ছেলেমানুষের ভবিষ্যত

ছেলেমানুষেরা যে একগুঁয়ে, মাথামোটা আর অনমনীয়, ব্যাপারটার একটা ভালো উদাহরণ ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি।ফ্যাশন জগতে মেয়েদের কাপড় চোপড় নিয়ে যে পরিমান পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় তার দু ভাগও ছেলেদের পোষাক নিয়ে করা হয় কিনা সন্দেহ! কারনটা কি? এই সেক্টরে মেধবী মানুষজন নাই? নাকি বাজার চায়না? অথবা হয় ছেলেদের ফ্যাশনে আগ্রহ নাই, একটা হলেই হল নয়ত তাদের নতুনে আগ্রহ নেই, নতুন কিছু বের করলেও বাজারে বিকোয়না, এর বাইরে তো আর কোন কারন হতে পারেনা, তাইনা?
এখন ব্যাপারটা যদি এমন হত ছেলেদের কাপড়ের ব্যাপারে কোন আগ্রহ নাই, তারা ফ্যাশন সচেতন না; তাহলে এর একটা মানে দাড়াতো। কিন্তু বাস্তবতা তো সেরকম কিছু দেখিনা মোটেও। আমার আশেপাশের ছেলেরা সবাই বরং অতিরিক্ত সচেতন এই ব্যাপারে। আমার এক পরহেজগার বন্ধু আছে যে কাপড় চোপড় “সাদামাটা” রাখার ব্যাপারে ভয়ঙ্গকর কঠোর কেননা সেইটা তার ধর্মীয় নির্দেশ। অথচ সেই বন্ধুটারও একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের ( যেটা আবার দামীও অনেক) আফটার শেভ/ বডি স্প্রে ছাড়া একদমই চলেন। এই যুগেও সে ঘড়ি পড়ে কারনটা যতটানা সময় সচেতনতা তার চেয়ে বেশী ফ্যাশন সচেতনতা! হাতঘড়ি ব্যাপারটা অনেক ম্যানলি কিনা। ( আর এগুলার ব্যাপারে সরাসরি কোন উপর থেকে আসা নির্দেষ নেই, তাই নিশ্চিন্তে এই লুপহোল ব্যাবহার করে নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্যকে বিবর্ধিত করা যায় 😉 ) কিংবা আরেকজন আছে যে আসলেই পোষাক সম্পর্কে উদাসীন কিন্তু সেও দেখি ভালো কাপড় খুজে খুজে বের করে পড়ে তার জুতা ফেটিশের কারনে! তার ভালো জুতার শখ। ( এখানে ভালো বলতে টেকসই না, ভালো ব্র্যান্ড) কিন্তু একটা ভালো জুতার সাথে সাধারণ কাপড় তো মানায়না তাই সে স্যুটেড বুটেড হয়ে ঘোরে! ছেলেরা ফ্যাশন সচেতন না হলে এত এত “গেন্টস পার্লার” (জিনা ভাই, বানান ভুলটা ইচ্ছাকৃত) ব্যাবসা করে খেতে পারতোনা আর প্রতিনিয়ত তাদের নতুন নতুন আউটলেট খুলতে দেখা যেতনা।
তো বাকি থাকলো কি? ছেলেদের সমস্যা কি ফ্যাশনে? উহু, তাদের সমস্যা আসলে নতুন কিছুতে। একমাত্র অর্থহীন গ্যাজেট আর পুষ্টিহীন খাবার আর __ ছাড়া অন্য যেকোন কিছুতে নতুন কিছু ট্রাই করতে তাদের দারুন অনীহা! অথচ ছেলেদের বিপরীতে মেয়েদের পছন্দ বলেন, কি পরিমান ডাইভার্সিফাইড সেইটা আসলে বেশীরভাগ ছেলে অনুধাবন পর্যন্ত করতে চায়না!
কিছু স্বপ্রনোদিত বুদ্ধিমান আঁতেল আছেন যারা বলার চেষ্টা করেন যে এই যে মেয়েরা এত সাজুগুজু করে সেতো ছেলেদের জন্যেই! উহাদের জন্য আসলে মায়া/ সমবেদনা ছাড়া আর কিছু আসলে দেয়ার নাই। উনাদের মতন আমিও বহুদিন পর্যন্ত এই ইলিউশনে ছিলাম যে মেয়েরা বুঝি ছেলেদের দেখানোর জন্য সাজে। trust me brother, this is not at all the reason most of the time. মেয়েরা সাজে তাদের সাজতে ভাল্লাগে বলেই! আমরা বরং তাদের সাজাটা জাস্টিফাই করার আরেকটা বাহানা মাত্র, তাও অনেক দুরের বাহানা! একমাত্র বাধ্য হলেই তারা এই অস্ত্রটাকে ব্যাবহার করে।

তো আপনাদের যাদেরই বিবর্তন এবং টিকে থাকার যুদ্ধ ব্যাপারগুলার সাথে পরিচয় আছে (even normal common sens will do) তারা নিশ্চই জানেন টিকে থাকার যুদ্ধে সবচেয়ে বড় টুল হল নমনীয়তা। আপনি যত দ্রুত আর যত ইফেক্টিভলি পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিবেন তত আপনার টিকে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এই নিয়ম একটা তুচ্ছ ব্যাক্টেরিয়া থেকে শুরু করে আপনার ক্ষেত্রেও ঠিক একইভাবে প্রযোজ্য। আপনি যেই যুগে বসে থেকে অবিকল থাকাই স্বার্থকতা জপে এসেছেন সেই যুগ শেষ হয়ে এসেছে। আপনারা যাকে সভ্যতা/ উন্নয়ন প্রগতি যেই নামেই ডাকেননা কেন, সেটা আসলে কি করছে? উন্নয়ন আসলে আপনার চারপাশের পরিবেশের পরিবর্তনের হারটাকে তরান্বিত করে দিয়েছে, এখনো দিচ্ছে। বেশীনা আপনি জাস্ট শেষ একশ বছরের ইতিহাসের দিকে যদি চোখ বুলান তাহলে দেখতে পাবেন কি দ্রুত আমাদের চারপাশ পরিবর্তিত হচ্ছে! একশ বছর আগেও কেউ যদি মোবাইলে ভিডিও কল করতে পারতো তবে সেই সময়ের মানুষ তাকে ইশ্বর বলে পূজা করত, আর আজ? মাত্র একশ বছরে আমরা এতদুর চলে এসেছি! এবং এই পরিবর্তন যত দিন যাচ্ছে তত আরো ত্বরান্বিত হচ্ছে। আপনাকে টিকে থাকতে হলে হয় এর সাথে মানিয়ে নিতে হবে নতুবা ঝড়ে পড়ে যেতে হবে, কিচ্ছু করার নাই। এইটা দুনিয়ার বেসিক নিয়ম।
এবার আবার একটু নারী পুরুষের প্রসঙ্গে আসা যাক। আমাদের এই অঞ্চলে একশ বছর আগে কিছু পেশার নাম বলুন তো যেগুলাতে মালিকানা ছাড়া আর কোনভাবে মেয়েদের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক অংশ ছিলো? কষ্ট হলে আমি ধরিয়ে দিচ্ছিঃ ইহা যৌনতার সাথে সম্পর্কিত। একমাত্র শরীর বেচা ছাড়া ( সেটা ঘন্টা হিসেবেই হোক বা পরিবারের মধ্যে স্ত্রীর ভূমিকায় হোক) আর কোন কাজের বিনিময়ে তাদের অর্থনীতিতে অংশ নেবার কোন সুযোগ ছিলোনা। কিন্তু দিন বলচ্ছে। এখন যেকোন সেক্টরে মেয়েদের অংশগ্রহন পুরো কাঁপিয়ে দেবার মতন। এবং এই যে তারা বাইরে এসেছে, কাজ করছে তাদের কিন্তু ছেলেদের সাথে প্রতিযোগীতা করে জোর করেই জায়গা করে নিতে হয়েছে, হচ্ছে। এম্নে এম্নে এক চুল জাগাও কেউ ছাড় দেয়নাই, এখনো দেয়না। এই যে মার্কেটের একটা বিশাল জায়গা আজকে মেয়েদের দখলে, এই পরিবর্তনটা হতে কতটুকু সময় লেগেছে? মাত্র পঞ্চাশ বছর বড়জোর?? তো অংকে মাথা ভালো বলে তো ছেলেদের বরাবরই সুনাম, এখন একটু কষ্ট করে হিসাব করে ফেলেন তো মার্কেটের বাকি জায়গা দখল করে সমতা আনতে মেয়েদের আর কত সময় লাগতে পারে?? আপনাদের হাজার হাজার বছরের গায়ের জোরে টিকে থাকার নিশ্চিত সাম্রাজ্য মাত্র পঞ্চাশ বছরেই দখল হতে শুরু করল যে অলরেডি আপনাদের মালিকানা বিপদের মুখে? আপনারা না অনেক সুপিরিয়র? এই তার নমুনা? এইভাবেই চলতে থাকবে? আপনারা ধাপ করে সব জায়গা কিছু অথর্ব দুর্বল মাথামোটা ছিচকাদুনে মেয়েদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বগল বাজাবেন? নাকি আইসিসের মতন জিহাদ করে নিজেদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন? নাকি এভাবেই নিজেদের সম্রাজ্য একটু একটু করে নিচু জাতের হাতে দখল হয়ে যেতে দিবেন? আপনি কি বুঝতে পারেন আপনি নারীবাদী হোন বা না হোন, মেয়েদের ক্ষমতায়ন আপনি চান বা না চান তাতে কিছু যায় আসেনা, ভবিষ্যত পৃথিবীটা যে আসলে তাদেরই!?!
এই অবস্থায় আপনার ভুমিকা কি হবে তাহলে? ভাবেন। উত্তরটা খুব কঠিন কিছু না, একটু দিল খুলে চারপাশে নজর দিয়ে ভাবেন, উত্তর পায়ে যাবেন। কিন্তু সেটার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে আপনি প্রস্তুত কিনা সেইটা হল প্রশ্ন।

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

ফেসবুক মন্তব্য