শুক্রবার সকাল।
সূর্যটা অন্য প্রতিদিনের মত একই সময়ে উঠলেও আজকের দিনটা অন্যদিনের মত নয়।আর নয় বলেই যে ছেলেটির প্রতিদিন সকালে বাঁশির বিকট আওয়াজেও ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হত,সে আজ এমনিতেই উঠে যায়।ভোরে আধো ঘুম আধো জাগরনে ছেলেটার প্রতীক্ষার প্রহরটি শুরু হয়।যাদের ছাড়া সে একটি দিনও কাটাতে পারবে না বলে ভেবেছিল,আজ এতদিন পর আবার তাদের দেখে সে কি করবে সেই হিসেবে ব্যস্ত ছেলেটি চিন্তিত মুখ নিয়ে বিছানায় চুপটি করে বসে থাকে..আর ভাবতে থাকে ফেলে আসা দিনগুলির কথা।বর্তমানের সাথে মিলিয়ে নিতে গিয়ে সে আর কূল পায়না…মনে হয় হঠাৎ করেই সব কিছু ঘটে গিয়েছে
গিয়েছে…কিছু বোঝার আগেই যেন কোন দৈত্য তাকে এই বন্দীখানায় রেখে গিয়েছে।স্বপ্নও কি কখনও এত দ্রুত ঘটে?মনে হয় না……
চিন্তার জাল একসময় ছিড়ে যায় এক সহপাঠীর আগমনে। এই বন্ধুটির সাথে কেন যেন সে তার অনেক মিল খুজে পায়।আর তাই এই স্বল্প সময়েও ছেলেটির সাথে খুব ভাব হয়ে যায় তার।বসে বসে তারা কিছুক্ষন খাপছাড়া আড্ডা দেয়….পাশের বেডের যমদূত এইটের সিনিয়র ভাইয়াটি দেখেও না দেখার ভান করে।আজ কি তাহলে দেখেও না দেখার দিন?হবে হয়ত…..
গল্প শেষে একসময় গোসল করে প্রস্তুত হতে থাকে ছেলেটি।প্রতিদিনকার দুই মিনিটের ঝটপট ম্যাগী গোসলের পরিবর্তে আজ সে বেশ সময় নিয়ে গোসল করে।এক ইঞ্চির চুলে যতই নানাভাবে চিরুনী চালায়,ততই কেন জানি চেহারায় এতিমের ভাব ফুটে উঠে। পাশের ভাইয়াটি যখন তার কাছ থেকে বডিস্প্রেটি নিয়ে গায়ে দিয়ে আয়নার সামনে বিভিন্নভাবে ঘুরে দাঁড়ায়,তখন তার কাছে মনে হয় তারা বোধহয় কোন ফ্যাশন শোতে যাচ্ছে। এমনকি যে রুমমেট বন্ধুটি নোংরা থাকার জন্য ভাইয়ার কাছে দাবড়ানি খায় নিয়মিত,তাকেও ধবধবে সাদা পোশাক পরে খুব মনোযোগ দিয়ে সাজুগুজু করতে দেখা যায়।
ব্রেকফাষ্টে ডাইনিং এ গিয়ে দেখে অনেকেই ব্রেকফাষ্ট করছে না। ছেলেটি ভেবে পায়না কেন….আজ নিশ্চয়ই সব অন্যরকম হওয়ার দিন।একটু পরেই ছেলেটি বুঝতে পারে এ না-খাওয়া কেবল আরেকটি বিশাল খাওয়ার পূর্বাভাস। হাসি মুখে প্লেটটি রেখে দিতে গিয়েও হঠাৎ ছেলেটির মনে হয় যদি বাবা-মা না আসে! ভাবতেই বুকের ভিতরটায় অজানা একটা ব্যাথা চিনচিন করতে থাকে। চুপ করে সে ব্রেকফাষ্ট খেয়ে নেয় আর ভাবতে থাকে…যদি না আসে…
হাউজে এসেও তার ভাবনাটি শেষ হয়না।ইতিমধ্যেই অবশ্য মাইকে বিভিন্ন নাম ঘোষনা শুরু হয়ে গিয়েছে। রুমে বসে ছেলেটি যখন কান্নাকান্না মুখ নিয়ে বসে থাকে…তখন রাগী ভাইয়াটির অসম্ভব কোমল কন্ঠে সে শুনতে পায়,আরে চিন্তা কইরো না..বাপ মা না আইসা যাইব কই।ভাইয়ার কথা শেষ না হতেই মাইকে ছেলেটির নাম ঘোষিত হয়..আর অসম্ভব দ্রুততায় বদলে যায় ছেলেটির মুখের ভাব।
দাঁত বের করা হঠাৎ হাসিটি ভাইয়ার নজর এড়ায় না..
: কি এখন খুব খুশি,না?
: জি ভাইয়া।
: ঠিক আসে…তাইলে দশটা পুশআপ দিয়া তারপর যাও।
ছেলেটা কি কমান্ড শেষ হওয়ার আগেই পুশআপ দিতে থাকল?ঠিক খেয়াল করিনি..তবে তাকে দেখে মনে হচ্ছে পুশআপ দেওয়ার মত মজার কাজ বোধহয় পৃথিবীতে আর দুটি নেই।
লম্বা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে সে দুর থেকেই দেখতে পায় তার বাবা-মাকে। কিন্তু একি…চোখ ভিজে আসছে কেন?আরে বোকা..তুমি না ক্যাডেট?জানো না
ক্যাডেটরা কখনও কাঁদেনা…তাদের কাঁদতে হয়না। কিন্তু ছেলেটি তার পানি লুকানোর মত কোন আড়াল খুজে পায়না ..শেষ অংশটুকু যেন দৌড়েই পার হয় আর ঝাপিয়ে পড়ে মায়ের কোলে।এই শীতল পরশ ছাড়া সে এতদিন ছিল কিভাবে…? মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ছেলেটি অবাক হয়ে ভাবতে থাকে আর তার চোখে কোন কারন ছাড়াই অঝোর বৃষ্টি নেমে আসে।
তার পরের চারঘন্টা যেন উড়ে উড়ে যেতে লাগল…। কত জিজ্ঞাসা বাবার-মায়ের..কি দিয়ে খাস,কিভাবে খাস..সকালে কি খেয়েছিস….আরও হরেক করম প্রশ্নের ঝুলি।উত্তর দিতেও তার খারাপ লাগেনা…বরং বাবা- মায়ের বড় হয়ে যাওয়া চোখদুটোকে সে উপভোগই করে।যতটা না,তার চেয়েও একটু বেশি ভাব মিশিয়ে ছেলেটি ধারাভাষ্য দিতে থাকে…আর কিছুক্ষন পর পরেই মায়ের স্নেহমিশ্রিত অবাক দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর আবার কান্না বেয়ে উঠে।মাকে ছেড়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হবে কিনা সেই চিন্তা তার চলমান ধারাভাষ্যে মাঝেমাঝে বিঘ্ন ঘটাতে থাকে…
অবশেষে এক সময় স্বপ্নিল সময়টি কেটে বাস্তবতায় ফিরে আসতে হয় তাকে…এক ছেড়ে যাবার পালা….।চারঘন্টার আনন্দশিখা যেন এক ফুঁৎকারে নিভে যায়।অসহায় চোখে সে চারপাশে তাকাতে থাকে।হাউজের ভয়ানক রাগী ভাইয়াটির প্যারেন্টসকে যখন সে দেখতে পায় তাদের আদরের সন্তানের মুখে চুমু এঁকে দিচ্ছে, আর বিব্রত মুখের সেই যমসম ভাইয়াটিকে তখন তার কাছে ছোট্ট এক শিশুর মত মনে হয়। কিংবা আকুলতা নিয়ে যখন বাবা-মায়েদেরকে হাউজ মাষ্টারের সাথে কথা বলতে দেখা যায়….তখন সে ভেবেই পায়না বাবা মায়েরা এত উদ্বেগ বুকে নিয়ে বেচে থাকে কিভাবে..এভাবে বাঁচা কি আদৌ সম্ভব।
আসার সময় সে পথটুকুতে সে উড়ে যাচ্ছিল প্রায়..ফিরতি যাত্রায় সেই পথে ছেলেটির পা আর চলতে চায়না।হাউজে আসার পথে চেকিংয়ে যখন তার লুকিয়ে আনা চকলেট বারটি যখন ধরা পড়েনা…তখনও তার মন ভালো হয়না….মন খারাপের পাহাড় নিয়ে ছেলেটি ফিরে আসে তার রুমে …..
জুম্মার নামাযের জন্য সবার আগে গিয়ে বসে থেকে ছেলেটি যখন কাঁদতে থাকে…তখন পিঠে হাত পড়ে সেই বন্ধুটির ..তারও চোখ লাল…..তারপর দুজনেই লাল চোখে বসে কথা বলতে থাকে ফেলে আসা চারটি ঘন্টা নিয়ে…আর উপর থেকে উপরওয়ালা বোধহয় লালচোখের সেই ছেলেদুটোর দিকে তাকিয়ে আপনমনেই হাসতে থাকেন…..
আব্বা আম্মা….তোমাদের একটা কথা বলি….ছেলেমেয়েকে এত ভালোবাসতে নেই…তাহলে ছেলেমেয়েরা খুব কষ্ট পায়..খুব….
ধুরো, তোমাদের ব্যাঞ্চাই….
অনটপিক: আমাদের কলেজে আগে মাইক দিয়ে যাদের প্যারেন্টস আসছে তাদের ডাকা হত।অনেকে হয়ত বুঝবে না,তাই বল্লাম।


(৫ভোট, ৪.২০/ ৫)
২৫ টি মন্তব্য
[ জবাব দিন ]
আপনে ব্যান আছেন..তাই আপনারটা কাউন্ট করলাম না।
নেক্সট……..?
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
প্যারেন্টস ডে নিয়ে এইটা মনে হয় প্রথম পোস্ট।আমার অনুভূতির সাথে হুবহু মিলে গেল।ইস,একবার ফেরিঘাটে দেরী হওয়ায় আম্মুর সে কি কান্না!
অদ্ভুত সুন্দর লিখেছিস রে!মনে হচ্ছে আমি এখনো প্যারেন্টস ডে শেষে ফিরতি রাস্তায় সেই বার বার পিছনে ফিরে তাকানো ক্যাডেট…
[ জবাব দিন ]
অসাধারন লাগলো বন্য ………
[ জবাব দিন ]
লেখার ধরণটা বরাবরের মতই দারুণ। তবে প্যারেন্টস ডে র ফিলিংসটা আমার সাথে মিলল না। ভালোলাগা সময়টুকু সেখানে রেখে এক ঝটকায় আমি খুব স্বাভাবিক হয়ে যেতাম। আর যেসব পোলাপান কাঁদত তাদের দেখলে শুধু মেজাজ খারাপ হইতো।
এমন নির্দয় মন্তব্যের জন্য আমার ব্যঞ্চাই। তবে বাবা মার কষ্ট এখন কিছুটা বুঝি। সামনের সপ্তাহে আমার ছোট ভাইটারে হোস্টেলে দিতাসি বইলা।
[ জবাব দিন ]
এই ব্যাটা বিদেশ বিভুঁইয়ে বাবা, মা, ঢাকা এর কথা মনে করিয়ে দেয়ার জন্য তোর ব্যান্চাই ।
[ জবাব দিন ]
ফুয়াদ মনে হল আমার প্যারেন্টস ডে এর অনুভূতিই তুই লিখছিস। সেই খারাপ লাগাটা যেন তোর এই লেখাটার মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য পেলাম। সুন্দর লেখা।
৯৯’ এর পোলাগুলা দেখি আজ চরম লেখা দিচ্ছে।
[ জবাব দিন ]
‘৯৯
[ জবাব দিন ]
অসাধারন লাগল বন্য…
আমার ১ম প্যারেন্টস ডে তে আমি হাসপাতালে ছিলাম, বাবা-মা হাসপাতালের নাম শুনেই যে ভয় পাইছিল… ভাবছিল কিনা কি জানি হইছে…
আমার কোন প্যারেন্টস ডে তে আসবে কি আসবে না এমন টেনশন হতো না, কারন পুরো কলেজ লাইফে আব্বু একটা প্যারেন্টস ডেও মিস করেনি, অপেক্ষায় থাকতাম আম্মু আসবে কিনা তার জন্য… তবে সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করতাম মনে হয় ছোট ভাইয়ের জন্য… ও আসলেই আমার প্যারেন্টস ডে পরিপূর্ণ হতো ( কত ইচ্ছা ছিল ও ক্যাডেট কলেজে থাকবে আর আমি ওকে দেখতে যাব… কিন্তু বাপ-মা কলেজে দিতেই রাজি হইল না
)
[ জবাব দিন ]
ধুর দিলি মন্টারে ভারী কইরা……….
এমনিতেই বাইরে বৃষ্টি
[ জবাব দিন ]
বন্য,
অসাধারণ।
মন খারাপ করানোর জন্য তোমার ব্যাঞ্চাই…।
[ জবাব দিন ]
আহারে আলম পোলাটা বড়ই ভাল আছিল।
প্যারেন্টস ডে তে কেও না আসলে মন যে কি খারাপ হইত কি আর বলব
[ জবাব দিন ]
অসাধারন
[ জবাব দিন ]
বন্য ভাইয়া, ক্যাডেট কলেজে পড়িনি, তাই মা-বাবাকে ছেড়ে থাকার কষ্ট ছোট থাকতে বুঝিনাই,
মনে হচ্ছিল আমিও তোমার কাছে চলে গেছিলাম।
জীবনের অনেকটা সময় ওদের নিয়ে ছিলাম, এমনকি যখন লন্ডনে পড়তে আসলাম, তখনও মা-বাবা আমাদের সাথে ছিল অনেকটা সময়। কিন্তু এখন কষ্টটা বুঝতে পারছি, এত দূরে থাকা, ইচ্ছে থাকা সত্বেও অদের দেখতে পারছিনা।
এত চমৎকার করে লিখলে মন খারাপ করে দিলেতো …
[ জবাব দিন ]
< এক ইঞ্চির চুলে যতই নানাভাবে চিরুনী চালায়,ততই কেন জানি চেহারায় এতিমের ভাব ফুটে উঠে। >
[ জবাব দিন ]
Abaro parents day korte monchay
[ জবাব দিন ]
আগের দিনের কথা মনে করায়া দিলিরে ফুয়াদ।
[ জবাব দিন ]
আমার এক দুস্ত ছিল, নাম কমু না। কিছু সমস্যার জন্য গোটা কলেজ জীবনের মাত্র হাতে গুনে ৪-৫ টা প্যারেন্টস ডেতে ওর প্যারেন্টস আসতো। প্যারেন্টস ডেতে ওর মন খারাপ করে ডর্মে বসে থাকা দেখতে খুব খারাপ লাগতো। জোর করে টেনে হিচড়ে নিয়ে যেতাম। একবার প্যারেন্টস ডের মাঝখানে ডর্মে খাবার রাখতে এসে দেখি ওবালিশে মুখ চেপে কাদছে। কিছু বলতে পারিনি।
[ জবাব দিন ]
ফুয়াদ ভাই সব কিছু কইলেন কিন্তু পারেন্টস ডে এর পরে রুম চেকিং এর কথা কন নাই… উফফ সে যে কি বিরক্তিকর জিনিস…
সব খাবার নিয়া গিয়া আবার সে কি ঝারি
কয়েকটা চকলেট আইন্না কি যে মসিবতে পরতাম
আর ঝারি
লগে
:chup:
ত ফ্রী… লগে স্টেটমেন্ট ও ফ্রী…
[ জবাব দিন ]
দারুন লিখেছো। একেটানে এক যুগ পেছনে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো এই পোষ্টটা।
বিদেশের মাটিতে এমন লেখা পড়লে চোখের পানি ধরে রাখা মুশকিল। এই জন্য বন্যের ব্যান চাই
।
অফটপিকঃ পাঁচ তারা দিলাম
।
[ জবাব দিন ]
আহ প্যারেন্টস ডে!!!
তবে কাজিনরা গেলে আমি বেশি খুশি হইতাম। ক্লাস সেভেনে আমার ছোটোভাই যেত, পরের বছর তো ও ই কলেজে জয়েন করল। এই সুবাদে কলেজ থেকে বের হওয়ার সাতদিনের মধ্যেই আমি আবার কলেজে গেসিলাম প্যারেন্টস ডে তে
[ জবাব দিন ]
ইশশ জাপানেও যদি পেরেন্টস ডের ব্যবস্থা হইত! পেরেন্টস ডে কর্বারমঞ্চায়।
[ জবাব দিন ]
ফুয়াদ, দারুন লিখছ।
[ জবাব দিন ]
আমাদের তো মাইক ছিল না। বাসা থেকে চিঠি পেয়ে আগেই জানতাম বাবা-মা আসবে কিনা। আমরা অ্যাকাডেমিক ব্লকে অপেক্ষা করতাম। দূর থেকে বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনকে দেখলে ছুটে যেতাম……………… কেন জানি কলেজে কখনোই বাবা-মা বা বাসার জন্য আমার মন খারাপ হতো না।
হোম সিক আমি একবারই ফিল করেছি। ২০০৪ সালে ৪০ দিনের জন্য ভারতে নির্বাচন কাভার করতে গিয়ে। সময় যেন শেষ হচ্ছিল না।
বন্য, তোমার লেখাটা পড়তে দেরি করে ফেললাম। দোষ নিও না।
[ জবাব দিন ]