অস্ট্রেলিয়ায় অ্যাশেজঃ ইংলিশ খেলোয়াড়দের অগ্নি পরীক্ষা!

ঐতিহাসিকভাবেই ইংলিশ খেলোয়াড়দের জন্য প্রতিটি অস্ট্রেলিয়া ট্যুর অত্যন্ত কঠিন। প্রতিপক্ষ হিসেবে শুধু অসি ক্রিকেট দলই নয়, অস্ট্রেলিয়ার সবকিছু এবং সবাইকে মোকাবেলা করতে হয়। এই লড়াই শুরু হয় দেশটিতে পা রাখার আগে থেকে, আক্ষরিক অর্থেই! কেননা, এমনও হয়েছে প্লেনের পাইলট নিজেই ইংলিশ খেলোয়াড়দের স্লেজিং করছেন!!

অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে ইংল্যান্ড যে সিরিজ জেতে নি, তা নয়। কিন্তু সংখ্যায় সেটা খুব কম। ১৯৫৪-৫৫ মৌসুমের পর মাত্র চারবার জিতেছে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া গিয়ে ইংলিশ দল বহুবার নাস্তানাবুদ হয়েছে, এমনকি অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় খেলা এতটাই কঠিন। কেননা, এখানে প্রতিপক্ষ একাধিক-ক্রিকেট দল, দর্শক, সাধারণ জনগণ এবং সংবাদ মাধ্যমও!

সাধারণ মানুষ যখন প্রতিপক্ষ!

ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া দ্বৈরথ এমনিতেই অনেক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। অ্যাশেজ হলে সেটা বহুগুণে বেড়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ান জনগণ সেই দ্বৈরথকে এতটাই বাড়িয়ে দেয় যে সেটাকে শত্রুতা বলাই যুক্তিযুক্ত! এ যেন সত্যিকারের কোন যুদ্ধ!

ইংল্যান্ডের উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান জনি বেয়ারস্টো একটি ঘটনা উল্লেখ করেছিলেন। “গ্যারি ব্যাল্যান্স এবং আমি লায়ন্স টিমের হয়ে খেলার জন্য অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম। একদিন আমরা শহরে গাড়ি নিয়ে ঘুরছিলাম। এক পর্যায়ে গাড়ি থেকে নামার পর কিছু নির্মাণ শ্রমিক আমাদের দেখে ফেলে। আমাকে দেখেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, ‘তুমি সানস্ক্রিন ক্রিম লাগিয়েছ তো?’ বলা বাহুল্য আমার ফ্যাকাসে রঙের কারণেই ওরা খোঁচা মেরে কথাটা বলেছিল!”

উল্লেখ্য তখন কিন্তু কোন অ্যাশেজ সিরিজ ছিল না। সুতরাং, বুঝতেই পারছেন এসেজের সময় অস্ট্রেলিয়ান জনগণের ব্যবহার কেমন ‘উষ্ণ’ হতে পারে!!

১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে ইংলিশ ব্যাটসম্যান জন ক্রলি অনুশীলন শেষে হোটেলে ফেরার সময় এক বদ্ধ মাতাল তাকে ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করে ফেলে। এই ঘটনায় ক্রলি এতটাই নাড়া খেয়েছিলেন যে পুরো সিরিজেই রান করতে পারেন নি। বেচারা সেবার ৩ টেস্টে ১৪ গড়ে মাত্র ৮৬ রান করেছিলেন!

অবশ্য এতটা বাড়াবাড়ির পর্যায়ের ঘটনা সাধারণত ঘটে না। বেশিরভাগক্ষেত্রেই ‘আক্রমণগুলো’ হয় মজার এবং বুদ্ধিদীপ্ত।

“একবার ব্রিসবেন টেস্টের প্রথম দিন শেষে আমরা হোটেলে ফিরছিলাম। রাস্তায় আমাদের বাসের পাশে একজন অসি মোটরবাইক চালক আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হাহ! তোমরা তাড়াহুড়া করে চলে এলে যে! খেলা তো দারুণ হল!’ এমনভাবে বলল যেন আমরা খেলতে যাই নি, দর্শক ছিলাম মাত্র!” এভাবেই স্মৃতিচারণ করেছেন সাবেক ইংলিশ অফিস্পিনার গ্রায়েম সোয়ান।

দর্শক

যে দেখে তাকে দর্শক বলা হলেও অস্ট্রেলিয়ান দর্শকদের শুধু এইটুকু দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না। কারণ ওরা খেলা দেখবে, আপত্তিকর গান গাইবে, গালি দেবে, চিৎকার করবে-অর্থাৎ যতটা সম্ভব বিপক্ষদলের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে। গ্যাবা স্টেডিয়ামের দর্শক সবসময় এত শব্দ করে যে এখানকার কনক্রিট অনবরত কাঁপতে থাকে!

এই মাঠে একাধিকবার নিরাপত্তাকর্মীদের নজর এড়িয়ে (আসলেই কী তাই?!) শুকরছানা নিয়ে ঢোকার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৩ সালে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ওডিআই চলাকালীন এক দর্শক শুকরের গায়ে ‘বোথাম’ লিখে মাঠে ছেড়ে দিয়েছিল!

শুধু দর্শক নয়, পরিসংখ্যানগত কারণেও ব্রিসবেন অসিদের শক্ত ঘাঁটি। এখানে তারা মোট ৫৯ টি টেস্ট খেলেছে। জিতেছে ৩৭, হেরেছে মাত্র ৮ টি। বাকিগুলো ড্র হয়েছে। শুধু শুধু তো আর ব্রিসবেনকে অসিদের দুর্গ বলা হয় না! ১৯৮৬ সালের পর ব্রিসবেনের মাঠে ইংল্যান্ড কোন টেস্ট জেতেনি।

“ব্রিসবেন যেন ফুটন্ত কড়াই। আমি যত মাঠে খেলেছি এখানকার দর্শকই সবচেয়ে কম ভদ্র। ওরা ভীষণ সরব এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর!” সোয়ানের সোজাসাপ্টা মূল্যায়ন!

“আপনি দেখবেন স্টেডিয়ামে সুন্দর করে লেখা আছে রেস, জেন্ডার বা সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টশন নিয়ে স্লেজিং করা যাবে না। অথচ ঐ তিনটি বিষয় ঘিরেই নিয়ে যতটা সম্ভব স্লেজিং করা হয়!”

ইংল্যান্ডের জন্য দুঃসংবাদ যে এই মাঠেই এবারের অ্যাশেজ সিরিজের প্রথম টেস্ট হবে। খেলা শুরু হবে ২৩ নভেম্বর।

ব্রিসবেন যদি ফুটন্ত কড়াই বলা যায়, মেলবোর্ন নিঃসন্দেহে জ্বলন্ত উনুন। এমসিজি’র ধারণক্ষমতা ৯০,০০০! এখানকার দর্শক এতটাই বেপরোয়া যে একবার ম্যাচ চলাকালীন অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়েছে! তৎকালীন অসি-অধিনায়ক রিকি পন্টিং দর্শকদের করজোড়ে শান্ত থাকার অনুরোধও করেছিলেন!

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবে অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথের মতে, “ইংল্যান্ডে খেলা অনেকটাই উৎসবের মত। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপারটি অত্যন্ত কঠিন! পার্থক্য শুধু শব্দের মাত্রায়ই নয়, সমর্থনেও। অসি দর্শকগণ অত্যন্ত একপেশে। তারা সারাদিন ধরে এবং প্রতিদিনই আপনাদেরকে আক্রমণ করে চলবে। এক কথায় অত্যন্ত উগ্র দর্শক!”

একবার ইংলিশ স্পিনার ফিল টাফনেল অসি দর্শকদের টার্গেটে পরিণত হয়েছিলেন। সেবার তার দিকে কে জানি ‘পাই’ পর্যন্ত ছুঁড়ে মেরেছিল! এবং সেবার তার সাথে ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম ‘বিখ্যাত’ দর্শক স্লেজিং এর ঘটনাও ঘটেছিল। মেলবোর্নের এক দর্শক চিৎকার করে বলেছিল, ‘ঐ টাফনেল, তোমার মগজটুকু একটু ধার দাও। আমরা একটা আহাম্মক তৈরি করছি!!”

অবশ্য মাঝে মাঝে পাশার দান উল্টেও যায়!!

২০১০-১১ অ্যাশেজ মৌসুমে অসি ফাস্ট বোলার মিচেল জনসন অনেকটাই নিষ্প্রভ ছিলেন। সিরিজের শেষের দিকে অসি দর্শক তাকেই স্লেজিং করেছে। জনসনকে লক্ষ্য করে তারা বার্মি আর্মিদের (ইংল্যান্ডের উগ্র দর্শকগোষ্ঠী) বানানো গান গেয়েছে!

সোয়ানের মতে, “অস্ট্রেলিয়ার দর্শক যখন এরকম করে মনে হয় আমরা যেন হলিউড সিনেমা রকি ৪ এ অভিনয় করছি! আসলে অসি দর্শক পল্টি খেতে ওস্তাদ, কেননা ওরা হেরে যাওয়া মেনে নিতে পারে না। যে দল জেতে তাদের পক্ষেই চলে যায়। সেবার আমরা এই সত্যটা ভালভাবেই উপলব্ধি করেছিলাম!” উল্লেখ্য, সেই সিরিজটি অস্ট্রেলিয়া ১-৩ ব্যবধানে হেরেছিল।

মাঠের স্লেজিং

অ্যাশেজ এবং স্লেজিং ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত।স্লেজিং এর ঘটনা নিয়ে অসংখ্য বই,আর্টিকেল, এমনকি টি-শার্ট, পোস্টারও আছে। এর কিছু সত্যি, কিছু আছে অতিরঞ্জিত।সত্য হোক বা অতিরঞ্জিত-সবকিছুই অ্যাশেজ উন্মাদনার অংশ।

অ্যাশেজ উন্মাদনাকে উস্কে দিতে ডেভিড ওয়ার্নার ঘোষণা দিয়েছেন ৫ ম্যাচের অ্যাশেজ সিরিজ শুধু ক্রিকেট নয়, এটা যুদ্ধ! তিনি বলেছেন, “আমি সবসময় প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করি কিভাবে তাকে অপছন্দ করা যায়, কিভাবে তাকে হারানো যায়!”

“আপনি যদি কোনভাবে প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করতে পারেন তাহলে তাকে হারানো সহজ হয়ে যায়। খেলার সময় আর কোন অনুপ্রেরণার প্রয়োজন পড়ে না!”

কথিত আছে কোন এক টেস্টে ফিল টাফনেল অসি ফাস্ট বোলার ক্রেইগ ম্যাকডরমেটকে আউট করার পর তিনি সহজভাবে নিতে পারেন নি! মাঠেই হুমকি দিয়েছিলেন ‘আশা করি হাসপাতালের খাবারে তোমার অরুচি নেই!’ বলে! মার্ভ হিউজ তার ক্যারিয়ারে এত স্লেজিং করেছেন যে তা নিয়ে আস্ত একটি বইই লিখে ফেলা যাবে। স্টিভ ওয়াহ্‌র নেতৃত্বে অসিদল শুধুমাত্র স্লেজিং করেই বিপক্ষ দলের মনোবল ভেঙে দিতে পারত!

শুধু প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়গণই নন, খেলার মধ্যে আম্পায়ারদের সাথে বিবাদে জড়াবার ইতিহাসও আছে! অভিযোগ আছে একবার ফিল টাফনেল অসি আম্পায়ার পিটার ম্যাকোনেলকে ‘কত বল বাকি আছে?’ জিজ্ঞাসা করার পর জবাব পেয়েছিলেন, “কাউন্ট দেম ইয়োরসেলফ, ইউ পমি বাস্টা*!” (উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের লোকজন অবজ্ঞার্থে ব্রিটিশদেরকে পমি বলে ডাকে)

অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া

স্লেজিং করার ক্ষেত্রে অসি মিডিয়াও কম যায় না। সম্ভবত স্টুয়ার্ট ব্রডের চেয়ে সেটা আর কেউ ভাল জানে না! ২০১৩ সালের ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হওয়া অ্যাশেজ সিরিজের ট্রেন্টব্রিজ টেস্টের ঘটনা। স্পিনার এশটন অ্যাগারের করা বল ব্রডের ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপে (উইকেটকিপার হ্যাডিনের গ্ল্যাভসে লেগে) হাতে ধরা পড়ার পরও তিনি ওয়াক না করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আম্পায়ার আলিম দার নট আউট ঘোষণা দিলেও মাঠে উপস্থিত সবাই বুঝতে পেরেছিল ব্রড আউট, কিন্তু অসিদের কোন রিভিউ অবশিষ্ট ছিল না! ফলে, ব্রড আউট হয়েও বেঁচে যায়।

ঘটনাটি অস্ট্রেলিয়া দল সহজভাবে নেয় নি। কোচ ড্যারেন লেহম্যান সরাসরি ব্রডকে ‘আস্ত প্রতারক’ বলে অসি সমর্থকদের বলেছিলেন তারা যেন বছরের শেষে ফিরতি অ্যাশেজ সিরিজে তাকে ‘কাঁদিয়ে ছাড়ে!’

অসি সমর্থকগণ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। তারা নিয়মিত ‘স্টুয়ার্ট ব্রড, আই নো হোয়াট ইউ ডিড লাস্ট সামার’ (বিখ্যাত হরর সিনেমার নাম অনুকরণে!) লেখা ব্যানার নিয়ে মাঠে যেত। অপরদিকে, অসি মিডিয়াও কম যায় নি! একাধিক পত্রিকা পুরো সিরিজের সকল ম্যাচ রিপোর্টে ব্রডের নাম উহ্য রাখত। ওর নামের পরিবর্তে লেখা হত ’২৭ বছর বয়সী মিডিয়াম পেসার!’ দ্যা ব্রিসবেন কুরিয়ার মেইল পত্রিকা একধাপ এগিয়ে অদ্ভুত প্রতিবাদ জানিয়েছিল! তারা ব্রডের কোন ছবি ব্যবহার করত না, ছবির বাকি অংশ ঠিক থাকলেও ব্রডের জায়গাটুকু ভুতের মত সাদা থাকত!

অবশ্য, সিরিজের আগেই সকল প্রকার স্লেজিং মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে স্টুয়ার্ট ব্রড নিয়মিত মনোবিদের সাহায্য ও পরামর্শ নিয়েছিলেন। কিন্তু, এরকম অকল্পনীয় প্রতিবাদ বা আক্রমণ হয়ত খোদ মনোবিদও আঁচ করতে পারেন নি!

এ বছর অসিরা কী করবে কে জানে?

অবশ্য, অসিদের কুখ্যাত মাইন্ডগেম ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। ইংল্যান্ডের প্রথম ওয়ার্ম আপ ম্যাচ রিপোর্টের সময় স্থানীয় পত্রিকায় বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান এবং ইংলিশ ক্যাপ্টেন জো রুটকে ‘এভারেজ জো’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে! ওদিকে প্রতি সিরিজের আগে প্রতিপক্ষের হোয়াইট-ওয়াশ হওয়ার ভবিষ্যতবাণী করা গ্লেন ম্যাকগ্রা ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইন আপকে আখ্যায়িত করেছেন ‘ইতিহাসের অন্যতম দুর্বল!’

করনীয়

সাধারণত অ্যাশেজ সিরিজ সমাপ্ত হতে তিন মাস লেগে যায়। এতদিন ধরে দেশের বাইরে নিকট আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব ছাড়া থাকা, অল্প কিছু সংখ্যক মানুষের সাথে দীর্ঘদিন কাটানো সহজ ব্যাপার নয়। লম্বা সফরে শরীরের পাশাপাশি মনের উপরও ভীষণ চাপ পড়ে।

২০০৬-০৭ মৌসুমে হোয়াইট ওয়াশ হওয়া ইংলিশ দলের অধিনায়ক ছিলেন এন্ড্রু ফ্লিনটফ। “সফর শেষে ক্রিসমাসের ইভে আমি বাবার সাথে ড্রিংক করছিলাম। হঠাৎ করে আমি কান্নায় ভেঙে পড়লাম। বাবাকে বলেছিলাম-আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোন লাভ হয় নি। আমাকে দিয়ে ওসব আর হবে না!” ফ্লিনটফ এরপর আর কখনও ইংল্যান্ড দলের অধিনায়কত্ব করেন নি।

১৯৯৪-৯৫ সালের সফরে ইংলিশ দলের প্রায় অর্ধেক সদস্যই কোন না কোন সময়ে ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছিল। এমনকি একদিন ফিল্ডিং প্র্যাকটিসের সময় দলের ফিজিও-র হাতের আঙ্গুল ভেঙে যায়! ২০১৩-১৪ সালের নাজেহাল অবস্থা তো রূপকথার মত হয়ে গেছে। স্ট্রেসজনিত কারণে সফর শেষ না করেই জোনাথন ট্রট বাড়ি ফিরে যান। ব্রিসবেন টেস্টে ব্যাট করার সময় কুক ওর চোখে পানি দেখেছিল!

গ্রায়েম সোয়ান সিরিজের মাঝেই অবসরের ঘোষণা দেন। এটি ছিল কেভিন পিটারসেনেরও শেষ সিরিজ। এমনকি দলের ডিরেক্টর এন্ডি ফ্লাওয়ার সফর শেষে পদত্যাগ করেন।

তাহলে এমন দীর্ঘ, চ্যালেঞ্জিং সফরের ধকল সামলাবার জন্য করণীয় কী?

২০১০-১১ সালের অ্যাশেজ বিজয়ী ইংলিশ দল সফরের আগে জার্মানির জঙ্গলে বুট ক্যাম্প করেছিল। ৩ বছর পর একই পদ্ধতি তেমন কাজ না করলেও সেবার নাকি খেলোয়াড়গণ উপকার পেয়েছিলেন। বুটক্যাম্পের অভিজ্ঞতা খেলোয়াড়দের ভেতরে বন্ধন তৈরি করেছিল।

বুট ক্যাম্পের পাশাপাশি সিরিজ শুরুর আগে দলের খেলোয়াড়গণ তাদের স্ত্রী অথবা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে একসাথে ডিনার করেছিলেন। এন্ডি ফ্লাওয়ার এবং অধিনায়ক স্ট্রাউসও উপস্থিত ছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি দলের সবাই একসাথে থাকা এবং একে অপরের দিকে লক্ষ্য রাখা নিয়েও সেদিন নানা আলোচনা এবং পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

খেলোয়াড়দের বন্ধনের ব্যাপারটি মাঠেও প্রকাশ পেয়েছিল। জেমস এন্ডারসন স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, “স্টিভেন ফিন বল করছিল-সে সময় ওর বয়স ছিল মাত্র ২১। প্রতিবার বোলিং মার্কে যাবার সময় নন স্ট্রাইকে থাকা ব্র্যাড হ্যাডিন ওকে উত্যক্ত করছিল!”

“আমরা এসবের কিছুই জানতাম না। চা বিরতির সময় ফিন জানালো ‘আমি আর সহ্য করতে পারছি না!’ বিরতি শেষে আমরা ১১ জন দল বেঁধে হ্যাডিনকে পাকড়াও করে বলি, ‘বাচ্চা ছেলেটার পিছনে লেগেছো কেন?’ হ্যাডিন খুব অবাক হয়েছিল। শুধু তাই নয় এরপর আর কোন স্লেজিং করে নি!”

গ্রায়েম স্মিথ জানিয়েছেন, “দিন শেষে আমরা অনেকখানি সময় ধরে হাসি-ঠাট্টা এবং গল্প করে কাটাতাম। একসাথে সময় কাটাবার ফলে মানসিক অবসাদ অনেকখানিই কমে যেত।“

সোয়ানের মতে, “সবচেয়ে বেশি দরকার স্টিভ হার্মিসনের মত একজন বন্ধু! একবার ও নীল রঙের ওয়ানডে প্যাড নেয় নি যাতে ব্যাগে করে বেশি পরিমাণ ক্যান্ডি, চকলেট নিতে পারে!”

“যে কোন সফরে ওর রুম ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় স্থান। ওর রুমে ডার্ট বোর্ডও থাকত! প্রতিদিন ম্যাচের পর সে বরফ ভর্তি বাথটাবে শুয়ে পড়ত, সামনে থাকত কমপক্ষে ৫০ টি বিয়ারের ক্যান! ডার্ট খেলা, ক্যান্ডি, চকলেট…আর কী চাই!”

তো এই হল রহস্য! অস্ট্রেলিয়ায় অ্যাশেজ ট্যুর সফলভাবে শেষ করার জন্য আপনার চাই চকলেট-ক্যান্ডি-মিষ্টি, ডার্ট বোর্ড আর মোটা চামড়া! ব্যাস!

ব্যাপারটা সত্যিই যদি এত সহজ হত!!

(বিবিসি ডট কম অবলম্বনে)

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য