কুয়াশার-চাদরে আবৃত কান্না

রাত আনুমানিক ২টা বাজে। বাস থেকে নেমে প্রায় ১ কিঃমিঃ যাওয়ার পর আমার বাড়ী। এত রাতে পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। মেইন রাস্তা থেকে কিছুটা পথ হেটে আমার বাড়ীর যাওয়ার রাস্তায় পা দিতেই কিছু সময়ের জন্য একটু থমকে গেলাম। কুয়াশার চাদরের আবরণ এতই যে এক হাত দূরের কোন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অনেক অনেক দিন পর আজকে এই রকম কুয়াশা দেখলাম। যাকে বলে “কুয়াশার-চাদর”। সাধারণত এই রকম কুয়াশা সিলেট অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। সিলেটের ভাষায় কুয়াশাকে “কুয়া” বলে। অনেকের কাছে শুনেছি রংপুর বা দিনাজপুরের দিকে এই রকম ঘন “কুয়াশার-চাদর” পড়ে কিন্তু আমার দেখার সৌভাগ্য হয় নাই। সিলেট এলাকাতে কিছু সময় থাকার দরুন বাস্তবে দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল এই রকম ঘন “কুয়াশার-চাদর”।

রাস্তার দুই ধারে ল্যাম্প পোস্টের আলো ছাড়াও আছে গার্ডেন লাইটের আলো। প্রতিনিয়ত এই রাস্তায় আমার চলাফেরা তাই রাস্তার অবস্থা মানে কোথাও কোন ভাঙ্গা, ইট, পাথর, বা অন্য কোন প্রতিবন্ধকতা এমন কি গাড়ি চলাচলের ও অন্যান্য বিষয়ে খুবই পরিষ্কার ধারনা আছে। কুয়াশার মুড়ানো এই রাস্তাতে আমার চলার গতি অন্য দিনের থেকে মন্থর। ঘন কুয়াশার সাথে ঠাণ্ডাটাও বেশ জোড়ালো। কান আর হাতের অঙ্গুলি খোলা থাকাতে এই ঠাণ্ডার প্রভাবটা বেশ উপলব্ধি করছি। সেই সাথে কুয়াশা আমার খোলা মুখ পেয়ে তার আলতো স্পর্শে ভিজিয়ে দিচ্ছে।
কুয়াশার পুরুত্ব এতই যে এই সকল উজ্জ্বল আলো আজ বড় বেশি নিষ্প্রভ। আমি একা এই নির্জন রাস্তায় হাঁটছি। কোন পথচারী খুব কাছে এলে তখনই তাকে দেখা যাচ্ছে। মাটি আর রাস্তা থেকে কেমন যেন একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে। হঠাৎ হঠাৎ নাকে এসে লাগে হাসনাহেনার তীব্র সুগন্ধ। এই কুয়াশার মধ্যেও আমার একাকীত্বের সুযোগে কতিপয় শেয়ালের চোখ জ্বল জ্বল করে তাকিয়ে থাকে। কিছু সময় আমার পিছন পিছন তারা সঙ্গী হয়ে আবার হারিয়ে যাই কুয়াশা-চাদরের মাঝে। অন্য সময় অনেক দূর থেকে বাড়ীর সামনের আলো দেখে তেমন দূরত্ব মনে হত না। কিন্তু এই ঘন কুয়াশায় ঢাকা সেই আলো কেমন যেন নিভো নিভো,কাছের পথ আজ মনে হয় অনেক দূরে।

আমার সব সময়ের সঙ্গী তারহীন হেড ফোন আর তাতে শুনতে থাকা প্রিয় কিছু পূরানো গান। এমনিতেই আজকে সারাদিন মনটা ছিল বিক্ষিপ্ত। সেই সাথে এই শিশির ভেজা রাতে, ঘন কুয়াশার স্পর্শে এলোমেলো চিন্তায় কেমন যেন বুকের মাঝে চাপা,হাহাকার,খালি খালি একটা বোধের অনুভূতি। মনের ভিতর জমে থাকা কষ্টকে যেন শুনতে থাকা এই গান ত্বরান্বিত করলো চোখের নোনা জলে। অন্য সময় হলে এই ঝলমলে ল্যাম্প পোস্ট, গার্ডেন লাইটের আলোতে যে কোন পথচারী দেখতে পেত আমার এই নীরব কান্না। কিন্তু আজকে চারিদিকে আবৃত করা ঘন কুয়াশার ফলে খুব কাছে এলেও দেখতে পারবে না এই দু চোখ ঝরা নোনা জল। আর কোন ভাবেই যদি কেউ দেখে ভাববে ঘন কুয়াশার আলতো স্পর্শে মুখে জমেছে শিশির ভেজা এই পানি। বৃষ্টিতে ভিজে বৃষ্টির পানি আর চোখের নোনা জল যেমন একাকার হয়ে যাই। আশে পাশে কেউই তা বুঝতে পারে না। ঠিক তেমনি তীব্র, ঘন কুয়াশার চাদর আজকে বৃষ্টির পানির মত চোখের নোনা জলকে লোক চক্ষুর আড়াল হতে আমাকে করে আবৃত, বুকের মাঝে চেপে থাকা সব কষ্টকে করে ক্ষণিকের মুক্তি…… হোক না তা ক্ষণিকের…. তাতে কি?

যেহেতু মানুষ হিসাবে জন্ম তাই আমৃত্যু চলবে এই সম্পর্কের সাপ-লুডু খেলার বন্ধুত্ব।

এ যেন দক্ষিণা হাওয়াতে শিমুলের বিসর্জিত পেঁজা তুলার মত উড়তে থাকা উত্তরের হাওয়ার মাঝে আমি আর আমার আমিত্ব……

৬৩৫ বার দেখা হয়েছে

২০ টি মন্তব্য : “কুয়াশার-চাদরে আবৃত কান্না”

  1. এটা বোধহয়, লেখকের একার অনুভুতি নয়, মনে হচ্ছে যেন, কোথায় আমার সাথে, মানে সব পাঠকের সাথে মিলে যাওয়া এক আলেখ্য। বাহ, দারুন! এ এক সার্বজনীন অনুভূতি তুল্য যে কাউকে ছুঁয়ে যাওয়া অদম্য বোবাকান্নার স্পর্শ! অনেক ভালো লাগলো নিপুন হাতে নির্মিত এক সাদাকালো ছায়াছবির বিনির্মাণ! বেঁচে থাকুক অনুভূতি, বেঁচে থাকুক নিপুন লিখনি!

    জবাব দিন
  2. রাজীব (১৯৯০-১৯৯৬)

    বড়ো ভালো লাগলো পড়ে।
    সেই সাথে লেখাটি মনে করিয়ে দিলো, "মানুষ হিসাবে যূথবদ্ধ হয়ে বাস করলেও আমরা প্রত্যেকে একা; আলাদা আলাদা ভূখন্ড, দ্বীপ।"


    এখনো বিষের পেয়ালা ঠোঁটের সামনে তুলে ধরা হয় নি, তুমি কথা বলো। (১২০) - হুমায়ুন আজাদ

    জবাব দিন
  3. আল-মামুন (১৯৮৫-১৯৯১)

    বন্ধু, খুব ভাল লাগল পড়তে। সুক্ষ অনুভূতিগুলো সাবলীল ভাবে প্রকাশ করা - খুব সহজ নয়। কিন্তু তোর লেখা পড়ে মনে হল তোর জন্য অতি সহজ। বেশ লাগল.... পরবর্তীর অপেক্ষায়

    জবাব দিন
  4. কখনো কখনো জীবনের কোনো একটি ক্ষুদ্র সময়ের অনুভূতিও গভীর রেখা ফেলতে পারে স্মৃতির দেয়ালে। হয়তো সেরকম কোনো অনুভূতিই উঠে এসেছে সুপাঠ্য এ লেখায়। অবশ্য সেই অনুভূতির নেপথ্যের ক্লু দিলে লেখার গভীরতা আরেকটু বেড়ে যেত। নিজের অনুভূতি পাঠকের মাঝে ছড়িয়ে দেয়াটাও দারুণ ব্যাপার। লেখার ভেতরে শিরোনাম ব্যবহৃত হয়েছে বেশ কয়েকবার।আরেকট কম ব্যবহার হলে আরো ভালো হতো। তবে লেখার মান ভালো, চালিয়ে যেতে হবে।

    জবাব দিন
    • মোকাররম আহমেদ (৮৫-৯১)

      জাহিদ বকশী, মনে করেছিলাম আপনার এত ব্যস্ততার মাঝে পড়ার সুযোগ হবে না। তবুও পড়েছেন ও সঠিক মন্তব্য দিয়েছেন। "শিরোনাম ব্যবহৃত হয়েছে বেশ কয়েকবার" ব্যপারটি ধরিয়ে দেয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। নয়া লেখক যা আমাকে পরবর্তী কোন লেখাকে এই সকল ভুলগুলো শুধরিয়ে নিতে সাহায্য করবে। আবারও অসংখ্য ধন্যবাদ সাজেশন ও মন্তব্য করার জন্য। অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল।

      জবাব দিন
    • মোকাররম আহমেদ (৮৫-৯১)

      বড় ভাই,
      আচ্ছালামুয়ালাইকুম, আপনার মন্তব্য পড়ে মজা পেলাম ও ভালো লাগলো। আমি কালে ভদ্রে লিখি। তবে আমার কিছু লেখা ব্লগে পোস্ট করা আছে। কষ্ট করে ও সময় নষ্ট করে পড়লে খুশি হবো। সেই সাথে আপনার সাজেশন/মন্তব্য পেলে উৎসাহ পাব। অনেক শুভেচ্ছা রইল।

      জবাব দিন
  5. মোকাররম আহমেদ (৮৫-৯১)

    নুপুর ভাই
    আমার পুর্বের লেখাতে ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দিয়েছেন যার জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।
    এই লেখাতে এ রকম একটা মন্তব্য পাওয়াতে আমি খুবই আনন্দিত। অনেক শুভেচ্ছা রইল।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য