজাকারকে পছন্দ করতে যাব কোন দুঃখে? সেসময়টায় কতো যে হিন্দু মারতে সাহায্য করেছে তার ইয়াত্তা নেই।’<br /> উত্তর বঙ্গের মেয়ে বলে মামির অনেক শব্দকে আমার কাছে নতুন লাগে। আবার আমরা যখন ’সে গেছে’ না বলে ’হেইমিয়া গ্যাসে’ বলি &#8211; তা শুনে মামি হেসে কুটি কুটি।<br /> ’ঐ লোক এখন কোথায়?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।<br /> ’ভেবেছিলাম যুদ্ধের পর একেবারে শূলে উঠবে। কিন্তু কোথায় কী? তাও এতোদিন লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতো। এখন তো শুনি এলাকায় আবার সদর্পে ঘুরে বেরাচ্ছে। ইশ হঠাৎ করে দেশটার যে কী হয়ে গেল?’<br /> দেশটা কোন দিকে যাচ্ছে, কী হচ্ছে এসব এখন বড়োদের নিত্য নৈম্যত্তিক সংলাপ। আম্মা তো বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে মারা যাওয়ার ঘটনাটা এখনও হজম করতে পারেননি। প্রায়ই এটা নিয়ে এমনভাবে বিলাপ করতে থাকবেন যে যেন নিজের বাবা মারা গেছেন। অথচ এ ঘটনার আগে আম্মার প্রতিদিনকার অভিযোগ ছিল বিশ টাকা মনের চাল এই চার বছরে দুইশ টাকায় উঠলো কি করে? এসব দেখলে আমার কখনও বড় হতে ইচ্ছে করে না। এ বয়সেই আমার মনে যে পাহাড়সম দুঃখ বড় হলে তার সাথে যদি দেশ থেকে শুরু করে চাল ডালের হিসেব যোগ হয় তাহলে  বড় হলে দুঃখের ভারে বাঁচবো কী করে?</p><p>’আচ্ছা মামি, প্রেম জিনিষটা আসলে কী?’ আমার গোপন কথাটা বলার জন্য বিষয়বস্তুর মোড় ঘুরিয়ে দিলাম। রানী কুঠিরের শান বাঁধানো ঘাটের নিঝুম পরিবেশে এই তো সুযোগ।<br /> ’ধর্মসাগরের সামনে দাড়িয়ে প্রথমেই মনে হলো আজকে তোর মামাটা যদি পাশে থাকতো! এটাই প্রেমরে।’<br /> ’মামার জন্য তোমার এতো প্রেম?’ ছোট মামার মতো গোট্টাগোট্টা লোকেরও যে কেউ প্রেমে পড়তে পারে তা জেনে আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম। এর আগে আমার ধারণা ছিল কোন মেয়ের প্রেম পাবার জন্য ছেলেটাকে অন্ততঃপক্ষে রাজ্জাকের মতো মিষ্টি মিষ্টি চেহারা কিম্বা জাফর  ইকবালের মতো সুদর্শন পুরুষ হতে হবে। কয়জন আর হিরণ ভাইয়ের মতো বাস্তব জীবনের নায়কদের দেখেছে।<br /> ’তোর মামা মানুষটা ফেরেস্তার মতো। তুই যখন আরো বড়ো হবি তখন তোকে একটা খহূভ গোপন কথা বলবো। তুই বিশ্বাসই করতে পারবি না এমন কথা।’<br /> ওহ, মামির কথা শোনার আর ধৈর্য্য নেই আমার। আমি ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছি আমার কথা বলার জন্য। কিন্তু কিভাবে শুরু করবো?<br /> ’চল দিঘিটার ঐ পাড়ে তোমাকে আরেকটা জায়গায় নিয়ে যাই। অবশ্য কিছুদূর হাঁটতে হবে।’ আবারও মামির প্রসঙ্গ পালটে আমার প্রসঙ্গে নিয়ে আসার চেষ্টা।</p><p>হালকা হালকা টুকরো টুকরো জটলা অতিক্রম করে, ঝরা পাতা মাড়িয়ে, সারিবদ্ধ নারকেল গাছের শৃংখলা পেড়িয়ে, খুব ধীরে ধীরে জাকিয়ে বসা শেষ বিকেলের হিমের মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ শব্দ। যতোই লাল বোগেনভেলিয়ায় ছাওয়া কালো গেটেটার কাছে চলে আসছি শব্দটা বেড়েই চলছে। হিরণ ভাই এখন আর এখানে নেই। গত বছরই পুরো পরিবারসহ লন্ডনে চলে গেছেন।  তারপরও ওনার দাদার এই বাড়িটা এক পলক দেখলেই ভেতরের ডাহুকটা মিষ্টি সুরে গান গেয়ে উঠে। মনে হয় আমি যেন হিরণ ভাইয়েরই দেখা পেলাম।<br /> আসলে প্রায় চৌদ্দ বছরের একটা কিশোরী মেয়ে না জেনেশুনেই মানবমনের চিরন্তন প্রতীকি বন্দনায় নিজেকে সমর্পিত করেছিল। যাকে চাইলেই দেখা যায় না, যে অনুভূতি চিরন্তন অধরা, যে আবেগকে কখনই ছোঁয়া যায় না, যে গায়েবী ডাহুক-ডাক অকারণে মন উতলা করে তোলে &#8211; সেসব কষ্ট আর রহস্য যেন এই বাড়িটার মতো ধীরে ধীরে স্পশিত দৃশ্যমান বস্তু হয়ে উঠছে।<br /> চলবে &#8230;</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/23330/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>22</slash:comments> </item> <item><title>অতীত বয়ান &#8211; কেউ যদি শুনতে চায় (নারীকথ্ন)</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/22077</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/22077#comments</comments> <pubDate>Fri, 12 Mar 2010 12:10:46 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[আলোচনা]]></category> <category><![CDATA[ময়মনসিংহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=22077</guid> <description><![CDATA[ ১ নারীদের জন্য আলাদা দিবস কেন? প্রথমেই একটা কুইজ দিয়ে শুরু করি। এক গাড়ি দুর্ঘটনায় বাবা মারা গেলেন আর ছেলে মারাত্মকভাবে জখম হলো। অপারেশন থিয়েটারে রোগীর চেহারা দেখে ডাক্তার চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘এটা তো আমার ছেলে।‘ কিভাবে সম্ভব? এক &#8211; দুই &#8211; তিন &#8211; সময় শেষ। যে নারীকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে পরিগণিত করে তার পক্ষেই মুহূর্তের মধ্যে একজন মহিলা ডাক্তারের [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p><img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2010/03/mom_dau1.JPG" alt="mom_dau[1]" title="mom_dau[1]" width="407" height="504" class="aligncenter size-full wp-image-22078" /><br /> ১<br /> নারীদের জন্য আলাদা দিবস কেন?</p><p>প্রথমেই একটা কুইজ দিয়ে শুরু করি।<br /> এক গাড়ি দুর্ঘটনায় বাবা মারা গেলেন আর ছেলে মারাত্মকভাবে জখম হলো। অপারেশন থিয়েটারে রোগীর চেহারা দেখে ডাক্তার চিৎকার দিয়ে উঠলেন, ‘এটা তো আমার ছেলে।‘<br /> কিভাবে সম্ভব?</p><p>এক &#8211; দুই &#8211; তিন &#8211; সময় শেষ।</p><p>যে নারীকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে পরিগণিত করে তার পক্ষেই মুহূর্তের মধ্যে একজন মহিলা ডাক্তারের কথা ভাবা সম্ভব। সঠিক উত্তরদাতাদের অভিনন্দন। আর বাকী সবার জন্য উত্তর &#8211; এ কারণেই নারীদের জন্য একটা দিন সংরক্ষণ করা হয়েছে।</p><p>আমি কি নারীবাদী? মাথায় ঘুরপাক করা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুগল ঘেটে দুটো সংজ্ঞা বের করলাম। বলাবাহুল্য সবচেয়ে নরম দুটো সংজ্ঞা নিয়েছি।<br /> তাকেই নারীবাদী বলে -<br /> ১। যে নারী নিজেকে যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যবহার হতে দেয় না।<br /> অথবা<br /> ২। যে জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতা আর সমতাতে বিশ্বাস করে।</p><p>প্রথম সংজ্ঞা অনুযায়ী আমি একজন নারীবাদী। দ্বিতীয় সংজ্ঞা অনুযায়ী না। কারণ বোয়ামের শক্ত মুখ খুলতে গেলে এখনও নির্ঝরকে ডাকি। রান্নাঘরের উপরের তাক থেকে জিনিষ নামাতে গেলে কষ্ট করে টুলের সাহায্য না নিয়ে নির্ঝরের সাহায্য নিই। আবার হেসেলের কোন কাজেই নির্ঝরকে হাত দিতে না দিয়ে পুরোটা আমার নিয়ন্ত্রনে রেখেছি। সবাই নিশ্চয় ভাবছে মেয়েটা কতো পতিব্রতা। আসল রহস্য হলো এর থেকে সময়ে সময়ে বড় ফায়দা লোটা যায়। এই যেমন সেদিন নির্ঝর বললো, শান্তা তোমার গাড়ির সার্ভিসিং এর তারিখ পার হয়ে গেছে। এখনই যাও।<br /> আমি উত্তর দিলাম, চুলায় মাছটা মাত্র বসিয়েছি। তুমি রান্নাটা দেখ, আমি যাচ্ছি।<br /> তৎক্ষণাৎ পতির প্রতিত্তুর, না না। তুমি দেখ। আমিই যাচ্ছি।</p><p>আমার কাছে সমতার থেকে পরিপূরক শব্দটা আমার বেশি পছন্দের। গত বার বছর ধরে একটা ছেলের সাথে মোটামুটিভাবে শান্িতপূর্ণ সহাবস্থান করে আমার এই বোধোদয়। জীবন থেকে নেওয়া।</p><p>২<br /> ক্যাডেট কলেজে থাকতে নিজেকে আমি যে আলাদা কিছু, মানে নারী জাতীয় কিছু একটা, এই অনুভূতিটা তেমন বোধ করিনি। অধিকাংশই বোধহয় আমার মতোই ছিল। বাইরের পৃথিবী একটু অপরিচিত লাগতো। এখন হয়তো ব্যাপারটা ডালভাত। কিন্তু একানব্বই সালের দিকে ইচ্ছে হলো বলে মেয়েরা ধুম করে ফুটপাথে ফুচকা খেতে বসে গেলাম কিম্বা সানরাইজের কাছে মিষ্টির দোকানে ঢুকে সেখানকার বেঞ্চ-টেবিলে আড্ডা দিতে শুরু করলাম &#8211; বিষয়টা আমাদের কাছে কিছু না মনে হলেও সমবয়সী নন-ক্যাডেট মেয়েদের কাছে ভ্রুকুটিতুল্য। দৈত্যকুলে প্রহçাদের মতো আমাদের অতীব রমণীয় ক্যাডেট ম একদিন বলল, আমরা যে এইসব খারাপ কাজ করছি তা ওর মামীকে আমাদের সাথেই কোচিং করা একটা মেয়ে বলে দিয়েছে। ম আবার ছিল ক্লাসের ফাস্ট-সেকেন্ড হওয়া ছাত্রী। জানি না এই কথা শুনেই কিনা  রেজালট বেরুনোর পর পর সানরাইজে কোচিং করা মেয়েরা সব ধুপধাপ করে দেশের বাইরে চলে গেল। শুধু ম আর আমি রয়ে গেলাম এবং মকে অনুসরন করে আমিও একজন নারী হওয়ার চেষ্টা করতে লাগলাম। ম কতোটা পেরেছে তা জানি না তবে বুয়েট বাকী কাজটা করে দেয়।</p><p>আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিলো তিরানব্বইয়ের ২৬শে সেÌেটম্বর। সেই ৯৩ থেকে ৯৮ &#8211; বুয়েট থাকাকালীন সময়টাতে নিজেকে খুব বেশি নারী নারী বলে মনে হতো। বুয়েটে আমাদের ব্যাচে সাড়ে পাচঁশ ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে শুধু পঞ্চাশ জন মেয়ে। আগে পরে সব ব্যাচেই একই অবস্থা। সংখ্যালঘুরা এমনিতেই দৃষ্টব্য আর মেয়ে হলে তো কথাই নেই। বুয়েটটা ছিল বড্ড বেশি ছেলেময়।<br /> এক স্যার ছিলেন একস-ক্যাডেট। জীবনে নাকি কখনও দ্বিতীয় হননি। একজন ভূতপূর্ব অর্থমন্ত্রীর নামে নাম। ক্লাসে দেখতাম মেয়েদেরকে খুবই অসম্মান করে কথা বলতেন। একদিন তো বলেই ফেললেন বুয়েটে মেয়েরা হচ্ছে ছেলেদের বিনোদন। কথাটা মনে পড়লে স্যারের উপর এখনও রাগ হয়। সেই স্যার শুধু যে নিম্ন মানসিকতা ধারন করতেন শুধু তাইই নয়, ক্লাসেও ঠিক সময়মতো আসতেন না, পড়াতেন না। শিক্ষকতার অধিকাংশ সময়ই ব্যয় করতেন নিজের ব্যক্তিগত উন্নয়নের কাজে। ফলস্বরূপ উনার ছিল নাকি সবচেয়ে বেশি পাবলিকেশনস। আর টপাটপ প্রমোশন। নিজের ধান্ধায় ব্যস্ত থাকা আরকি। সেই থেকে আমার ধারণা যারা নারীদের সম্মান করতে পারে না তারা মানুষ হিসেবেও তেমন ভালো না। অবশ্য শুধু এই একজন স্যারকে দোষ দিয়ে কী হবে? আমরা মেয়েরাই কী সবাই নিজেদের সম্পর্কে সঠিক সম্মানজনক ধারণা পোষণ করি?</p><p>৩<br /> আমার নানীরা ছিলেন দুবোন, একভাই। বৃটিশ আমলে ভাই গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ায় পশু চিকিৎসার উপর পড়াশোনা করতে। নানীর ছোটবোন &#8211; ছোটনানী ১৯৪৫ সালে পাবনা এডোয়ার্ড কলেজ থেকে øাতক ডিগ্রি লাভ করার পর অবিবাহিত অবস্থাতেই চাকুরী করতে পশ্চিম পাকিস্থানের করাচীতে চলে যান। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার উনার পাবনা এডোয়ার্ড কলেজ বিষয়ক একটা লেখায় ছোটনানিকে সে কলেজের প্রথম মুসলিম মহিলা গ্রাজুয়েট হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। মেট্রিক পরীক্ষা পাশের পর পরই নানীর বিয়ে হয়ে যায় ১৯৩৬ সালের দিকে। কথিত আছে নানা নাকি নানীর বাড়ির উঠোনে এসে নানীর সাথে বিয়ে না দিলে আত্মহত্যা করবেন বলে হুমকি দিয়েছিলেন। নানীর বাবা-মা তখন কলকাতা থেকে এসে সদ্যই পাবনায় আশ্রয় গড়েছিলেন। এলাকার একজন প্রভাবশালীর ছেলের এই হুমকিতে আর দেরী না করে তাড়াতাড়ি নানার সাথে নানীর বিয়ে দিয়ে দেন। তবে নানীকে কোনদিন শ্বশুরবাড়ি পাঠাননি। আমার নিজের নানীর ছিল খুব গল্পের বই পড়ার নেশা। খুব সুন্দর করে গল্প বলতে পারতেন। উনার হাত ধরেই আমার রূপকথার রাজ্যে প্রবেশ। আমার মা মূলত নিজের নানা-নানীর আদরেই বড় হয়েছেন। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে নিজের এলাকায় যখন মেয়েদের বিজ্ঞান পড়ার তেমন কোন সুবিধা ছিল না, সে সময়টাতে আম্মা মেট্রিকে বিজ্ঞান বিভাগে মেধা তালিকায় স্থান করেছিলেন। তবে আম্মার আসল প্রতিভা ছিল সাহিত্যে। খুব সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখতেন।<br /> আমার একমাত্র ফুফুকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, আচ্ছা ফুফু, আপনারা মাত্র একভাই একবোন। অথচ আপনি লেখাপড়া শিখলেন না, ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন মাত্র আর আপনার চাচাতো বোনরা সেই পঞ্চাশের দশকে ঢাকার ইডেন কলেজে গিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। এর কারণটা কী?<br /> ফুফুর উত্তর ছিল, সে সময় গ্রামে ক্লাস ফাইভের বেশি পড়ার সুযোগ ছিল না। লেখাপড়ার জন্য চাচাতো বোনদের চাচারা শহরে নিয়ে যায়।  কিন্তু লেখাপড়া করতো বলে গ্রামের সবাই তাদের নিন্দা করতো। ফুফু দেখলো যে লেখাপড়া না করলে লোকে ভালো বলে। সেই লোকের ভালো শোনার জন্য ফুফু লেখাপড়া ছেড়ে দিলেন। নইলে বাপ-চাচারা নাকি অনেক জোর করেছিলেন।<br /> ফুফু উনার জীবনটা অতোটা সম্মানের সাথে কাটাতে পারেননি। বিশেষ করে এই বৃদ্ধ বয়সে মনের মধ্যে অনেক দুঃখ নিয়েই দিন পার করতে হচ্ছে। লেখাপড়া শিখলে কি ফুফুর জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো? তাই বা বলি কী করে। আমার আগের প্রজন্মে আম্মার দিককার মেয়েরা তো সবাই লেখাপড়া শিখেছিলেন। তারাও কি খুব একটা সুন্দর জীবন কাটাতে পেরেছিলেন? সবারই কিছু না কিছু নাগরিক সমস্যা ছিল।ইচ্ছা থাকা সত্বেও কেউ কোন ক্যারিয়ার করতে পারেননি। এমনকি ছোটনানির মেয়ে বিয়ের আগে আমেরিকা থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসেও শুধু ঘর-সংসার করে গেছেন। এক ধরনের অতৃপ্ততা তাদের ঘিরে থাকতো। যখন নানা ধরনের বিশ্লেষনে মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন জাগতে শুরু করেছে তখন আর আম্মা নেই। শাশুড়িকে কাছে পেয়ে উনাকে প্রশ্ন করতাম। উনারও মোটামুটি একই অবস্থা। ষাটের দশকে ঢাকা ভার্সিটি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে øাতক ডিগ্রি নিয়েছিলেন। প্রথম জীবনে বাবা পরবর্তী জীবনে স্বামী বাইরে চাকুরী করতে দেননি। প্রগতিশীল মানসিকতা দিয়ে তিন ছেলেমেয়ে মানুষ করেছেন। আজ তারা সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু খুব কাছ থেকে আমি উনার দীর্ঘঃনিশ্বাস অনুভব করতে পারি। উনি নিজের সে কথা আমাকে বলেন। অল্পবয়সে সাগর দেখতে চেয়েছিলেন, পারেননি। নিজের ঘরটাকে যেভাবে সাজাতে চেয়েছিলেন, পারেননি। নিজের জীবনটাকে শখ-আহçাদ দিয়ে যেভাবে পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন, পারেননি। এরকম ছোটখাট থেকে শুরু করে আরো অনেক বড় না পারা তাকে এখনও ভোগায়। ভাল লাগুক আর না লাগুক শ্বশুরের নির্দেশনামা পালন করেই জীবনটা কাটিয়ে দিতে হয়েছে। তবে নিজের স্বপ্নগুলো ছড়িয়ে দিয়েছেন ছেলেমেয়েদের মধ্যে। আম্মাও বোধহয় তাই করেছিলেন। নইলে ভালোই তো ছিলাম। হঠাৎ করেই বা লিখতে শুরু করবো কেন?</p><p>৪<br /> গত বছর দুটো মুভি দেখেছিলাম। রেভোল্যুইশনারী রোড আর ম্যারলী এন্ড মী। দুটোর বিষয়বস্তু প্রায়ই একই। আমেরিকান পারিবারিক জীবন। বিয়ে, সংসার, সন্তান হওয়ার আগে পরে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, স্বপ্ন হারানোর দারপ্রান্েত স্বপ্নকে বাঁচিয়ে তোলবার শেষ চেষ্টা, মধ্যবয়সের সংকট আর তার মোকাবেলা &#8211; দুটি ছবিতেই ঘুরেফিরে একই বিষয়গুলো এসেছে। তবে সময়টা ভিন্ন। প্রথম ছবিটা পঞ্চাশের দশকের প্রেক্ষাপটে আর পরেরটা সমকালীন।<br /> সমকালীন  ম্যারলী এন্ড মীর জেনিফারের চরিত্রটা দেখে মনে হয়েছে আমাদের জেনারেশনকে তুলে ধরেছে। নারী আর এখন শুধু সুতোয় বাধা পুতুল নয়। সে ঘটনা নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা রাখে। সে স্বনির্ভর, সে আত্মবিশ্বাসী। যখন প্রয়োজন মনে করছে নিজ ইচ্ছায় ক্যারিয়ার ছেড়ে সংসার-সন্তানকে সময় দিচ্ছে। সে জানে সে কী চায়, কিভাবে অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করতে হয়। সর্বোপরি নিজেকে সে ভালোভাবেই বুঝতে পারে এবং তা প্রকাশ করতে পারে।<br /> রেভোলুইশনারী রোড ছবিতে কেটকেও একই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিলো। কিন্তু সেই পঞ্চাশের দশকে নারী বোধহয় তার ভেতরকার টানাপোড়েন, যন্ত্রণার  ভাষাটা তখনও আবিষ্কার করতে শেখেনি। সে সময় নারী রোল মডেল বা সুযোগের অভাব ছিল। সে জানতো না কিভাবে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে হয়। তাই অভিমানী মন নিয়ে তাকে ভেতরে ভেতরে দ© হতে হয়েছে। কখনওবা আত্মগ্লানিতে জর্জরিত হয়েছে। কিন্তু আত্মঅহমের কারণে তা প্রকাশ করতে পারেনি।</p><p>মানব সভ্যতা কতোটা সময় পার করে এতোদূর এসেছে। কিন্তু নারীর ভেতরে যে বিচিত্র অনুভূতির অনুরণন তা প্রকাশের ভাষাটা সবে মাত্র আবিষ্কার হতে চলছে।  আগে যেখানে নারীরা নিজের প্রতিভার জলাঞ্জলী দিয়ে আত্মত্যাগে অভ্যস্ত ছিল, এখন নারীরা আর সেই আত্মত্যাগের বলি হতে চায় না। হোক তাদের যতো পরিশ্রম, তারপরও সে নিজেকে প্রকাশ করতে চাচ্ছে। সে বুঝে গেছে অভিমানকে চেপে রেখে কোন লাভ নেই। তা ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। আগের যুগে নারীরা তাদের সমস্যা জানতো কিন্তু সমাধান জানতো না। এ যুগে নারীরা তা জানার চেষ্টা করছে যদিও এদের সংখ্যা খুব কম। আগে পুরুষেরা নারীদের ঘরের বাইরে যেতে দিত না। কী মনে করে এখন জানি দিচ্ছে। এ যুগের আত্মবিশ্বাসী মায়েরা নারীর ব্যাপারে ছেলেদের দৃষ্টিভংগির আমূল পরিবর্তন করে দিচ্ছে। স্বামীরাও স্ত্রীদের ক্ষমতা এবং মতামতকে প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে এতে তাদের নিজেদেরও অনেক চাপ কমে যায়। আর নারীরাও জেনে গেছে স্বামীর উপর অতিমাত্রার নির্ভরশীলতা অনেক ঝুকিপূর্ণ। এখানকার অনেক নারী স্ব-ইচ্ছায় একা থাকার সির্দ্ধান্ত নিচ্ছে। আমি এরকম অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি। তাদের বক্তব্য হলো যদি একান্তাই পছন্দমতো কাউকে পায় তবেই তারা সংসার করার কথা ভাববে। তার আগে নয়। ঠিকই তো, দরকার না থাকলে নারী কেন আপোষ করবে? আর আপোষ হলেও হবে সমানে সমান বা একটু Œনিশ-বিশে, দশ বা নব্বইয়ের সাথে নয়। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে কতো নারী মুখ বুজে আপোষ করে সংসার করে গেছে, এখনও যাচ্ছে।</p><p>৫<br /> একটা ছেলে জন্ম থেকেই দেখে আসছে সমাজে তারা অর্থোপর্জনকারী। তাই দেখা যায় একটা ছেলে পড়াশোনা করুক বা না করুক, ফলাফল যেমনই হোক পরিশেষে সে ঠিকই একটা কর্মসংস্থান জুটিয়ে নিচ্ছে। অর্থোপর্জনের সাথে ক্ষমতায়নের একটা গভীর সম্পর্কে আছে। নারীবাদী লেখক ভার্জিয়ানা উলফ একবার বলেছিলেন যে মেয়েরা কম লেখে তার অন্যতম প্রধান কারণ তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী নয় বলে। প্রগতিশীল মন মাানসিকতার সাথে সাথে নবাব ফয়জুন্নেসা, বেগম রোকেয়া স্বামী বা বাবার থেকে অর্থপ্রাপ্ত হয়েছিলেন বলে বাংগালি মুসলিম নারী শিক্ষা প্রসারে তারা ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন। বেগম রোকেয়া আমার কাছে এক পরম বিস্ময়। একক চেষ্ঠায় বাঙ্গালি মুসলিম নারী সমাজকে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন।<br /> এ যুগে অনেক নারী নিজেরাই তাদের ক্ষমতায়নের ধারণা পোষন করতে পারে না। স্বনির্ভর হয়ে এক বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে পুঁজিবাদের হাতছানিতে আরেক বন্দিদশায় পতিত হচ্ছে। এখানকার চাকুরীসূত্রে বা পতির কারণে অনেক বিত্তশালী মহিলাদের দেখেছি অতিমাত্রায় শাড়ি, গয়না, ইথান এলেন বা ড্রেক্সেল হেরিটেজের ফার্নিচার, নরডসট্রমের জুতো, ব্যানানা রিপাবলিকের ওভারকোর্ট, ফ্রেঞ্চ ফেসিয়াল  কিম্বা মাকস-ফাকটরের প্রসাধনীর জন্য শপিংমলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মহিলাদের জমায়েতে একেকজন কতো বড় ভোক্তা তার বয়ান চলে। দেখা যায় কোন চ্যারিটির জন্য তাদের হাত দিয়ে এক পয়সাও সহজে গলছে না। সবাই অবশ্য এরকম নয়। অনেকে এখানে বসে দেশের জন্য উন্নয়নমূলক অনেক কাজ করছেন। তারা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।</p><p>সেদিন তসলিমা নাসরিনের একটা বই পড়লাম। বইটার নাম,’আমি ভালো নেই, তুমি ভালো থেক দেশ’। বইটাতে লিখেছেন যে নারী স্বাধীনতার রূপ উনি দেখতে চেয়েছিলেন, ইউরোপের পশ্চিম দেশগুলোতে সেটাই দেখতে পেলেন। পরে সে সমাজের মধ্যে অনেকদিন বসবাস করে আবিষ্কার করলেন সেখানকার অন্তঃসারশুন্যতা। মানুষের সুখ-দুঃখের একটা বড় পরিমাপক মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক &#8211; অর্থাৎ সামাজিকতা। এদিকটাতে আমরা পূবের মানুষেরা এখনও এগিয়ে আছি। এই ব্লগেই আমি কতো মানুষকে দাওয়াত দিয়ে দিয়েছে, আবার কতোজনের কাছ থেকে দাওয়াত পেয়েছে তা কিন্তু পশ্চিমের কোন ব্লগে অকল্পনীয়। লেখক দেখেছেন পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে  অল্পতেই বেড়িয়ে পড়ে তাদের রেসিস্ট চেহারা, বাহ্যিক ভদ্র ব্যবহারে আড়াল করে রেখেছে ভেতরের পংকিলতা, সে দেশে  মনরোগ চিকিৎসকদের কাছে ভীড় লেগেই থাকে, সব আছে তারপরও আত্মহত্যার হার অনেক বেশি, বৃদ্ধবয়সের অসহনীয় জীবন, সব মিলিয়ে অসম্ভব ধনশালী দেশগুলোর মধ্যে বসে নিজের নারীবাদ আর নাস্তিক্যবাদের চর্চা আর কথা বলার যথেচ্ছা স্বাধীনতা পেলেও মনে পাননি সুখ। মাঝে মাঝে লেখকের আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগতো। আরজ আলী যেমন জানতেন না বলে গ্রামে বসে নিজেই আবার গতিসূত্র আবিষ্কার করেছিলেন, ঠিক তেমনি মফস্বলে বসে তসলিমা নাসরিন হিপিইজম কেন ব্যর্থ হলো সে খবর রাখেননি। এখানে মৌলবাদীদের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে ওখানে মিডিয়ার ফাঁদে বন্দি হলেন। হুমায়ুন আজাদ, জাহানারা ইমামের উপরও তো মৌলবাদীদের খÍগ ছিল। কিন্তু পশ্চিম ঠিকই বুঝেছিলো, অল্পবয়সী নারী মিডিয়ার শুন্য পাতা পূর্ণ করার জন্য বেশি বানিজ্যিক হবে। যাইহোক একজন বাংগালি নারী নিজের জীবনটাকে অনেক  পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে তার দর্শন লিখে গেছেন তা নিঃসন্দেহে আমাদের সাহিত্য এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। যেহেতু তার নিজেরই উপলদ্ধি &#8211; ’আমি ভালো নেই’ তাই সে পথ অনুসরণ করারও কোন কারণ দেখি না। যে দর্শন অনুসরণ করলে জীবনের যে কোন মূহুর্তেই ভালো থাকা যায় আমি সে দর্শন অনুসরণ করতে চাই।</p><p>৬<br /> বাংলাদেশে এখন মেয়েদের পাশের হার বেশি, ভালো ফলাফলের হারও বেশি। কিন্তু সঠিক লক্ষ্য বা রোলমডেলের অভাবে অনেকে দিকভ্রান্ত হচ্ছে। বুয়েটে ক্লাসে প্রথম হওয়া যে মেয়েকে প্রায়ই ছেলে আর মেয়েদের সমতা নিয়ে কথা বলতে শুনতাম, প্রবাসে সেই একই মানুষকে বলতে শুনলাম &#8211; মেয়েরা একদিক দিয়ে সুবিধাভোগী, কর্মজীবি স্বামী থাকলে কাজ করার অতো বাধ্যবাধকতা থাকে না। এভাবে ভাবাটা কেন জানি শুনতে ভালো লাগে না। নিজের পরিবারের জন্য হয়তো থাকে না কিন্তু গরিব দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বিনে পয়সায় পড়ে এসে আমরা কী করে দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতার কথা ভুলে যাই? মেয়েটির জায়গায় যদি কোন গরিব ছেলে পড়তে পারতো, হয়তো সে তার পরিবারের পরের প্রজন্মকে শিক্ষার আলোতে আলোকিত করতে পারতো।<br /> তবে সবচেয়ে ধাক্কা খেয়েছি বান্ধবী ম এর চিন্তা ভাবনার বর্তমান অবস্থা দেখে। আমি ঠিক বুঝি না কোন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একজন প্রতিভাময়ী নারী সম্পূর্ণভাবে তার নিজস্বতা হারিয়ে স্বামীর চোখে পৃথিবী দেখতে শুরু করে। বুয়েটে থাকতে ওর সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক দেখিনি। কিন্তু এখন বোধহয় নিজের গোঁড়া স্বামীকেও হার মানিয়ে দিয়েছে। ধর্মের সাথে আমার কোন বিরোধ নেই। এখানে আনচলিক সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত এবং অনেক মনিষী দ্বারা দূষিত ধর্মের কথা বোঝাচ্ছি না। আমি ধর্মের আধ্যাত্মিকতা থেকে অনেক সুবিধাপ্রাপ্ত। মূল ধর্মের থেকে এই নির্যাসটুকু নেওয়ার জন্যও আরেক স্তরের জ্ঞান লাগে। তবে ধর্মের মধ্যে কোন ভুল, অপব্যখ্যা, অন্ধবিশ্বাস ঢুকে গেলে সেটা সমাজে এটম বোমের থেকেও বেশি ক্ষতি করে। বান্ধবী ম এর সাথে অনেকদিন পরে কথা বলার পর বিষয়টা আরেকবার উপলদ্ধি করলাম।<br /> আমেরিকা হয়তোবা দেশেও মেয়েদের বাচ্চা সামলে বাইরে চাকুরী করতে যাওয়া অতো সহজ নয়, কেউ না চাইলে সেটা করারও অতো বাধ্যবাধকতা আমি দেখি না। তবে কেউ যদি সেটা করে থাকে তবে তাকে নিরুৎসাহীত করবার কোন কারণ নেই। বান্ধবী ম বা আরো মহিলাদেরই বলতে শুনি যে ইসলাম মেয়েদের ঘরে থাকতে বলে। মেয়েদের আসল কাজ বাচ্চা পালন করা। বান্ধবী ম এর তো আরেক স্তর উপরের কথাবার্তা &#8211; যতোগুলো সম্ভব ততোগুলো বাচ্চা নেওয়া উচিত, রিজিকের চিন্তা আমাদের করার কথা না। আমি জিজ্ঞেস করলাম &#8211; তাহলে তুমি মাত্র তিনটাতে থেমে থাকলে কেন? সেক্ষেত্রেও তার ইসলামের দোহাই, স্বাস্থ্যে না কুলালে সেক্ষেত্রে ধর্মমতে বাচ্চা না নেওয়া যায়।<br /> আমার শুধু মনে হচ্ছিল এসব বলার সময় ওর কি একবারও মনে হচ্ছিল না যে পুরোনো বান্ধবীর কাছে তাকে কী পরিমান অসম্ভব শোনাচ্ছিল! আমি তো তার মনঃস্তত্ব খুব ভালো করেই বুঝি। ম এর মতো অনেকেই সহজে হাল ছেড়ে দিয়ে ধর্মকে বর্ম বানিয়ে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করছে। ধর্মের কথা না বলে সে যদি বলতো, আমার নিজের ইচ্ছায় আমি সংসার-সন্তানকে সবকিছুর আগে অগ্রাধিকার দিয়েছি তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধাটা আমার আগের মতোই থেকে যেত। তার কারণ এই ধরনের মেয়েরা যখন ধর্মকে এভাবে উপস্থাপন করে তখন সমাজে তার কিছুটা অপ-ভূমিকা প্রভাব ফেলে। এরা সহজেই অন্যমেয়েদের রোল মডেল হয়ে যায়। আমি অনেক বাংগালি মেয়েকে বলতে শুনেছি, এতো ভালো রেজালট করা একটা বুদ্ধিমান মেয়ে যখন এই কথা বলছে তখন নিশ্চয় এটাই ঠিক।<br /> কে তাদের বোঝাবে যে ভালো ফলাফল করে একজন শুধু তার ব্যবহারিক জ্ঞানকেই শুধু শানিত করে যা চিন্তাভাবনাকে আপনা আপনিই প্রগতিশীল করে তোলে না।</p><p>৭<br /> আমার দাদি অত্যন্ত গোড়া ধার্মিক ছিলেন। উনার কঠোর পর্দা নষ্ট হয়ে যেতে পারে এই আশংকায় শহরে স্বামী-ছেলের সাথে না থেকে মেয়েকে নিয়ে গ্রামেই থেকেছেন। আমার অতি শিক্ষিত এবং আধুনিক আম্মাকে ঠিক অতোটা পছন্দ করতে পারেননি। দাদিকে খুশি করার জন্য আম্মা শ্বশুর বাড়িতে গেলে বোরখা পরতেন। দাদি মেয়েকে তার দীক্ষায় দিক্ষিত করেছেন। আমার কাছে পোশাকের থেকে মনের পর্দা তথা অপ্রগতিশীল চিন্তাভাবনাকে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক বলে মনে হয়। পরবর্তী সময়ে ফুপুর পাঁচ মেয়ের কেউই মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্তও শিক্ষা পাননি। তবে আজ ফুপুর মেয়েরা এ অপ্রগতিশীলতা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে। কারণ তারা দেখেছে শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থেকে সামাজিক আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে গেছে। এখন তাদের কষ্টটা অনেক বেশি। শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। আর এক্ষেত্রে নারীর দায়িত্ব অনেক।</p><p>উপসংহার টানতে চাই এই বলে যে নারীকে তার জগৎ বাড়াতে হবে। এটা দুভাবে সম্ভব। সশরীরে সে নিজে বাইরের জগতে প্রবেশ করতে পারে কিম্বা ঘরে বসে বিভিন্ন বিষয়ের উপর বই পড়াশোনা করতে পারে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের পথ তৈরীর দায়িত্ব আমাদের হাতে। একদিকে আমরা ঝুম্পা লাহিড়ি বা সাবা মাহমুদের মতো ক্ষমতাশালী নারী প্রজন্মের স্বপ্ন দেখতে পারি আরেকদিকে আবার বেগম রোকেয়ার অন্তপুরবাসিনীর জড়ভরত জীবনে ফিরে যেতে পারি।</p><p> আমার চার বছরের মেয়ে রাইসা এই কিছুদিন আগ পর্যন্তও বড় হয়ে প্রিন্সেস হতে চাইতো। এখন সে মামনি হতে চায়। মেয়েটা কী সূক্ষ্নভাবে মেয়েটা আমাকে খেয়াল করছে! আমাদের নানি-মায়েরা নানারকম প্রতিকুলতার মধ্যেও রিলে রেসের মতো একটু একটু করে সামনের দিকে আলোর মশাল এগিয়ে দিয়েছে এখন এ মশাল নিয়ে আমি কী সামনের দিকে এগিয়ে যাব নাকি আবার ফুফু-দাদির পথে পিছনের দিকে হাটা শুরু করবো? নাকি পুঁজিবাদের ভোক্তা, মিডিয়ার পন্য, গোঁড়া নারীবাদ আরো কত রকম ফাঁদ আছে, পথ আছে &#8211; সেদিকে চলতে শুরু করবো?</p><p>হে নারী সিদ্ধান্ত এখন তোমার হাতে।</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/22077/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>88</slash:comments> </item> <item><title>কিন্নরকণ্ঠী নদী</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/21146</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/21146#comments</comments> <pubDate>Sat, 20 Feb 2010 04:28:16 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[ব্লগর ব্লগর]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=21146</guid> <description><![CDATA[আবার ফেব্রুয়ারী &#8211; একুশ তারিখ, পঁচিশ তারিখ এক একটা দিন আসবে আর আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হতে শুরু করবে। এই তারিখগুলো আমাকে নিজের জীবনের সেই সময়গুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। সময়টা ১৯৯৯ সালের দিককার। হঠাৎ নোটিশে দেশে গিয়ে আবার আমেরিকায় ফিরে আসা। তখন ভগ্নপ্রায় আমার প্রতিনিয়ত জীবনমুখী হবার প্রাণান্ত চেষ্ঠায় নিত্য সহযোগী ছিল বই আর আধ্যাত্মিকতা। দুটোই [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>আবার ফেব্রুয়ারী &#8211; একুশ তারিখ, পঁচিশ তারিখ এক একটা দিন আসবে আর আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হতে শুরু করবে। এই তারিখগুলো আমাকে নিজের জীবনের সেই সময়গুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।</p><p>সময়টা ১৯৯৯ সালের দিককার। হঠাৎ নোটিশে দেশে গিয়ে আবার আমেরিকায় ফিরে আসা। তখন ভগ্নপ্রায় আমার প্রতিনিয়ত জীবনমুখী হবার প্রাণান্ত চেষ্ঠায় নিত্য সহযোগী ছিল বই আর আধ্যাত্মিকতা। দুটোই বেশ সাহায্য করছিলো। সে সময়ে পড়া একটা বই এখনও মাঝে মাঝে উলটে পালটে দেখি। বইটার নাম ‘ WHEN THE WORST THAT CAN HAPPEN ALREADY HAS’। প্রচ্ছদে লেখা আছে বইটা জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম সময়কে জয় করতে সাহায্য করবে। আসলেও তাই। বইটিতে বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে দুঃসময় এবং তা জয় করার গল্প বলেছেন। তা পড়তে পড়তে কখনো মনে হয়েছে আহা, আমার থেকেও লেখকের সময়টা কতো খারাপ গেছে, কিম্বা এই গল্পটা তো ঠিক আমার কথাই বলছে। অনুধাবন করলাম দুঃসময়ে বই খুব ভালো বন্ধু হতে পারে।  হ্যাঁ, সেসময়টাতে আশেপাশে কাছের মানুষজন ছিল, সহযোগিতার হাত ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বাস্তব সত্যটা হলো এই যে যার যার জীবন তার তার। আমার দুঃখ, আমার সমস্যা ঠিক আমার মতো করে আর কেউই বুঝবে না। অনেকসময় সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আমরা আরো কারো দুঃখ বাড়িয়ে তুলি। আমি ঠিক যে কথাটা শুনতে চাই বা যা শুনলে আমার উপকার হয় তা কেউ বলছে না। অথচ কোন না কোন বইয়ে ঠিক সে কথাটাই লেখা আছে। ঘটনাচক্রে বইটা ঠিক সময়ে আমার হাতে পড়েছিল।</p><p>কম্পিউটারে কাজ করতে করতে অনেক সময় প্যাচ লেগে গিয়ে জ্যামে আটকে পড়া গাড়ির মতো মনিটর কিংকর্তব্যবিমূ• হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে কন্ট্রোল, অলটার, ডেল &#8211; এই তিনটা বাটন টনিকের মতো কাজ দেয়। ঠিক তেমনি আমাদেরও মাঝে মধ্যে  কন্ট্রোল, অলটার, ডেলের দরকার পড়ে।  একটা ভালো বই কিন্তু সেই টনিকের প্রতিস্থাপক হতে পারে। আবার দেখা গেল আশেপাশের কারো কোন কটু কথা শুনে মন খারাপ হচ্ছে, তখন বই ঘাটতে গিয়ে কোন এক উপন্যাসে হয়তো একই ঘটনার বর্ণনা দেখতে পেলাম। তখন বুঝলাম আমি একাই না এরকম অবস্থার মধ্যে অনেকেই যায়। এ ধরনের অনুভূতিটা মানসিক পরিপক্কতার পরিধি বাড়িয়ে দেয়। নিজেকেই বুঝে নিতে হয় কোন কথাটা মুছে ফেলবো আর কোন কথাটা তুলে রাখবো।</p><p>বই পড়লে চৈতন্যের উন্মেষ ঘটে, জ্ঞান বাড়ে -এরকম পোশাকি কথা আমরা সচারচ শুনে থাকি যার সত্যতা নিয়ে আমার কোনরকম দ্বিধা নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে বেশি পোশাকি কথা মনের মাঝে তেমন ভাবে গেঁড়ে বসে না। বই সম্পর্কে আমার সহজ সরল উপলদ্ধি হলো একটা ভালো বই পড়লে মন ভালো হয়ে যায়। একটা সুন্দর সিনেমা দেখলেও তো মন ভালো হয়ে যায় তবে বই পড়ার দরকার কি? এর উত্তরে আবার সেই পোশাকি শব্দ চেতনাকে টেনে আনতে হবে। সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে চোখ আর কান শুধু দুটো ইন্দ্রিয় ব্যস্ত থাকে।  কিন্তু বই পড়ার ক্ষেত্রে শুধু তা চোখ দিয়ে দেখে গেলেই শেষ হয়ে যায় না, অনুধাবন করার জন্য সব ইন্দ্রিয়ের সাহায্যের দরকার পড়ে। ছাকনী দিয়ে যেমন চা পাতা থেকে নির্যাস নিংড়ে পেয়ালা পূর্ণ করি ঠিক ইন্দ্রিয়ের ছাকনী দিয়ে বই থেকে ভাবটুকু নিংড়ে নিজেদের ভেতর  কখনো জ্ঞান কখনো চেতনা স্তর বৃদ্ধি করি। যেমন ইঞ্জিনিয়ারিং বিদ্যা কারো জ্ঞান বৃদ্ধি করে আর দার্শনিক বিদ্যা চৈতন্যের উন্মোচন ঘটায়। একটা জীবিকা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে আরেকটা জীবনের মানে খুঁজে পেতে সাহায্য করছে। একটা বৈষয়িক চাহিদা পূরনে সাহায্য করে, আরেকটা কোথায় তার রাশ টেনে ধরতে হয়, কিভাবে নৈতিকতা বজায় রাখতে হয় সেটা অনুধাবন করতে শিখায়।</p><p>লেখার বাসনা থেকেই সিসিবির সাথে জড়িয়ে যাওয়া। আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি কে কী লেখা কিম্বা কার কী মনতব্য তা দেখার। ব্লগের কারণে এখন আমরা অনেকেই লিখছি। ‘সব &#8230; কবি হতে চায়‘ &#8211; তারুন্যের উদ্দীপ্ত সময়ে এ কথা লিখে একবার এক কবি (মোহাম্মদ রফিক কি) বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন। কারণ তার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন এক ক্ষমতাশালী শাসক। ব্লগের এই যুগে বর্তমানে প্রবীন সেই কবি এখন কী বলবেন? আমাদের জীবনে বিনোদনের একটা বিরাট অংশ বোধহয় গুগল, ব্লগের দখলে চলে যাচ্ছে। সামনে কী হয় তা জানতে খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।</p><p>আরেকটা কথা সিসিবির সাথে শেয়ার না করলে সেটা আমার অপরাধ হয়ে যাবে। সিসিবিতে একবার একটা গল্প দিয়েছিলাম। নাম চিকিৎসা। বলতে গেলে সিসিবির কারণেই সেটাকে একটা উপন্যাসে দাড় করিয়েছিলাম।  আজ শনিবার বিকাল সাড়ে চারটায় দেশে আমার আত্মীয় স্বজনের অতি উৎসাহে তার মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠান করছে। আমিও একজন লেখক &#8212; তারও আবার বই &#8211; বিষয়টা ভাবতেই কিঞ্চিৎ মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে।  বিদেশে থেকে বেঁচে গেছি। কেউ আমাকে দেখতে পারবে না। পঁচা ডিমও ছুড়তে পারবে না। যদিও জানি পঁচা ডিমের আশা করাটাও এক বিরাট বিলাসিতা &#8211; কার অতো সময় আছে?</p><p>বইটা লেখার সময় অনেকের অনেক মনতব্য ভালো লেগেছিল। লেখার সময় তার প্রভাব পড়েছে। আবার কিছু সমালোচনা ছিল তা তেমনভাবে উৎরে যেতে পারিনি। যেমন সানা ভাই, ফয়েজ একটা চরিত্র হিয়াকে আরোপিত বলেছিল। ঘটনার প্রয়োজনেই চরিত্রটা কিছুটা অচেনা হয়ে উঠেছিল অর্থাৎ কিছুটা আরোপিত রূপই ধারণ করেছিলো যেটা আমি হয়তো অতোটা পরিষ্কার করে ফুটিয়ে তুলতে পারিনি। নতুন একটা চরিত্রের সংযোজন ঘটেছে। নায়িকা ক্যাটরিনা মেলাতে না পেরে নায়কের নাম আর কাউয়ুম রাখতে পারলাম না। চরিত্রটা একজন আর্মি অফিসারের। এটা তৈরী করতে সাইফের ব্লগ আর তার মন্তব্যের সাহায্য নিয়েছি।</p><p>নীচে আমার বইয়ের প্রচ্ছদ দিয়ে দিলাম। হাশেম খান করাতে তা পুরোপুরি নীলের প্রভাব মুক্ত। প্রকাশনী হচ্ছে সাকী পাবলিশিং ক্লাব।<br /> টুম্পা প্রকাশনী (স্টল#৪৬৬, ফোন 01720 174 446) তে বইটা পাওয়া যাচ্ছে।</p><p><img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2010/02/Cover-Wahida_Final116-300x180.jpg" alt="Cover-Wahida_Final[1]" title="Cover-Wahida_Final[1]" width="300" height="180" class="alignright size-medium wp-image-21168" /></p><p>উপন্যাসের সারসংক্ষেপঃ</p><p>নদী আর মানুষের জীবনের কী আশ্চর্য মিল! দুটোই স্বতত প্রবাহিত। অথচ আঁকেবাঁকে অনবরত পরিবর্তন ঘটে চলছে। কখনও গতির, কখনওবা রূপ-বৈচিত্র্যের। এ উপন্যাসে উঠে এসেছে দুটো নারী চরিত্রের কথা। একজন অসামান্য আকর্ষনীয়, আরেকজন দশজনের ভীড়ে মিশে যাওয়া কেউ যাকে আলাদা করে চোখে পরে না। স্রোতস্বিনী জীবনের ধারায় পথে তাদের মিল হয়, বন্ধুত্ব হয়। অলক্ষ্যে একজন আরেকজনের আনন্দ, হাসি, বেদনা, দুঃখ-সুখের প্রভাবক হয়ে উঠে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। আরো আছে হাসানের মতো শান্ত-সৌম্য ভদ্র নিপাট মানুষ, সুমনের মতো রোমিও, সুজনয়ের মতো সুবিধাবাদী, আর রেজওয়ানের  মতো আবেগপ্রবন দেশপ্রেমিক পুরুষেরা। যারা কোন না কোন ভাবে লাবনী আর হিয়ার জীবন-বলয়ে প্রাজ্জ্বল্যমান। তাদের উপস্থিতি ছাড়া ঘটনা এগোয় না। এছাড়াও প্রসঙ্গক্রমে এসেছে মানসিক রোগীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গী, আর্মি-সিভিলিয়ান দ্বন্ধের কথা।</p><p>পথের মাঝে নদী মিলে আবার আলাদা হয়ে যায়। যে যার নিজের ছন্দে অবধারিত মোহনার দিকে এগিয়ে চলে। সেই শেষটা কেমন?<br /> নদী তার চলার পথ আর পরিনতির জন্য কতোটা দায়ী? আর নারী?</p><p>সারাটা পথ গুনগুন করে গান গেয়ে পথ চলা মন-আবেশী এক কিন্নরকণ্ঠী নদীর জীবন কী আমরা পেতে পারি না?</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/21146/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>76</slash:comments> </item> <item><title>গার্লস ক্যাডেট কলেজ এবং নারীর ক্ষমতায়নঃ</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/20422</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/20422#comments</comments> <pubDate>Mon, 01 Feb 2010 23:49:08 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[আলোচনা]]></category> <category><![CDATA[কলেজ সমূহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=20422</guid> <description><![CDATA[(ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের রজত জয়ন্তির সাময়িকীর জন্য এটা লেখা হয়েছিলো। ঘরে বসে আমরা অনেক ভাবনাই ভাবতে পারি। আবার একেক ক্ষেত্রে একেকজন অভিজ্ঞ। সবার চিন্তাধারার সম্মেলনে ভালো কোন আইডিয়া বের হয়েও আসতে পারে। পাঠককূলকে এর পক্ষে-বিপক্ষে-নিরপেক্ষে মতামত দেওয়ার জন্য অনুরোধ রইলো।) ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে ছেলেদের জন্য স্থাপিত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজের যাত্রা [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>(ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের রজত জয়ন্তির সাময়িকীর জন্য এটা লেখা হয়েছিলো। ঘরে বসে আমরা অনেক ভাবনাই ভাবতে পারি। আবার একেক ক্ষেত্রে একেকজন অভিজ্ঞ। সবার চিন্তাধারার সম্মেলনে ভালো কোন আইডিয়া বের হয়েও আসতে পারে। পাঠককূলকে এর পক্ষে-বিপক্ষে-নিরপেক্ষে মতামত দেওয়ার জন্য অনুরোধ রইলো।)</p><p>১৯৫৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে ছেলেদের জন্য স্থাপিত ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজের যাত্রা তার পঞ্চাশ বছর পূরণ করলো। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পশ্চিমের আজকের উন্নত দেশগুলোতে গণতন্ত্রের সূচনার প্রায় শতাব্দীকাল পরে সে সব দেশে সাধারণ নারীরা পেয়েছিলো তাদের ভোটাধিকার। সেই হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে ১৯৮৩ সালে স্থাপিত প্রথম মহিলা ক্যাডেট কলেজ ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজের ২৫ বছরের যাত্রা  তুলনামূলক বিচারে খুব একটা পিছিয়ে নেই। কোন ধরনের আন্দোলন ছাড়াই নীতি নির্ধারকদের বদান্যতায় দেশে এখন মেয়েদের ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা তিন।</p><p>ছেলেদের মতো মেয়েদের ক্যাডেট কলেজেও মেধা ভিত্তিক ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে কলেজের ভেতর শিক্ষা, খেলাধূলা, সামাজিক আর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সবই একই নিয়মানুবর্তীতার বলয়ে বাঁধা। যোগের মধ্যে আছে যে মেয়েদের টেবিলে খাবার পরিবেশন এবং মাঝেমধ্যে রান্নার ক্লাস করতে হয় আর বিয়োগের মধ্যে আছে যে তাদের অল্পতেই ইডি (একসট্রা ড্রিল) খেতে হয় না। এছাড়া জুনিয়র সিনিয়রের সম্পর্ক তেমন পাঙ্গাভিত্তিক নয়। ’জুনিয়র সাইজ করার জন্য’ মেয়েরা তাদের উদ্ভাবনী শক্তি খাটিয়ে ভোঁ দৌড়, মটর সাইকেল দৌড়, সুপার ম্যান ফçাইয়ের মতো কিছু নরম-শরম কৌশল প্রয়োগ করে থাকে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটা যখন ক্যাডেট কলেজ তখন সেখানকার নিয়ম কানুনের কড়াকড়িতে ছেলে মেয়েতে কোন ভেদাভেদ নেই। তবে ভেদাভেদ আছে আর দশটা মেয়েদের স্কুলের সাথে মেয়েদের ক্যাডেট কলেজের। স্কুল-কলেজ ছুটি হবার পর বাইরের পরিবেশে যেখানে মেয়েদের টিউশনির জন্য স্যারদের বাড়িতে বাড়িতে ছুটতে হয় সেখানে ক্যাডেট মেয়েরা তাদের পড়াশোনার জন্য বরাদ্দ চার/পাঁচ ঘন্টা সময় বাদে বাকী সময়টা প্যারেড-পিটি, খেলাধূলা, ক্লাব করা, বাগান করাসহ বিভিন্ন রকম সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড আর প্রতিযোগিতার জন্য ব্যয় করে। এভাবে লেখাপড়ার সাথে সাথে অন্যান্য আরো অনেক দিক দিয়ে নিজেকে তৈরী করে ক্যাডেট মেয়েরা গড়ে উঠছে আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী আর উৎপাদনশীল মানুষ হিসেবে। বয়োসন্ধির মতো জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়টাতে ক্যাডেট মেয়েরা বাইরের পরিবেশে ঘটে যাওয়া নানারকম নারী নির্যাতন থেকে সম্পূর্ণভাবে শংকামুক্ত।  তাদের অলিখিত গৃহবন্দী হয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে না।  ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ &#8211; তাই তারা নিজেদেরকে পুরোপুরি মানুষ ভাবতে, ছেলেদের সমকক্ষ ভাবতে পিছপা হচ্ছে না।  শিক্ষার ক্ষেত্রটা বিদ্যালয় থেকে শুরু করে পরিবার, পরিবেশ সবখানেই গভীরভাবে প্রোথিত। ঐ সময়টাতে ক্যাডেট কলেজই আমাদের বিদ্যালয়, পরিবার, পরিবেশ সবই। তাই বিভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে আসা মেয়েরা একই রকমভাবে চিন্তা ভাবনা করতে শিখি। বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া শিক্ষা, দায়িত্ব প্রদান ইত্যাদির সুষম সমন্বয়ে এখানে শারিরীক এবং মানসিকভাবে শক্ত সমর্থ, উন্নত আদর্শ, সুন্দর চারিত্রিক গুণাবলীর মাধ্যমে ক্যাডেটদের এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে সে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ঈগল-চক্ষুর মতো তাদের সুবিধা অসুবিধা দেখা, নিয়মানুবর্তিতার চাকা সচল রাখা আর সার্বিক নিরাপত্তার তত্বাবধানে আছে ক্যাডেট কলেজ প্রশাসন। ক্যাডেট কলেজে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সার্বিক অবদানের কথা অনস্বীকার্য।</p><p>প্রতিবছর বোর্ডের মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ তার ধারাবাহিক সাফল্য অব্যাহত রাখছে। শুধু তাই না ক্যাডেট কলেজ শেষ করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য তারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। গড়ে তুলছে আকর্ষনীয় ক্যারিয়ার। উদাহরন স্বরূপ আমাদের ব্যাচ ৭ম ইনটেকের কথাই ধরা যাক। ৪১ জন ছাত্রীর মধ্যে ২৫জন ডাক্তার, ৭ জন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারী-সরকারী অফিসে কাজ চাকুরীরত, ৭ জন প্রকৌশলী এবং আইটি বিশেষজ্ঞ এবং বাকী কয়েকজন ঘরে সন্তান পালনকেই বেছে নিয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকেই প্রবাসের  বিভিন্ন নামকরা কোম্পানী যেমন মাইক্রোসফট, ইন্টেল, নাসা, নকিয়া এরকম আরো অনেক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে তাদের সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে। আমরা সবাইই কম বেশি আমাদের আজকের অবস্থানের জন্য ক্যাডেট কলেজের অবদানকে স্মরণ করে থাকি। পুরোনো বন্ধুদের দেখলে আজও একইরকম ভাবে একাত্মবোধ করি। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, দুঃখিনী দেশের জন্য মনটা সব সময়ই কেঁদে উঠে। দেশের জন্য কিছু করার আকুতিটা সবসময়ই নিজেদের মধ্যে কাজ করে।<br /> এ তো শুধু গেল একটা ব্যাচের কথা। এরকম ভাবে এ পর্যন্ত বের হওয়া ২৩ টা ব্যাচেই কমবেশি একই চিত্র পাওয়া যাবে। শুধু লেখাপড়াই নয়,  সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক অনুষ্ঠানে মহিলা ক্যাডেটরা তাদের চৌকষতা প্রামান করছে। ২০০৭ সালে ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে অনুষ্ঠিত আন্তঃসংসদীয় পদ্ধতির বিতর্কে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন আন্তঃক্যাডেট কলেজ সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় মগকক’র ক্যাডেটরা তাদের প্রতিভার স্বাক্ষ্র রাখছে। সার্বিক বিবেচনায় এসবই নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখছে বলে মনে করি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেয়েরাও কমিশন লাভের সুযোগ পায়। সেখানেও মেয়েরা তাদের কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে। এর মধ্যেই মগকক’র একজন প্রাক্তন ক্যাডেট ২০০৪ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে চৌকষ ক্যাডেট হিসেবে সোর্ড অব অনার লাভ করে।<br /> অর্থাৎ আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রটিতে একটা ক্যাডেট কলেজই বিশাল অবদান রেখে চলেছে। কে না জানে নারীদের যথাযত সংপৃক্ততার অভাবে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হয়। একজন ক্ষমতাবান নারী শুধু যে তার পরিবারের চেহারা বদলে দিচ্ছি তা নয়, ভবিষৎ প্রজন্মকেও সে উপযুক্তভাবে গড়ে তুলছে। এ প্রসঙ্গে আমার মীনা কার্টুনের স্লোগানটির কথা মনে পড়ছে-“সুযোগ চাই, মানুষ হব”</p><p>আপাত দৃষ্টিতে মহিলা ক্যাডেট কলেজকে একটা সফল উদ্যোগ বলা যায়। এখন কথা হলো পুরো দেশের প্রেক্ষাপটে এই মডেল কতটুকু কাজে লাগানো যায়? সে প্রসঙ্গে আসার আগে এক নজরে এই উপমহাদেশে নারী শিক্ষার ইতিহাসটা একটু দেখে নিই।</p><p>রাজা রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখ পিছিয়ে থাকা নারী জনগোষ্ঠিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অক্লান্ত শ্রম  দিয়েছেন। (ঊনবিংশ্ব শতাব্দীর প্রথমভাগে চার্চ কেন্দ্রিক মিশনারী সোসাইটি প্রথমে কলকাতায় ৩০টির মতো মেয়েদের বিদ্যালয় স্থাপন করে। কিন্তু তৎকালীন কলকাতার অভিজাত সম্প্রদায় হীন দরিদ্র ঘরের মেয়েদের সাথে এক কাতারে বসতে অস্বীকার করায় এসব স্কুলগুলো আর আলোর মুখ দেখেনি। তখন তারা তাদের প্রকল্প দক্ষিন ভারতের দিকে সরিয়ে নিয়ে যায়। সেখানে প্রথম মেয়েদের বোর্ডিং স্কুল গড়ে উঠে ১৮২১ সালে। ১৮৪০ সালে স্কটিশ চার্চ সোসাইটি ২০০ ছাত্রী নিয়ে ৬ টি স্কুল বানায়। পরে মাদ্রাজে মিশনারী ৮০০০ ছাত্রীদের জন্য আরো বোর্ডিং স্কুল বানায়। বৃটিশ আমলে পশ্চিম কোলকাতার ব্রাক্ষ্ম সমাজ নারী শিক্ষায় অগ্রগামী ছিল। বিদ্যাসাগরের তত্ত্বাবধানে ১৮৫০ সালে ৮০ জন ছাত্রী নিয়ে বেথুন স্কুলের যাত্রা শুরু করে। তবে পূর্ণোদম্যে এর যাত্রা শুরু হয় ১৮৭৯ সালে। উল্লেখ্য সেসময় মুসলিম ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় বলতে গেলে একদমই ছিল না। এমনকি যখন ১৮৭৮ সালে যখন ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে ইডেন মহিলা স্কুলের গোড়াপত্তন ঘটে তখন ১৫৩জন ছাত্রীর মধ্য মাত্র একজন মুসলিম ছাত্রী ছিল। চট্রগ্রামে খাস্তগীর, কুমিল্লায় নবাব ফয়জুন্নেসা এবং তার বোন বদরুননেসা, ময়মনসিংহে সে এলাকার জমিদাররা, এলাকার সমাজ সেবক, কিছু ব্রিটিশ কর্মচারীদের নানা উদ্যোগে ঊনবিংশ্ব শতাব্দীতে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় মেয়েদের জন্য কিছু সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে। পর্দাপ্রথা ভেদ করে খুব কম সংখ্যক মুসলিম নারীই তখন শিক্ষার এ সুবিধা গ্রহন করেছিলো। আসলে সে সময় এবং বলতে গেলে এখনও নারীদের নিজেদের ভালোমন্দ বোঝার এবং সির্দ্ধান্ত গ্রহন করার ক্ষমতা ছিল না। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বেগম রোকেয়া বাঙ্গালি মুসলিম নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। উনি শিক্ষাপ্রসারের পাশাপাশি ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে সমাজে নারীদের করুণ অবস্থান তুলে ধরেছিলেন।</p><p>নারী শিক্ষার ইতিহাস বলার পেছনের কারণটা হলো আজকের ভারতে কলকাতা এবং মাদ্রাজের শিক্ষিত নারীসমাজের গোড়া পত্তন হয়েছিলো প্রায় দেড়শ বছর আগে। নারীদের জন্য আলাদা বোর্ডিং স্কুল, এবং প্রচারের কারণে আজকে দেখা যায় দক্ষিন ভারতের শিক্ষিতের হার সর্বাধিক। শুধু সে এলাকা থেকেই প্রতিবছর দশ হাজার প্রকৌশলী বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে বের হয়। আজকের এই কম্পিউটার যুগের গোড়াপত্তনে এইসব দক্ষিন ভারতীয় নারী-পুরুষ প্রযুক্তিবিদদের অবদান অনস্বীকার্য। তারাই পরবর্তীতে দেশে ফিরে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় আধুনিক ভারতের রূপকার হচ্ছে।  অর্থাৎ শিক্ষিত নারী জনগোষ্ঠির সুফল সুদূর প্রসারী। কোন দেশই নারীর সক্রিয় অংশগ্রহন ছাড়া এগিয়ে যেতে পারেনি। নারী শিক্ষার সাথে শুধু উন্নয়নই নয় দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রনও ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। নারীর মধ্যে সচেতনতা আসলে স্বভাবতই সে কম সন্তান ধারণ করে। ইতিহাস থেকে দেখি ক্ষেত্র তৈরী করে দিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তবেই নারীশিক্ষার পথটি সুগম হয়। এবং এ কাজটি অগ্রগামী পুরুষ সমাজকেই করতে হবে।</p><p>এখন প্রশ্ন জাগতে পারে এ ক্ষেত্রে ক্যাডেট কলেজের কী ভুমিকা থাকতে পারে? মহিলা ক্যাডেট কলেজকে যদি একটা সফল মডেল ধরা হয় তাহলে এ মডেলকে সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে নারীর ক্ষমতায়নকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। আমি বাংলাদেশের বাস্তবতা ভূলে যাইনি। তাই এখানে আমি প্রস্তাবনা করছি মেয়েদের জন্য কম খরচের আবাসিক স্কুলের যা ক্যাডেট কলেজ মডেলে চলবে। মূলস্রোতের ক্যাডেট কলেজে বাংলাদেশে সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারে বেড়ে উঠা মেয়েরা সুযোগ পাচ্ছে। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে লেখাপড়ার যা অবস্থা তাতে মূল প্রতিযোগিতায় গ্রামের মেয়েরা টিকতে পারবে না। অথচ এদের জন্যই বেশি প্রতিরক্ষা দরকার। মাস্তানি, সন্ত্রাস, এসিড নিক্ষেপ, বাল্য বিবাহ, যৌতুক, ধর্ষন, ফতোয়া, পারিবারিক নির্যাতন, বৈষম্য, কুসংস্কার আরো কত নারী নির্যাতনের কারণে প্রতিবছরই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কত শত নারী ঝরে পরছে। বয়োসন্ধি বয়সে এসব মেয়েদের সুরক্ষার জন্য যদি আবাসিক প্রকল্প থাকতো তাহলে এদের মধ্যে থেকেই আমরা পেতে পারতাম অনেক বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সমাজসেবী, শিক্ষিকা, ডাক্তার, আইনজীবি, সাংস্কৃতিক কর্মী, প্রকৌশলীর মতো বিভিন্ন পেশাজীবিদের, সর্বোপরি শিক্ষিত মা যে কিনা তার সন্তানদের সুশিক্ষা দিয়ে বড় করতে পারবে।</p><p>প্রথমেই আলোচনা করেছি উপযোগী নিয়মে পরিচালিত মেয়েদের আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীল নারী ক্ষমতায়নে সাহায্য করে। এক্ষেত্রে ফোর্ড কিম্বা মেলিন্ডা-বিল ফাউন্ডেশনের কাছে সাহায্য চাওয়া যেতে পারে যারা নারীশিক্ষার জন্য অনুদান দিয়ে থাকে। কিম্বা সামরিক বাজেট থেকে এ প্রকল্পে অর্থায়ন করা যায় কিনা সেটাও ভেবে দেখা যেতে পারে। আসলে  আমাদের গরীব দেশের বাস্তবতায় হয়তো আমরা অনেক সংখ্যক পূর্ণাঙ্গ ক্যাডেট কলেজের কথা ভাবতে পারি না। এক্ষেত্রে আমরা কি আমাদের সমাধানের জন্য নতুন কিছু ভাবতে পারি না?  বাঙ্গালিরা তো সবসময়ই তাদের সৃষ্টিশীলতার জন্য বিখ্যাত। এদেশে উদ্ভাবিত ব্র্যাকের প্রাইমারী স্কুলের মডেল, গ্রামীন ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণের মডেল আজ সারা বিশ্ব অনুসরণ করছে। স্বল্প বাজেটের ক্যাডেট কলেজ কি এখানে আরেকটা নতুন সংযোজন হতে পারে না? খুব কম সংখ্যক জনগোষ্ঠি ক্যাডেট কলেজের সুবিধা পাচ্ছে। আর তাই একটা বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠির কাছে এইসব প্রতিষ্ঠান বুর্জোয়ার প্রতীক। পাকিস্তান আমলের নিয়ম কানুন ভেঙ্গে আমরা কি পারি না আমাদের দেশের জন্য আরো ফলপ্রসূ কোন সমাধান নিয়ে আসতে?</p><p>প্রতিটা জেলায় এতিমখানা এবং বৃদ্ধাশ্রম এবং আবাসিক নারী শিক্ষাকে এক করে কোন প্রকল্পের কথা ভাবা যেতে পারে। পরীক্ষামূলকভাবে সেটা প্রথম এক দুইটা জেলায় শুরু করে দেখা যেতে পারর &#8211; যেখানে সে অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের এবং বৃদ্ধদের আশ্রয় দেওয়া হবে। সেই সাথে সেই এলাকার গ্রামাঞ্চল থেকে তুলনামূলক মেধার বিচারে ৭ম শ্রেনীতে ছাত্রী ভর্তির ব্যবস্থা করতে হবে যেমনটা ক্যাডেট কলেজে করা হয়ে থাকে। পূর্ণাঙ্গ ক্যাডেট কলেজের মতো পোষাক-পরিচ্ছদ, খাবার-দাবারের বাহুল্য না রেখে খরচ অনেকাংশে কমানো যায়। এদের সহশিক্ষা কার্যপ্রনালীর মধ্যে পালা- করে শিশু আর বৃদ্ধদের দেখাশোনা করাটাও অন্তর্ভূক্ত থাকবে। মেয়েরা স্বভাবতাই স্নেহপ্রবণা। এ ক্ষেত্রে তাদের এই গুণটিকে ব্যবহার করা যায়। জীবনের প্রতিকূল সময়ে মেয়েদের নিরাপত্তা এবং গড়ে ওঠার সুযোগদিলে তারা পরবর্তী সময়ে নিজের প্রতিষ্ঠা করে পরিবার এমনকি গ্রামের চেহারা বদলে দিতে পারে। আমাদের সামনে তো বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানের উদাহরন তো রয়েছেই।</p><p>পরিশেষে বলবো গ্রামবাংলাকে টেনে তুলে ধরার জন্য আমি নারী শিক্ষার কোন বিকল্প দেখি না। ক্যাডেট কলেজ পরিচালনা পরিষদই এর দায়িত্ব নিতে পারেন। সাংগঠনিক কাজে তারা ইতিমধ্যে যথেষ্ট প্রমানিত।</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/20422/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>32</slash:comments> </item> <item><title>অতীত বয়ান &#8211; কেউ যদি শুনতে চায় (আমাদের প্রতিবেশী)</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/19938</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/19938#comments</comments> <pubDate>Sat, 16 Jan 2010 17:41:01 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[ব্লগর ব্লগর]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=19938</guid> <description><![CDATA[সিলিকন ভ্যালি আক্ষরিক অর্থেই একটা কসমোপলিটান এলাকা। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা পেশাজীবিদের ভিড়ে সাদারা এখানে সংখ্যালঘু। অধিবাসীদের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় আর চায়নীজরা। আঞ্চলিক রাজনীতির মতো এখানেও চায়নীজ আর ভারতীয়দের মধ্যে একটা অদৃশ্য বিভাজন রেখা খেয়াল করা যায়। এই সেদিন দেখলাম একটা গ্রোসারী শপের লাইনে দাড়ানো নিয়ে এক চাইনীজ আর ভারতীয় [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>সিলিকন ভ্যালি আক্ষরিক অর্থেই একটা কসমোপলিটান এলাকা। পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা পেশাজীবিদের ভিড়ে সাদারা এখানে সংখ্যালঘু। অধিবাসীদের মধ্যে সংখ্যার দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় আর চায়নীজরা। আঞ্চলিক রাজনীতির মতো এখানেও চায়নীজ আর ভারতীয়দের মধ্যে একটা অদৃশ্য বিভাজন রেখা খেয়াল করা যায়। এই সেদিন দেখলাম একটা গ্রোসারী শপের লাইনে দাড়ানো নিয়ে এক চাইনীজ আর ভারতীয় মহিলার মধ্যে একটু দ্বন্ধ বেঁধে গেল। ব্যাপারটা সচরাচর দেখা যায় না। এখানকার ভদ্র মানুষজনদের মধ্যে এতোটুকু সংঘাত দেখাটাও দূর্লভ। আমার সাত বছরের ছেলে রাসীন যখন কোন চায়নীজ বন্ধুর জন্মদিনে যায় তখন সেখানে সে একাই বাদামী চামড়া। আবার অফিসেও দেখি কোন গ্রুপে চায়নীজদের আধিক্য আবার কোথাও ভারতীয়দের। অনেক চায়নীজ একত্র হলে কিছুক্ষন পরেই ইংলিশ ভুলে চ্যাং চুং করে কথা বলা শুরু করে দেয়। এমনকি অফিসেও। তবে বিগ বসরা অধিকাংশই সাদা। ইদানিং ভারতীয়রা আবার এই কাতারে সামিল হচ্ছে। তাদের প্রধান গুন ইংরেজীতে মাতৃভাষার মতো দক্ষতা। সেই সাথে আরো আছে  সাহস, পরিকল্পনা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং আর সের্বাপরি যেটা বলতে হয় সেটা হলো ওদের পলিটিকস করার অলৌকিক ক্ষমতা।</p><p>আমরা থাকি ফ্রীমন্ট সিটির মিশন এলাকায়। জায়গাটা দেখতে রাঙ্গামাটি বা বান্দরবনের মতো। এখানকার আবাসিক পাড়া প্রকৃত অর্থেই আবাসিক। আমেরিকায় পাবলিক স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে একটা নিয়ম আছে। ছেলেমেয়েদেরকে এলাকার জন্য নির্দিষ্ট করা স্কুলে পড়তে যাবে। আমরা যে এলাকায় থাকি সেটা এই সিলিকন ভ্যালির এক নাম্বার স্কুল ডিস্ট্রিক। স্কুলগামী বাচ্চাদের বাবা-মায়েরা এখানে বাড়ি কিনতে না পারলেও অন্তত্ব ভাড়া করে থাকতে চায়। এশিয়ানরা বাচ্চাদের লেখাপড়ার ব্যাপারে খুব সচেতন। তাই দেখা যাচ্ছে দিন দিন সাদাদের হটিয়ে এশিয়ানরা এদের বাড়ি কিনে নিচ্ছে। আমাদের পাড়াটা বেশ নিরিবিলি, খোলামেলা। পাহাড়ের উপরে কালডিসেকের পাশ ঘিরে সাত-আটটা পরিবারের বসবাস। অধিকাংশই এশিয়ান। যেই দু একজন সাদা এখানে থাকে তাদের ছেলেমেয়েরা  অপেক্ষাকৃত বয়সে বড়, হাইস্কুলে পড়ে। আশেপাশে এশিয়ানদের ব্যাপারে কিছুটা বিরক্ত। রেসিস্ট বলতে যা বুঝায় ঠিক তা নয়। যেমন সামনের বাসার মিসেস ইউর্থ একদিন বললেন, ’তোমরা এশিয়ানরা ঠিক ঘরবাড়ি উপভোগ করতে জান না (ইউ ডোন্ট এনজয় ইওর হাউস)।’</p><p>এখানে পাড়ার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বিকেল হলেই খেলতে বেড়িয়ে পরে। একজন আরেকজনের বাসায় অবাধে যাতায়াত করছে। রাসীন আমার কাছে পপসাইকেল চাইলো। ফ্রিজে তখন তা ছিলো না। আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সে রোহনদের বাসা  থেকে অবলিলায় একটা পপসাইকেল নিয়ে আসলো। তেমনি রোহন বা শিবাও আমার বাসায় এসে কুকির বোয়াম খুলে দিব্যি কুকি খেতে শুরু করে। তবে এর আগে সৌজন্যবশত জিজ্ঞেস করে নেয়। ব্যাপারটা দেখে মজা লাগে সেই সাথে মনের মধ্যে বেশ কিছু কৌতুহলী প্রশ্নও জাগে। ওরা এতো সহজ কেন? আমরা মায়েরা উদার এটা ছাড়াও মনে হয় ওদের জগৎটা ভিন্ন। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত খাবার অভাবে যে মানুষ মারা যাচ্ছে কিম্বা দু মুঠো খাবার সংগ্রহের জন্য এখনও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষকে  জীবন সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয় &#8211; সে পৃথিবীটা বোধহয় ওদের কাছে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।<br /> দেশে গেলে রাসীনকে টোকাইদের জীবন দেখাই। রঙ্গিন চোখে সবই বুঝি ভালো লাগে। টোকাইদের জীবন ওর কাছে স্বপ্নের মতো বলে  মনে হয়। কারণ ওরা সারাদিন খেলতে পারে। শুধু একটাই প্রশ্ন ওরা গায়ে জামা পরে না কেন? কোন বাসায় কারেন্ট চলে গেলে মোমবাতি জ্বালালে জানতে চায় কার জন্মদিন। রিক্সা চড়া মানে ডিজনীল্যান্ডের যে কোন রাইডের থেকেও মজাদার কিছু। লুঙ্গির নাম দিয়েছে রিক্সা মামার প্যান্ট। মনে মনে শংকিত বোধ করি রাসীনের রঙ্গিন জগৎ নিয়ে।</p><p>গত দুবছর ধরে আমেরিকায় মন্দা যাচ্ছে। আশেপাশের অনেকের চাকুরী যেতে শুনছি। একেবারে পাশের বাড়ি যোশেফের বাবার চাকুরী চলে যায়। টেক্সাসে চাকুরী হওয়াতে ওরা সেখানে চলে যায়। মালিক খালি বাড়িটার বিক্রির জন্য নোটিশ দেয়। যোশেফ রাসীনের বন্ধু। ওরা  ছিল এবিসি। আমেরিকান বর্ণ চায়নীজ। ওদের শূন্য বাড়িটা রাসীনের রঙ্গিন পৃথিবীতে একটু আচর কাটে। স্কুল থেকে একদিন এসে বলে লুসিয়ার বাবার চাকুরী চলে গেছে। আরেকদিন বলে রোহনের বাবার চাকুরী নেই দেখে এবার আর ওর জন্মদিন পালন করা হবে না। আমি ওকে চুল কাটতে নিয়ে যেতে চাইলে বলে উঠে, কী দরকার পয়সা খরচ করবার। আমি মনে মনে হেসে উঠি। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে &#8211; এক পরিবেশ থেকে আরেক পরিবেশে যে যার মতো করে কঠিন সত্যটা জেনে যায়।</p><p>আমেরিকায় বাংলাদেশীদের প্রায় সবার ঘরে ঘরে এনটিভি, চ্যানেল আইএর সংযোগ আছে। গত দুবছর আগে ডিসেম্বর মাসে টিভিতে বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানমালা দেখে রাসীনকে স্বাধীনতার গল্প শোনাই। ঔ সময় তার নানা-নানি, দিদা-দাদা কী রকম সময় পার করেছিলো সে গল্প বলি। ঠিক সে সময়টাতেই জোসেফদের খালি বাড়িতে এক পাকিস্থানী পরিবার উঠে আসে। ছেলে ওসমান রাসীনের থেকে মাত্র এক মাসের বড়, মেয়ে ফাতিমা কয়েক বছরের।  নির্ঝর বলে উঠলো, রাসীনকে পাকিস্থানীদের গল্প শুনিয়ে তো বিপদ ডেকে আনলে। আমি তড়িঘড়ি করে রাসীনকে বলি মুক্তিযুদ্ধের কথা আমি ওকে যা শুনিয়েছি ও যাতে সেটা ওসমানকে না বলে। কিন্তু একটা পাঁচ-ছয় বছরের ছেলেকে কিছু বলে তা আবার কাউকে বলতে মানা করলে যে ফল দাড়ায় এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হলো না। দুদিন পর রাসীন এসে বললো, ’ওসমান, ফাতিমা সব জানে। এমনকি ওদের আব্বা-আম্মাও।’ শুধু তাই না, একদিন দেখি পৃথিবীর মানচিত্র দেখিয়ে ওসমান, ফাতিমা, রোহন, আবি, শিবা আর রাইসাকে বুঝাচ্ছে কিভাবে বঙ্গোপসাগর দিয়ে পাকিস্থানী যুদ্ধজাহাজ আর ইন্ডিয়ার উপর দিয়ে জঙ্গী প্লেন এসে বাংলাদেশকে আক্রমন করেছিলো। বলা বাহুল্য এই অংশটুকু ছিল ওর আবিষ্কার। আরো একদিন দেখি দুদলে ভাগ হয়ে ওরা সব যুদ্ধ যুদ্ধ খেলছে। রাসীনের জোর গলা শুনতে পেলাম, ’আমি রাসীন বাংলাদেশের নেতা, ওসমান পাকিস্থানের নেতা। এখন ওসমান আমাদের আক্রমন করবে। আমরা রুখে দাড়াব। আমাদের জিততেই হবে।’  রাতে রাসীনকে বলি, এরকম আর বাংলাদেশ-পাকিস্থান যুদ্ধ যুদ্ধ খেলবে না।  রাসীন অবাক হয়ে জানতে চায়, কেন। আমি কোন সদুত্তরর্  দিতে পারি না। আসলে এ ব্যাপারটা আমার মধ্যে এক ধরনের শংকা তৈরী করে। কোন একটা খবরে দেখেছিলাম একবার ভার্জিনিয়াতে জাতিগত বিদ্বেষ থেকে কয়েকজন পাকিস্থানী ছেলে মিলে একজন বাংলাদেশী ছেলেকে মেরে ফেলেছিলো। আমি রাসীনদের মধ্যে এরকম কোন বিদ্বেষ দেখিনি। তবুও সাবধানের মার নেই।<br /> পাড়ায় বাচ্চাদের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ায় খুব অলক্ষ্যে চায়নীজরা আলাদা হয়ে গেল। আর ভারতীয়, পাকিস্থান আর বাংলাদেশী দ্বিতীয় প্রজন্মদের মধ্যে দেখা যায় রাসীনকে নিয়ে দুপক্ষের টানাটানি লেগে থাকে। একদিকে রোহন আর শিবা আর অন্যদিকে ওসমান আর ফাতিমাদের দুটো দল গড়ে উঠে। সবারই লক্ষ্য থাকে রাসীনকে নিজ নিজ দলে ভেড়ানো। প্রথম প্রজন্মের রাজনীতি কী অলক্ষ্যে দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে পরে।</p><p>একবার আমার শ্বাশুরী প্রশ্ন করেছিলেন, ’তোমাদের প্রজন্ম তো পাকিস্থানীদের খুব ঘৃনা করে।’ আমার প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটা লেখাতেও এমনটা দেখেছিলাম। এরকম কথা শুনলে আমার মধ্যে এক ধরনের সংশয় তৈরী হয়। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন ব্যক্তি সম্পর্কে খারাপ কিছু শুনলে তার প্রতি ঘৃনা বা অশ্রদ্ধা জাগে। কিন্তু পুরো জাতিকে ঘৃনা করতে পারিনা। সংশয়বোধের কারণ, পাকিস্থানকে ঘৃনা করতে পারছি না বলে কী আমি যথেষ্ট দেশপ্রেমিক না? আমি নিজে জানি আমি একজন দেশপ্রেমিক। শুধু কলমে বা হূদয়ে ধারণ করা অনুভূতিতে দেশপ্রেমিক না, কাজেও দেশপ্রেমিক। সে প্রসঙ্গে এখন যাব না। নিজের ভেতর থেকেই উত্তর আসে, অন্ধঘৃনা অন্ধবিশ্বাসেরই নামান্তর। সেটা কোনভাবেই প্রেম প্রকাশের মাধ্যম হতে পারে না। আলো আলোই। ঠিক তেমনি প্রেম প্রেমই। এজন্য  অযাচিত কলুষতার দরকার পরে না। তবে যাচিত কলুষতাকে আমি পার পেতে দিব না। তাই আমি কোন পাকিস্থানীকে না জেনেশুনে অকারনে ঘৃনা করতে পারি না। ইসলামিক ভাবধারায় বেড়ে উঠা দ্বিতীয় প্রজন্মের আমেরিকান বাংলাদেশীরা অনেকেই বিভিন্ন ইসলামিক দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মদের সাথে সম্পর্ক গড়ছে। আমার বরের দিককার অনেক আত্মীয়স্বজনদের এটা করতে দেখেছি। এমনকি যার আপন ফুফু সেলিনা পারভীন একজন শহীদ বুদ্ধিজীবি, সে একজন পাকিস্থানী মেয়ের গলাতে মালা পরাতে যাচ্ছে। আবার আরেক আত্মীয় এর প্রতিবাদ জানিয়ে সে বিয়েতে যাচ্ছে না।<br /> একবার অফিসের একটা ট্রেনিংএ ফিলিপিনো একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হলো। দুটোদিনে ওর সাথে বেশ ভাব হয়ে গেল। শেষে যখন ও শুনলো আমি মুসলিম, কিছুক্ষন চুপ করে ছিলো। ব্যক্তিমানুষের কারণে না জাতিগত কারণে এই প্রথম অন্যের চোখে আমার প্রতি হালকা ঘৃনার ঝিলিক দেখলাম। ফিলিপিনেও যে মুসলিম মৌলবাদীদের হামলা চলছে সেটা জানতাম। জিজ্ঞেস করে জানলাম ও আমাকে প্রথম থেকেই ইসরাইলী জু মনে করেছিলো। এখানে ইন্ডিয়ান কলিগের মধ্যেও দেখেছি অনেক আলাপ গড়াবার পরে মুসলমান সম্পর্কে ওদের আসল ধারণাটা প্রকাশ করে এবং যেটা খুব একটা ভালো না।</p><p>এখানে যেসব ইন্ডিয়ানদের দেখি তারা মূলত দক্ষিন থেকে আসা। উত্তর ইন্ডিয়ানদের কিছুটা পশ্চিমী হওয়ার প্রবনতা আছে। কিন্তু দক্ষিনীরা  একই সাথে নিজেদের কালচারের ব্যাপারে রক্ষনশীল আবার নতুন ভালো কিছুকে গ্রহন করার ব্যাপারে যথেষ্ট উদার। এক কলিগ বলল ওদের নাকি একই রাস্তার উপর কিছুদূর পর পর মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা পাশাপাশি সহ-অবস্থান। আমার প্রতিবেশি রোহনের মা বিজয়া আমার দেখা অন্যতম একজন ভালোমানুষ। ঔপনিবেশিকতার সময় বৃটিশ শাসকের নারী শিক্ষা প্রচার কার্যক্রমের এরাই প্রথম এবং সার্থক অংশিদার হয়েছিল। কলিগ চিত্রার বিশ্বসাহিত্য-জ্ঞান আমাকে মু© করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ও বা দক্ষিন ভারতীয়রা হিন্দি পারে না &#8211; অন্তত্ব আমাদের বাংলাদেশিদের মতো। ওদের রাষ্ট্র ভাষা হিন্দি। প্রথম থেকেই ওদের রাজ্য সরকার ইংরেজীর উপর জোর দিয়ে একরকমভাবে হিন্দিকে অবসৃয়মান করে দিয়েছে। ওদের ওখানে হিন্দি চ্যানেল, হিন্দি ছবির বাজার তেমন একটা নেই। বরং হিন্দি ছবি ওদের ছবির কপিরাইট নিয়ে রিমেক করে। ব্যাপারটা কী অদ্ভূত না! কোন একুশে ফেব্রয়ারী ছাড়াই কিভাবে ওরা স্বকীয়তা বজায় রাখলো! আর আমরা একুশে ফেব্রয়ারী উদযাপন করে বাসায় গিয়ে হিন্দি ছবি দেখছি। বাংলাদেশে দেদারসে হিন্দি চ্যানেলের আধিপত্য দেখে খুব কষ্ট হতো। নব্বইয়ের দশকে যখন হিন্দি চ্যানেল আসতে শুরু করলো, তখন আমার প্রতিবাদে বাসায় এর সংযোগ ঘটেনি। অথচ তখন বিটিভি ছাড়া কিছুই ছিল না। খুব ভালো কোন ছবির নাম শুনলে বা ছাত্রীহলে গেলে মাঝে মধ্যে টিভি দেখতাম। সরকার কেন ইন্ডিয়াতে বাংলাদেশের চ্যানেল প্রচার করছে না এ নিয়ে আমরা তীব্র বিতর্ক জুড়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমরা নিজেরা কী একবারও নিজেদের ঘর থেকে হিন্দি চ্যানেল বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছি? নিজের জন্য বা পরিবারের জন্য দেশী কাপড় কিনলে কী এমন অসুবিধা? কেন ভুলে যাই বিন্দু বিন্দু করেই সিন্ধুর জন্ম। ইন্ডিয়ার সীমানা যেমন বড়, রাজনীতিও তেমন পরিপক্ক। নদীই যখন চলার পথে শক্ত মাটি-নরম মাটি বুঝেশুনে এঁকেবেঁকে চলে, আমরাও একটু বুঝেশুনে চললে অসুবিধা কী?</p><p> আমাদের দেশের এখনকার অবস্থাটা আমার কাছে বৃটিশ আমলে ভারতীয় উপমহাদেশের মতো মনে হয়। আমরা দুর্বল আর প্রতিপক্ষ শক্তিশালী। কামানের বিরুদ্ধে তীরধনুক দিয়ে লড়াই করে জয়ী হওয়া যায় না। বিপ্লবের মাধ্যমে নয় রাজনৈতিক পরিপক্কতার মাধ্যমে বৃটিশদের এদেশ থেকে সরানো হয়েছিলো। পার্থক্যটা হলো এই যে ওদের ছিল গান্ধি, নেহেরু আর আবুল কালাম আজাদের মতো প্রজ্ঞাবান নেতা আর আমাদের দেশের নেতানেত্রীদের রাজনৈতিক পরিপক্কতা নিয়ে আর কী বলার আছে। তবে প্রধানমন্ত্রির চেষটার জন্য উনি অবশ্যই সাধুবাদ পেতে পারেন। উনি অনেক বড় ধরনের নেতা হলে তিস্তা সমস্যার সমাধান করে আসতে পারতেন। সেইসাথে বিমান বন্দরে এতো মানুষের ঢল যে প্রধানমন্ত্রীর সন্মান না বাড়িয়ে বরং কমালো &#8211; সেটা বোঝার মতো পরিপক্কতা কী উপরের দিককার নেতানেত্রীদের ছিল না? একটা বাচ্চাও বিশ্বাস করবে না এ ভীড় স্বতস্ফুর্ত ছিল। আমাদের বোকামী আমরা আর কতভাবে প্রকাশ করবো?<br /> আমরা যুদ্ধোপরাধিদের বিচার নিয়ে যতোই হইচই করি না কেন, নতজানু সরকার  পেট্রোডলারের কাছে অসহায়। সৌদি আরবের রক্ত চক্ষুর ভয়ে ভীত। তাই বলে কী আমরা বিচার চাইবো না? অবশ্যই চাইবো। এর জন্য দরকার সঠিক নেতৃত্ব। নেলসন ম্যান্ডেলা বা বঙ্গবন্ধু সে রকম নেতা ছিলেন বলেই দূর্বল প্রতিপক্ষের নেতা হয়ে সবল প্রতিপক্ষের থেকে হিস্যা আদায় করে নিয়েছিলেন। ভারতীয় সৈন্য সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সাথে ইন্দিরা গান্ধির কী কথা হয়েছিলো তা এ প্রজন্ম জানতে পারলে ভালো হয়। মৌলানা আবুল কালাম আজাদের ’ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ বইটা পড়লে দেখা যায় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থাকলে কিভাবে শক্ত প্রতিপক্ষের থেকেও অধিকার আদায় করে নেওয়া যায়। বিশদভাবে এখন আর সে বর্ণনায় গেলাম না।</p><p>মোটকথা পরিপক্ক নেতা না আসলে রাজনৈতিক দল শক্ত হবে না। গণতন্ত্রের প্রধান বুনিয়াদই হচ্ছে রাজনৈতিক দল। এখন রাজনৈতিক দলেই যদি গণতন্ত্র না থাকে তাহলে যোগ্য নেতা-নেত্রী বেড়িয়ে আসবে কোনখান থেকে? গতবছর নির্বাচন কমিশনের চাপে যখন দলগুলোর সম্মেলন হলো তখন আমরা আমজনতা নিরব দর্শক হয়ে নেত্রীদের একনায়িকাতন্ত্রের(!) খেলা দেখলাম। আমরা ভুলেই এসব ক্ষেত্রেই আমাদের সবচেয়ে বেশি সরব হওয়া উচিত ছিল। আমাদের দেশে এখন ‘রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্র চাই’ এরকম একটা প্লাটফর্মের খুব বেশি প্রয়োজন। নইলে আজকে যাকে চোর বলে গালমন্দ করছি দেখা যাবে কালকে তাকেই হুজুর হুজুর বলে মাথা নুইয়ে কুর্নিশ করছি। এমনটা না করলে দেখা যাবে চাকুরী থাকছে না, হয়তো সাধের জানটাই আর থাকবে না।</p><p>এখন আর বাসায় বাংলা চ্যানেল নেই। শেষবার যখন ছিল তখন দেখছিলাম রিয়েলিটি শোয়ের ছড়াছড়ি। কখনও গানের, কখনও নাচের, কখনও বা অভিনয়ের। আচ্ছা নেতা নির্বাচনের কোন রিয়েলিটি শো করা যায় না? আমার আইডিয়াটা এরকম, একটা কাল্পনিক রাজনৈতিক দল থাকবে। এর প্রধান নেতা নির্বাচন করা হবে। প্রতিযোগীদের বয়স ত্রিশ থেকে শুরু হবে। অর্থাৎ অন্যসব রিয়েলিটি শোয়ের উলটো। বিচারক থাকবেন চিন্তাশীল, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবি, পেশাজীবি, বিজ্ঞানী, শিল্পী, শ্রমিক, কৃষক বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষেরা। বিজ্ঞাপন আর দর্শক টানার জন্য বিখ্যাতরা অগ্রগন্য। আর অন্যান্য রিয়েলিটি শোয়ের মতোই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগ্রহীদের রেজিষ্ট্রেশন করতে বলা হবে। বিচারকরা দেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করবে। উত্তরের ভিত্তিতে প্রথমে জেলা, তারপর বিভাগ পর্যায় থেকে কিছু নেতা নির্বাচন করা হবে। প্রশ্নোত্তর, দেশ-ভাবনা, প্রতিযোগিদের নিজেদের মধ্যে মনোজ্ঞ লাইফ বিতর্ক (স্কুল কলেজের তোতা পাখীর বিতর্ক নয়) আর এসএমএসের উত্তেজনার মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে একজন নেতা নির্বাচিত হবে। নেতা একজন নির্বাচিত হলেও অংশগ্রহনকারী সবাই থাকবে দলটির সদস্য। মিডিয়াকে ব্যবহার করে এরকম একটা কাল্পনিক রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা যায় না? কিম্বা আমেরিকার প্রেসিডেন্টসিয়াল নির্বাচনের প্রাইমারী সিলেকশনের মতো কিছু করা যায়। কেন জানি মনে হচ্ছে এরকম একটা অনুষ্ঠান করলে সেটা খুব জনপ্রিয় হবে।</p><p>যারা এই পর্যন্ত পড়ে ফেলেছেন তাদেরকে এই বয়ান শোনার নাম করে পড়ানোর জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। বয়ানটা আর অতীতও রইলো না। বর্তমান সময়টাকে ধরার চেষ্টা করলো।</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/19938/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>87</slash:comments> </item> <item><title>২৫ শে নভেম্বর নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17675</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17675#comments</comments> <pubDate>Tue, 24 Nov 2009 22:53:06 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[প্রবন্ধ]]></category> <category><![CDATA[ব্লগর ব্লগর]]></category> <category><![CDATA[ময়মনসিংহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=17675</guid> <description><![CDATA[১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২৫শে নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয়। ক্ষুধা, দারিদ্র, অপুষ্ঠি, অশিক্ষা, বেকার সমস্যা এই সকল সাধারণ সমস্যার পাশাপাশি নারীদের আরো কিছু মারাত্মক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় শুধুমাত্র তারা নারী বলে। মালয়েশিয়া কিম্বা মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকদের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ঠের কথা আমরা জানি। সেই শ্রমিক যখন [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২৫শে নভেম্বরকে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয়। ক্ষুধা, দারিদ্র, অপুষ্ঠি, অশিক্ষা, বেকার সমস্যা এই সকল সাধারণ সমস্যার পাশাপাশি নারীদের আরো কিছু মারাত্মক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় শুধুমাত্র তারা নারী বলে। মালয়েশিয়া কিম্বা মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকদের অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্ঠের কথা আমরা জানি। সেই শ্রমিক যখন নারী হয় তখন তার সাথে যোগ হয় শারীরিক আর যৌন নির্যাতন। আর দেশের মধ্যে তো এ নির্যাতনের কোন শেষ নেই। এসিড সন্ত্রাস, পারিবারিক সন্ত্রাস, যৌতুক, ধর্ষন, গন ধর্ষন, ফতোয়া, গৃহ পরিচারিকা নির্যাতন, মাস্তান সন্ত্রাস এরকম আরো অনেক নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা যাবে। শুধু গত বছরের হিসাবেই দেশের বিভিন্ন থানায় প্রায় সতেরশর মতো মামলা লিপিবন্ধ করা হয়েছে। আর এর বাইরে কত শত ঘটনা যে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যাচ্ছে তার হিসেব হয়তো কোনদিনই পাওয়া যাবে না।</p><p>যুগ যুগ ধরে নারীরা বৈষম্যের শিকলে বন্দি। শারীরিকভাবে দূর্বল হওয়াটাই কি এর পেছনের একমাত্র কারণ? নিশ্চয় তা নয়। কেউ তো কারো সাথে পাঞ্জা লড়ে লড়ে শীর্ষ পদে যায় না। তবে কী নারীদের মানসিকভাবে পঙ্গু করে রাখা হয়েছে? হয়তোবা। শতাব্দীকাল ধরে পুরুষতান্ত্রিকতার ফল হলো আজকের মানসিক আর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল নারী। কারণ খুব ভাগ্যবান কেউ কেউ এই বৈষম্যের শিকল থেকে মুক্তি পেয়ে তো ঠিকই তারা তাদের যোগ্যতার সাক্ষর রাখতে পারছে। যোগ্যতা বলতে ঘর-বাহির উভয় বা যে কোন একটি ক্ষেত্রকে বোঝাচ্ছি। এখনো অনেক পরিবারেই নারীর ঘরের কাজের কোন মূল্য দেয় না। অর্থোপর্জনটাকেই একমাত্র কাজ হিসেবে পরিগনিত করে। নারী পরিনত হয় অলিখিত দাসীতে। আত্মবিশ্বাস আর আত্মসন্মানটুকু নিংড়ে নিলে একটা মানুষের জড়ভরতে পরিনত হওয়া ছাড়া আর কিই বা উপায় থাকতে পারে?</p><p>অনেক পুরুষের লেখায় দেখেছি তারা অনুযোগ করছে যে বৈষয়িক জিনিষের চাপ প্রয়োগ করে অনেক নারী পুরুষদের উপর অত্যাচার করে থাকে। আসলে মূল্যবোধের অবক্ষয় থেকে তো নারী-পুরুষ কেউই মুক্ত নয়। স্কুলিংটা তো শুধু বিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, এটা গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে পরিবার আর পরিবেশের মধ্যে। খুব অল্পসংখ্যক ঘটনার জন্য আমরা আসল সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে বা অস্বীকার করতে পারি না। যদিও মনে করি প্রতিটা সমস্যাই গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদেরকে একসাথে মিলিয়ে ফেললে চলবে না।</p><p>বাংলাদেশের গ্রামবাংলা, মফস্বল কিম্বা শহরেও শতকরা কতভাগ ঘরে নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়? অনেকে হয়তো বলবে নারীই নারীকে নির্যাতন করে। আমার কাছে এটাকে একটা চক্র বলে মনে হয়। দুর্বলের উপর সবলের চক্র। কিম্বা একটা ছেলে সে তার মা-বোনকে যেভাবে জীবনযাপন করতে দেখেছে, নিজের স্ত্রীর ক্ষেত্রে হয়তো এর বেশী কিছু ভাবতে পারে না।<br /> পেছনের কারণটা যেটাই হোক সামনের দিনগুলোতে আমরা সবাই একটা ইউটেপিয়া ধরনের সমাজব্যবস্থা দেখার অপেক্ষায় আছি যেখানে কোন নারী নির্যাতন থাকবে না।<br /> ইতিহাসবিদেরা লিখবে ‘একবিংশ শতাব্দীতে শুধুমাত্র নারী হবার অপরাধে শেষ নারী নির্যাতনের রেকর্ড পাওয়া যায় &#8230;..&#8217;</p><p>সবশেষে সবাইকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা।</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17675/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>23</slash:comments> </item> <item><title>অতঃপর একটা চিঠি</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17262</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17262#comments</comments> <pubDate>Sun, 08 Nov 2009 05:25:01 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[গল্প]]></category> <category><![CDATA[ময়মনসিংহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=17262</guid> <description><![CDATA[(সিসিবিতে খুব লেখা দিতে ইচ্ছে করছিলো। অনেকদিন ধরে নতুন লেখা হয়ে উঠেনি। পুরাতন একটা গল্প দিচ্ছি। সিসিবির সাথে পরিচয় হওয়ার আগে অন্য একটা ব্লগে লেখাটা দিয়েছিলাম।) এখন প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গার পর একটা কথাই মাথায় আসে &#8211; আজকেই কি সেই চিঠিটা আসবে। একটা একফুট বাই দেড়ফুটের বাদামী রংয়ের খামে প্রাপকের জায়গায় থাকবে আমার আর প্রেরকের জায়গায় হাসানের [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p><em>(সিসিবিতে খুব লেখা দিতে ইচ্ছে করছিলো। অনেকদিন ধরে নতুন লেখা হয়ে উঠেনি। পুরাতন একটা গল্প দিচ্ছি। সিসিবির সাথে পরিচয় হওয়ার আগে অন্য একটা ব্লগে লেখাটা দিয়েছিলাম।)</em></p><p>এখন প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গার পর একটা কথাই মাথায় আসে &#8211; আজকেই কি সেই চিঠিটা আসবে। একটা একফুট বাই দেড়ফুটের বাদামী রংয়ের খামে প্রাপকের জায়গায় থাকবে আমার আর প্রেরকের জায়গায় হাসানের নাম। ভেতরে থাকবে সব কেজো কথার হিসেব নিকেষ যা আমার কাছে জল্লাদের ফাঁসির দড়ির শেষ টান কিম্বা আসামীর কাঠগড়ায় দাড়িয়ে বিচারকের মুখে নিজের মৃত্যুদন্ড শোনবার মতো। সেই চিঠিটার জন্য কি ভয়ংকর প্রতীক্ষা, একটু কলিং বেলের শব্দ শুনলেই চমকে চমকে উঠি।</p><p>অথচ দশ বছর আগে সেই একই হাসানের চিঠির জন্য কি ব্যাকুলতাই না ছিল! চিঠি হাতে আসলে পড়তে সময় নিতাম। কারণ একবার পড়া হয়ে গেলেই জীবন স্থবির হয়ে যেত আরেকটা চিঠি হাতে পাবার আগ পর্যন্ত। উহহ, প্রতীক্ষার কত ভিন্নরূপ, কী বৈপরিত্য!<br /> কোন এক সাপ্তাহিকের প্রবাসজীবন কলামে হাসানের লেখা পড়ে আমিও ওকে প্রথম চিঠি লিখেছিলাম। উত্তর আসতে একটুও দেরী হলো না। সেই থেকে শুরু। হাসান নর্থ ডেকোটা ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিজ্ঞানে পি এইচ ডি করছিলো। রবীন্দ্র সংগীত শোনা, ভাত মাছ খাওয়া হাসানের জন্য সে ছিলো রীতিমতো নির্বাসন। আমাদের চিঠি বিনিময় হাসানকে দিল মুক্তির স্বাদ আর আমাকে দেখালো স্বপ্ন। আশ্চর্যজনকভাবে আমরা নিজেদের মধ্যে সব কিছুতেই বড্ড বেশী মিল খুঁজে পেলাম। ততোদিনে ইন্টারনেট আর ফোনালাপ সহজলভ্য হয়ে গেলেও দুজনের কাছেই চিঠির আবেদন ছিল অবিসংবাদিত। ভাবতাম ডাক্তারের প্রেসক্রিপসনে কি কেউ কখনো প্রেমপত্র লেখে নাকি ধোপার ফর্দে ভালবাসার কবিতা? তবে কেন ওসব কেজো যন্ত্রপাতি দিয়ে আমরা আমাদের মনের ভাব প্রকাশ করবো? চিঠির সবচেয়ে আবেদনের বিষয়টি হলো এর প্রতীক্ষা পর্বটি। ব্যাডমিন্টনের কর্কের মতো মূহুর্তের মধ্যেই এ কোর্ট সে কোর্ট করতে পারে না। এই একটা জায়গায় দুজনেই পুরোনো হয়ে রইলাম। নাকি আসলেই আমরা দুজনে পুরোদস্তুর পুরাতন ধ্যান ধারণার মানুষ ছিলাম, না বুঝে আধুনিকতার পেছনে ছুটছিলাম -শেষে তাল সামলাতে না পেরে কক্ষ বিচ্যুত হয়ে এক সময় একজন আরেকজনের থেকে ছিটকে পরলাম?<br /> আমাদের পত্রমিতালীর দু বছর যেতে না যেতেই হাসানের বৌ হয়ে নর্থ ডেকোটায় ওর স্টুডেন্ট এ্যপার্টমেন্টে এসে উঠলাম। শুরু হলো এক সাথে পথ চলা &#8211; ঠিক যেন আমাদের চিঠির মতোই আরেক শুভ সূচনা। আমি হাত পুড়িয়ে যাই রাঁধতাম তাই ওর কাছে অমৃত। সে সময়টা পয়সার খুব টানাটানি ছিল। কিন্তু কোন কিছুই আমাদের সুখের পথে অন্তরায় হয়ে দাড়াতে পারেনি। হাতে একটু সময় পেলেই চলে যেতাম দূর কোন পাহাড় অথবা কোন গহীন অরন্যে। আমরা দুজনেই ছিলাম জাত রোমান্টিক। কোনরকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই যে দিকে দুচোখ যায় সেদিকে বেড়িয়ে পরতাম। কতবার যে পথ হারিয়ে সারারাত গাড়ির মধ্যে কাটিয়ে ভোরের সূর্যোদয় দেখে বাসায় ফিরেছি তার কোন ইয়াত্তা নেই। একবার তো সন্দেহভাজন মনে হওয়ায় টহলদার পুলিশ আমাদেরকে প্রায় জেলে ধরে নিয়ে যায়। হাসানের এ্যডভাইজারের সাথে সেই মহামান্য পুলিশ কথা বলার পর সে যাত্রায় আমাদের ছেড়ে দিয়েছিলো। দিনটা ছিল এগারই সেÌেটম্বর, ২০০১। বাসায় ফিরে টেলিভিশন চালিয়ে দেখি টুইন টাওয়ার জ্বলছে। দুজন দুজনের হাত চেপে ধরে, চোখে চোখ রেখে বলেছিলাম,’বড় বাঁচা বেঁচে গেছি’। হাসান এদেশে মোহাম্মদ ইসলাম নামে পরিচিত।<br /> এভাবে তিন বছর পার করার পর হাসানের পিএইচডি আর আমার মাস্টার্স শেষ হবার পর দুজনেই চাকরী নিয়ে স্বর্গের মতো সুন্দর জায়গা কালিফোর্নিয়াতে নতুন বসতি গড়লাম। তখন ভেবেছিলাম কষ্টের দিন শেষ। এবার অনন্ত সুখের দিন শুরু হলো। তখন নিশ্চয় স্রষ্ঠা আমাদের দিকে চেয়ে মুচকি হেসেছিলেন। যেই আমরা ইমেইলের যুগেও চিঠি বেছে নিয়েছিলাম, সেই আমরাই আমেরিকান স্বপ্নে বিভোর হয়ে অনবরত ছুটে চললাম বড় বাড়ি, দামী গাড়ি কিম্বা লোক দেখানো বিত্ত বৈভবের পেছনে। নিজেদের জন্যই কোন সময় নেই, আরেকজনকে দেব কি? তখন থেকেই কি আস্তে আস্তে আমাদের স্পর্শগুলোও অনুভূতিহীন হয়ে যাচ্ছিল? দূরত্বটা কি তখন থেকেই জট পাকাচ্ছিল নাকি টুকুন যখন জন্ম নিল সে সময়টা থেকে?<br /> প্রথম যখন নিজের ভেতর টুকুনের অস্তিত্ব বুঝতে পেরে হাসানকে জানালাম, তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো আমি যেন একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছি। তখন থেকেই কি হাসানকে একটু একটু ঘৃনা করতে আরম্ভ করলাম? এই ভীনদেশে চারপাশের হাজারো অচেনা মানুষগুলোর মাঝে তখন যেন খুব বেশি করে হাসানের ভালবাসার জন্য বুভূক্ষ হয়ে ছিলাম। অথচ প্রায় এভারেস্টের চূড়া প্রায় ছুই ছুই হাসানের সে সময়টায় পিছু ফিরে দেখার সময় ছিল না। বেচারা টুকুন এই পৃথিবীতে আসার জন্য বড্ড বেশি ভুল সময় বেছে নিয়েছিল। পরে বোধহয় নিজেই সেটা ভালো বুঝতে পেরেছিল। নইলে এতো আধুনিক হাসপাতালের সব জ্ঞানী গুনী অভিজ্ঞ ডাক্তারদেরকে কি সহজে বোকা বানিয়ে মাত্র একমাসের মাথায় সবাইকে ছেড়ে চলে গেল। টুকুনের জন্মের সময় হাসান পাশে ছিল না। কিন্তু ছোট্ট ছেলেটা তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আবার বাবাকে মায়ের কাছে এনে দিল। অনুতপ্ত হাসান তখন সব পুষিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তখন আমি তা মানবো কেন? শোকে দুঃখে আমি তো তখন উন্মাদপ্রায়। নিজের ভালোমন্দ বোঝার বোধটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম। অনেকটা আমার জেদের কাছে বশ্যতা মেনেই দুজনের আলাদা হয়ে যাওয়া।<br /> এখন বুঝি কি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল সেটা। আলাদা হয়ে যাওয়ার পর বুঝলাম হাসান আমার কতটুকু জুড়ে ছিল। নিজের শ্বাস প্রশ্বাসে আমি ওর গন্ধ পাই। ভেতরটা খালি খালি লাগে। মনে হয় আমারই সত্বার কোন একটা অংশ যেন কোথায় রয়ে গেছে। প্রতিনিয়তই এক হতে চাওয়া কিন্তু আত্ম অহমের প্রাচীর তাতে বাঁধা হয়ে দাড়ায়। এই একটা জায়গায় এসে আটকে গেলাম। আমাদের সম্পর্ক শুরুর চিঠিটার মতো নির্দ্বিধায় সম্পর্ক শেষের চিঠিটা তাকে পাঠাতে পারলাম না। বরং প্রতিমূহুর্তেই এক ধরনের আতংকে থাকি হাসান কখন সেই অমোঘবার্তাটি পাঠায়। আমাদের ডিভোর্স লেটার।<br /> মাঝে মধ্যে ভাবি বেহুলার মতো যদি কোন লোহার প্রাসাদে থাকতে পারতাম যেখানে কালসাপ আসার সব পথ রুদ্ধ। তারপরও তো বেহুলা পারেনি তার নিয়তিকে ঠেকাতে, আমি কি করে পারবো?</p><p>বিঃ দ্রঃ গতকাল হাসানের থেকে একটা চিঠি পেলাম সাথে আমার প্রিয় এক গুচ্ছ হলুদ লিলি। চিঠিতে লিখেছে যে সে আবার আমার সাথে এক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। এখন সে আমার মনোভাব জানতে চায়। আমি এই লেখাটাই একটা খামে ভরে হাসানের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম। আরেকটা চিঠি, আরেকবার নতুন করে এক সাথে পথ চলার  স্বপ্ন&#8230;..</p><p>২২শে জুলাই, ২০০৯</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17262/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>67</slash:comments> </item> <item><title>ভিজ্যুয়াল কম্পিউটিং: প্রযুক্তির আগামী মাইল ফলক</title><link>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17024</link> <comments>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17024#comments</comments> <pubDate>Tue, 27 Oct 2009 00:30:56 +0000</pubDate> <dc:creator>ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)</dc:creator> <category><![CDATA[প্রযুক্তি]]></category> <category><![CDATA[ময়মনসিংহ]]></category><guid isPermaLink="false">http://www.cadetcollegeblog.com/?p=17024</guid> <description><![CDATA[পনেরশ শতাব্দী থেকেই মূলত সম্পদ আহরনের উদ্দেশ্যে নতুন ভূখন্ডের আশায় অভিযাত্রীরা এক একেকটা জাহাজ নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর দাপরে বেড়াতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায়  মানব সভ্যতা প্রবেশ করে ঔপনিবেশিকতার যুগে। এরপর ইতিহাসটা আর আগের মতো থাকেনি। আর সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে পৃথিবী চ্যাÌটা না, গোল। মূল কান্ডের সাথে যোগ হয় অনেক শাখা-প্রশাখার। এক [...]]]></description> <content:encoded><![CDATA[<p>পনেরশ শতাব্দী থেকেই মূলত সম্পদ আহরনের উদ্দেশ্যে নতুন ভূখন্ডের আশায় অভিযাত্রীরা এক একেকটা জাহাজ নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর, আটলান্টিক মহাসাগর দাপরে বেড়াতে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায়  মানব সভ্যতা প্রবেশ করে ঔপনিবেশিকতার যুগে। এরপর ইতিহাসটা আর আগের মতো থাকেনি। আর সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে পৃথিবী চ্যাÌটা না, গোল। মূল কান্ডের সাথে যোগ হয় অনেক শাখা-প্রশাখার। এক সময় সেই শাখা-প্রশাখার সতেজতা ছাড়িয়ে যায় মূল কান্ডকেও।</p><p>বিংশ শতাব্দীতে যখন এই একই মানব সম্প্রদায় সিলিকন সাগরে ইলেক্ট্রন, প্রোটনের ভেলা ভাসাতে শিখে গেল তখন আবার সেই গোলাকার পৃথিবীই হয়ে পরলো চ্যাÌটা। শুরু হলো কম্পিউটার যুগের। মুহূর্তের মধ্যেই পৃথিবীর দু প্রান্তের দুজনের মধ্যেকার বার হাজার মাইল উবে গিয়ে একে অপরের বাড়ির পশের আরশিনগরের বাসিন্দা হয়ে যেতে পারে যদি দুজনের সামনে দুটো কম্পিউটার থাকে। ইমেইল, ব্লগ, ফেইসবুক, আইপি ফোন, গুগল, ইউ টিউব &#8211; প্রাত্যহিক জীবনে এর অবদান আর বলে শেষ করা যাবে না। সামনে আর কি আসছে বা আসতে পারে সেটা নিয়ে খানিক আলোচনা করাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।</p><p>মনিটরকে এখন অধিক মাত্রায় পড়ার থেকে দেখার উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে যেটার প্রচলিত টেকি নাম  ভিজ্যুয়াল কম্পিউটিং। সেই সাথে নিরন্তন প্রচেষ্ঠা তো লেগেই আছে যে একজন ব্যবহারকারী কিভাবে আরো সহজে ভিডিও দেখতে পারবে। মোট কথা আমরা চাই কম্পিউটার খুব সহজে আমাদের কথা শুনবে এবং  সেই অনুযায়ী কাজটা করে দিবে। একশটা বাটন টেপার বদলে একটুখানি স্পর্শে আমরা কম্পিউটারকে আমাদের মনের কথা বোঝাতে চাই। আর সিপিইউ আমাদেরকে মনিটরের দিকে চোখ লাগিয়ে গুটি গুটি অক্ষর পড়ার ঝামেলা থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে ছবি বা দৃশ্যের মাধ্যমে তথ্যের উপস্থাপন করবে।</p><p>যেসব ক্ষেত্র এই প্রযুক্তি খুব কার্যকরী হতে পারে তার কয়েকটি নীচে উল্লেখ করা হলো।</p><p><strong>১। চিকিৎসা শাস্ত্রঃ </strong><br /> <img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2009/10/human_body.jpg" alt="human_body" title="human_body" width="400" height="210" class="alignnone size-full wp-image-17025" /><br /> শুধু মাত্র রোগ নির্নয়ের জন্যই শৈল্য চিকিৎসায় রোগীকে বড় ধরনের কাঁটাছেড়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বায়োমেডিক্যাল ইমেজিং রিসোর্স বা অন্য কথায় বলতে গেলে একটা ক্যাপসুল ভিডিও ক্যামেরা কোন কাঁটাছেড়া ছাড়াই রোগীর দেহের ভিতরের দৃশ্য বাইরের মনিটরে ফুটিয়ে তুলতে পারে।</p><p><strong>২। দূরশিক্ষনঃ </strong><br /> <img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2009/10/on_edu.jpg" alt="on_edu" title="on_edu" width="130" height="97" class="alignnone size-full wp-image-17026" /><br /> যা পড়তে চাই কিম্বা জানতে চাই তার জন্য আর ক্লাসরুমে সশরীরে হাজির দেবার দরকার পরবে না। অবশ্য এটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যাদের ক্লাসে যাবার সীমাবদ্ধতা আছে। স্কুলিং এর মূল উদ্দেশ্য তো শুধু জ্ঞানার্জনই নয়, এখানে মানুষ সামাজিক জীব হয়ে গড়ে উঠার দীক্ষাও পায়। অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে একেবারে ঘরের মধ্যে কম্পিউটারের সামনে পৌছে দিচ্ছে। শুধু তাই না এখন চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে একটা ৩-ডি গগলস চোখে লাগিয়েই টেকনিশিয়ানরা তাদের কাজ চালিয়ে নিতে পারে। এতে আর বড় বড় ম্যানুয়াল পড়ার দরকার হবে না। যেমন ধরুন একটা গাড়ি নষ্ট হলো, সেটা সারানোর জন্য একটা ৩-ডি গগলস চোখে লাগালেই সেখানে গাড়ির বনেট খোলা থেকে পরবর্তী প্রতিটি ধাপের নির্দশনা একটার পর একটা চোখের সামনে ভেসে উঠবে। আর ব্যবহারকারী সেই নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবে।</p><p><strong>৩। কম্পিউটারের সাহায্যে নক্সা (কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন)ঃ </strong><br /> <img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2009/10/garment.jpg" alt="garment" title="garment" width="370" height="289" class="alignnone size-full wp-image-17027" /><br /> এই ক্ষেত্রটি এখন শুধুমাত্র আর ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে সীমিত নেই। গয়না বা গার্মেন্টস যে কোন কিছুই কম্পিউটারের মাধ্যমে নক্সা করা যায় এবং প্রোটোটাইপ বা নক্সা করা প্রথম উপাদানটিকে একেবারে বাস্তবসম্মত ভাবে মনিটরের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।  যেমন এক কম্পিউটারের সামনে বসেই  এই শীতের জন্য একটা জ্যাকেট নকসা করে তার ৩-ডি সিমুলেশন একজন ভ্যারচুয়্যাল মডেলের গায়ে চাপিয়ে ক্রেতাকে আগেভাগেই মুগ্ধ করে রাখা যায়। এখন এই প্রতিযোগিতার বাজারে পুঁজিবাদী সমাজে সময় আর টাকা তো প্রায় সমার্থক শব্দ হয়ে দাড়িয়েছে।</p><p><strong>৪। অ্যানিমেশনঃ </strong><br /> <img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2009/10/srek.jpg" alt="srek" title="srek" width="92" height="130" class="alignnone size-full wp-image-17028" /><br /> ড্রীমওয়ার্ক অ্যানিমেশনের ’শ্রেক’স ল‘ নামে একটা নীতি রয়েছে।  এই নীতি অনুযায়ী প্রতিটি শ্রেক ছবি আগেরটার চেয়ে দ্বিগুন সংখ্যক রেন্ডার সময় নিবে। প্রতিটি ফ্রেমকে সে পদ্ধতিতে রঙ্গিন করে তোলা হয় সেই পদ্ধতিটাকে রেন্ডারিং বলে। পাশাপাশি দুটো শ্রেক মুভি দেখলে এর ফলটা বোঝা যাবে। খেয়াল করলে দেখা যাবে নতুন মুভিটির দৃশ্যগুলো আগেরটির তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম এবং বাস্তবতার কাছাকাছি।</p><p><strong>৫। ব্যবসায়িক সির্দ্ধান্েত সহায়তাঃ</strong><br /> <img src="http://static.cadetcollegeblog.com/wp-content/uploads/2009/10/graph.jpg" alt="graph" title="graph" width="129" height="78" class="alignnone size-full wp-image-17030" /><br /> এ ক্ষেত্রটিতে ভিজ্যুয়াল কম্পিউটিং এর সবে মাত্র যাত্রা শুরু হলো, এখনও অনেকদূর যাওয়ার আছে। মানুষের ব্রেন এমনভাবে গঠিত হয়েছে যে এটি ছবির মাধ্যমে উপস্থাপিত তথ্যকে সহজে গ্রহন করতে পারে। সংখ্যা না গ্রাফ কোনটি খুব দ্রুত বোঝা যায়? ছবির মাধ্যমে উপস্থাপিত তথ্য উপাত্ত অন্য কথায় বলতে গেলে ভিজ্যুয়াল কম্পিউটিং দ্রুত এবং কার্যকরী সির্দ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে ব্যবস্থাপকদের অনেক সহায়তা দিতে পারে।</p><p>লেখাটা একটু টেকি হয়ে যাচ্ছে। আজ এ পর্যন্তই।</p> ]]></content:encoded> <wfw:commentRss>http://www.cadetcollegeblog.com/noorafza/17024/feed</wfw:commentRss> <slash:comments>38</slash:comments> </item> </channel> </rss>
<!-- Performance optimized by W3 Total Cache. Learn more: http://www.w3-edge.com/wordpress-plugins/

Minified using disk
Page Caching using disk (enhanced)
Object Caching 724/753 objects using disk
Content Delivery Network via static.cadetcollegeblog.com

Served from: www.cadetcollegeblog.com @ 2010-07-30 05:27:00 -->