প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া ক্রিকেটকে বাঁচানো সম্ভব না!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমরা সবাই আপনাকে ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে জানি। আমরা শুনেছি শত ব্যস্ততার মাঝেও আপনি বাংলাদেশের খেলাধুলার খবর রাখেন। এমনকি মাঝে মাঝে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলা দেখার জন্য আপনি স্টেডিয়ামেও ছুটে যান, দলের সাফল্যে আর দশটা সাধারণ মানুষের মত খুশিতে হাততালি দিয়ে ওঠেন!

কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে যে অস্থিরতা, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা চলছে তা কি আপনি দেখতে পান?

এক সময়ের দেশের এক নম্বর খেলা ফুটবল আজ মৃতপ্রায়! বাফুফে প্রেসিডেন্ট শুধু মুখেই হাতি-ঘোড়া মারেন, কাজের বেলায় ঠনঠন! দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং খামখেয়ালিপূর্ণ পদক্ষেপে বাংলাদেশ ফুটবল উলটো পথে হাঁটছে। আপনি কি জানেন সর্বশেষ ফিফা র‍্যাংকিং অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৯৩? বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই আমাদের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে খারাপ অবস্থান!

আচ্ছা ফুটবলের কথা বাদই দিলাম! আপাত দৃষ্টিতে সফল বাংলাদেশে ক্রিকেটের অন্তরালে যা ঘটছে সে ব্যাপারে আপনি কি অবগত আছেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনার বাংলাদেশ ক্রিকেট-বোর্ডের প্রধান জনাব নাজমুল হাসান পাপনের মত স্বেচ্ছাচার, অকর্মণ্য ও বাচাল প্রেসিডেন্ট পৃথিবীর অন্য কোন দেশে নেই! মাইক সামনে পেলে তিনি যেন পাগল হয়ে ওঠেন। অযৌক্তিক, অসত্য এবং অপ্রিয় কথা বলায় তার জুড়ি মেলা ভার! ক্রিকেটারদের নিয়ে তিনি জনসমক্ষে খোঁচা দিয়ে কথা বলেন, প্রতিপক্ষ দলের সফর নিয়ে মনগড়া তথ্য দেন, বাংলাদেশের র‍্যাংকিং নিয়ে ভুল তথ্য দেন। এমনকি বাংলাদেশ ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার মাশরাফিকে নিয়েও তিনি মিথ্যাচার করেন। আপনি জানেন কি না জানিনা, মাশরাফি’র টি-২০ থেকে হঠাৎ অবসরের পেছনে এই লোকই দায়ী! ক্রিকেট বোর্ডের জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ- সবকিছু নিয়ে পাপন সাহেবের নাক গলানো চাই! পৃথিবীর অন্য কোন বোর্ড প্রেসিডেন্ট মূল দল বা একাদশ নিয়ে কথা না বললেও পাপন সাহেব এটা নিয়মিত করেন।

আপনি কি জানেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের বর্তমান কোচ হাথুরুসিংহে’র ক্ষমতা প্রায় ঐশ্বরিক? তিনি চাইলেই যে কোন খেলোয়াড়কে দল থেকে বের করে দিতে পারেন, কিংবা চাইলেই দলে নিতে পারেন! তিনি একাধারে কোচ এবং নির্বাচক। অবশ্য, নির্বাচক কমিটিতে কোচের থাকা নতুন কিছু নয়। তবে শঙ্কার জায়গাটা হাথুরুসিংহে বলেই। আগে বাইরে থেকেই দল নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতেন, এখন অনেকটা নিজের পছন্দেই গড়ছেন স্কোয়াড! ক্রিকেটাররাও নিশ্চিতভাবেই দলে জায়গা নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মজার ব্যাপার, হচ্ছে ঘরোয়া খেলা দেখার ব্যাপারে তার কোন বাধ্যবাধকতা নেই!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে এমন একজন ব্যক্তি আছে যিনি একাধারে প্রায় ১০/১১ টি দায়িত্বে আছেন। তার নাম খালেদ মাহমুদ সুজন। সাবেক এই অধিনায়ক বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন চলমান এক প্রশ্নের নাম। বোর্ড পরিচালক হওয়ার পরও তিনি ম্যানেজার হন কিভাবে? শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে তিনি বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, একটি বিপিএল দলের কোচ, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের দলের কোচ, ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ইত্যাদি। সবগুলো দায়িত্বই পরস্পর সাংঘর্ষিক। সবচেয়ে বড় কথা ম্যানেজার হয়ে তিনি নির্বাচকও? ক্রিকেট ইতিহাসে এই নজির আর আছে বলে জানা নেই। এত ক্ষমতা সুজন কোথায় বা কিভাবে পান?

একটি দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের অবকাঠামোর উপর। অর্থাৎ ঘরোয়া ক্রিকেট, ক্রিকেট নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে ক্রিকেটারদের তুলে আনার উপর। দুঃখের ব্যাপার এই যে এ ব্যাপারে আমাদের বোর্ড একেবারেই উদাসীন। আমাদের দেশে নাম কা ওয়াস্তে ক্রিকেট লীগ হয়। চারদিনের খেলার চেয়ে বোর্ড বিপিএল এর ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী! অথচ সেই বিপিএল-ও কলঙ্কমুক্ত নয়। ফিক্সিং, দুর্বল আম্পায়ারিং, খেলোয়াড়দের বেতন-ভাতা পরিশোধে গড়িমসিসহ নানা অভিযোগ!

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও নানা অভিযোগে অভিযুক্ত! বোর্ড প্রেসিডেন্ট পাপন এবং জাতীয় দলের ম্যানেজার (এবং আরও অনেক কিছু) সুজন আবাহনী লিমিটেডের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত! আর এ কারণেই নাকি আবাহনী অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পায়। এটা শুধু অভিযোগ নয়, এর স্বপক্ষে প্রমাণও আছে!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
শুধু প্রথম বিভাগই নয়, দেশের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেটও দুর্নীতির কালো থাবায় আক্রান্ত! দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে গতকাল এক্সিয়ম এবং লালমাটিয়া ক্লাবের মধ্যকার খেলা ছিল। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে লালমাটিয়া মাত্র ১৪ ওভারেই (৫০ ওভারের খেলা) ৮৮ রানে অল আউট হয়ে যায়। জবাবে মাত্র ৪ বলেই এক্সিয়ম ৯২ রান করে ম্যাচ জিতে নেয়!! লালমাটিয়ার বোলার মাহমুদ সুজন ৪ বলেই ৬৪ টি ওয়াইড ও ১৫ টি নো-বলসহ ৯২ রান দেন।

লালমাটিয়ার জেনারেল সেক্রেটারি জানিয়েছেন, বাজে এবং পক্ষপাতদুষ্ট আম্পায়ারিং এর প্রতিবাদেই তারা এমন করেছেন!

শুরু থেকেই এক্সিয়ম দলটির উত্থান বিস্ময়কর! বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের জনৈক এক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার এই দলটি বছর দুয়েক আগে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তৃতীয় বিভাগে সুযোগ পেয়েছিল। কেননা, সেবার কোয়ালিফাইং রাউন্ডে অংশই নিয়েছিল মাত্র দু’টি দল! কোন এক ‘অদ্ভুত কারণে’ বিসিবি সেবার নতুন দলের রেজিস্ট্রেশন ফি কয়েকগুণ বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করেছিল! অথচ, এই কোয়ালিফাইং রাউন্ডকে নবাগত ও স্বল্প বাজেটের দলগুলোর জন্য বড় পরিসরে খেলার সুযোগ হিসেবে দেখা হত!!

শুধু এই ম্যাচটিই নয়, দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেটে গত সপ্তাহেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। গত ৩ এপ্রিল কাঁঠাল বাগান গ্রিন ক্রিসেন্ট ক্লাব এবং নর্থ বেঙ্গল ক্রিকেট একাডেমী’র মধ্যকার ম্যাচে আম্পায়ারগণ কাঁঠাল বাগানের ৭ জন খেলোয়াড়কে এলবিডব্লিউ আউট দেন। অথচ অনলাইন স্কোরবোর্ডে এটা নিয়ে ঘষা মাজা করা হয়েছে। প্রথমে দেখানো হয়েছে ৬ জন, কিছুক্ষণ পর ৫ জন এবং সবশেষে ৪ জনকে এলবিডব্লিউ দেখানো হয়েছে। বিতর্ক ঢাকতেই নাকি এরকম করা হয়েছিল!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
ক্রিকেট এখন শুধুমাত্র একটি খেলাই নয়-বাংলাদেশের কোটি মানুষের আবেগের জায়গা। দেশের শত সমস্যার মাঝে ক্রিকেটই পারে আমাদের মুখে হাসি ফোটাতে। শত বিভাজনের মাঝেও একমাত্র ক্রিকেটই পারে আমাদেরকে এক করতে।

সেই ক্রিকেটকে আপনি ধ্বংস হতে দেবেন না! দেশ-বিদেশের অনেক পত্রপত্রিকা-ওয়েবসাইটে ক্রিকেটবোর্ডের দুর্নীতি নিয়ে একের পর এক লেখা আসছে। অর্থাৎ, কিছু দুর্নীতি-পরায়ন ও স্বেচ্ছাচার মানুষের জন্য ক্রিকেটের পাশাপাশি বাংলাদেশের ভাব-মূর্তিও হুমকির মুখে।

আপনি চাইলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যাবতীয় সমস্যা এক নিমিষেই সমাধান করতে পারেন। ক্ষমতা এবং নিজেকে ভালবাসে এমন কাউকে নয়, বরং ক্রিকেট ভালবাসে এমন কাউকে বোর্ড সভাপতি নিয়োগ করুন। সব আপনা-আপনিই ঠিক হয়ে যাবে।

———————————————–

রেফারেন্সঃ
১। দেশের ক্রিকেটে অশনি সংকেত, বিসিবি প্রধান কি শুনতে পাচ্ছেন
২। Digital manipulation in 2nd Div League!
৩। Bangladesh Cricket Board faces accusation of digital manipulation
৪। That’s not cricket
৫। Bowler gives away 92 runs in four balls
৬। Bowler concedes 92 runs from four legal deliveries

৫ টি মন্তব্য : “প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া ক্রিকেটকে বাঁচানো সম্ভব না!”

  1. খায়রুল আহসান (৬৭-৭৩)

    ক্রিকেটের প্রতি অসীম মমত্ববোধ থেকে এ লেখাটি এসেছে। এর ব্যাপক প্রচার হোক, উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কানে এ বার্তাটি পৌঁছাক।
    ধন্যবাদ, এ সময়োপযোগী পোস্টের জন্য।


    সবার মাঝে নীরব,
    একা একাই সরব।

    জবাব দিন
  2. ভাল একটি পোস্ট করেছেন। আপনার কথার সাথে আমি একমত পসন করছি।
    আসলে আইসব দুর্নীতির এইসব খবর গুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর কাছে পৌঁছে না। তাই এইসব বিষয়ে তিনি সরাসরি কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনা।
    আসাকরি আপনার এই লেখাটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পওছবে।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য