হুমায়ুন আহমেদ মানুষ হিসেবে কেমন ছিলো সেটা নির্ণয় করার আমি কেউ না । অথবা অন্যভাবে বলতে গেলে এই মুহূর্তে আমি তাকে নিয়ে ভাবার প্রয়োজন বোধ করছি না । তবে গত ৫ দিনে যা ঘটলো সেটা থেকে মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় তিনি একজন শক্তিধারী লেখক ছিলেন – হতে পারে সেটা সস্তা সাহিত্য, হতে পারে সেটা শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের কথাসাহিত্যের রূপকার হিসেবে । কিন্তু সেটাও মাথা ঘামানোর মত তেমন কিছু না ।
হুমায়ুন মারা গেলেন । দাফন নিয়ে নাটক হলো । নাটকের ভিন্নমুখী পরিবেশনা নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রতিযোগিতা করলো । ফেইসবুকে শাওন ও মাজহার সাহেবের সম্পর্ক নিয়ে গুজব চলছে । টিভিতে টকশো চলছে, কিছুদিন পরে ডকুমেন্টারি ভিডিও চলবে । এবং কয়েক বছরের মধ্যে হুমায়ুন ইন্সটিটিউট গড়ে উঠবে । চমৎকার ছকে বাঁধা পান্ডুলিপি ।
কিন্তু এইসব কিছুর মাঝে কি অদ্ভুত ব্যাপারটা ঘটে গেল । কি চমৎকার তার শক্তির । কি মাধুর্য তার ভালোবাসার । (আমি হুমায়ুন আহমেদের কথা বলছি না)
আমি হুমায়ুন সাহেবের বই পড়িনি খুব একটা এবং তার সম্পর্কে জানিওনা বেশি কিছু । তার পরেও যেহেতু মৃত্যু যেকোন মানুষের জন্যই বিষাদময় তাই তার মৃত্যুতেও আমি ব্যাথিত । তবে তার মঙ্গল কামনা করেই আমি তাকে ধন্যবাদ দিতে চাই । ধন্যবাদ দিতে চাই তার মৃত্যুবরণকে । কারণ মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে তিনি বাঙলার এতোগুলো মানুষকে একসাথে ভালোবাসার স্রোতে ভাসিয়ে যেভাবে এক সুতোয় বেঁধে গেলেন তাতে অবশ্যই তিনি ধন্যবাদ পাবেন । কারণ শেষ কবে বাঙলার এতোগুলো মানুষ একসাথে একই অনুভূতিতে রাস্তায় নেমে এসেছে ? তাও আবার এই নতুন প্রজন্ম যাদের অধিকাংশই কিনা ১৯৯০ এর পরে জন্ম নিয়েছে ? আযাদ সাহেবের মৃত্যুতে ? না । ইউনুস সাহেবের নোবেল প্রাপ্তিতে ? না । অনেকেই হয়তো বলবেন যে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি কিংবা পহেলা বৈশাখের কথা । কিন্তু ডিএসএলআর দিয়ে ছবি তুলে ফেইসবুকে আপলোড দেয়ার জন্য রাস্তায় নামা আর একজন লেখককে শেষবারের মত দেখার জন্য কাঠফাটা রোদ অথবা বৃষ্টি মাথায় কদম ফুল হাতে নিয়ে সারি বেঁধে শহীদ মিনারে জমায়েত হওয়ার মাঝে যে বিস্তর ফারাক তা কিন্তু আমরা সবাই স্বীকার করি । হুমায়ুন আজ দেখিয়ে গেলেন যে বাঙলার মানুষ অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়েনি । আর একারণেই জনাব হুমায়ুন আহমেদ এবং তার মৃত্যুকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই ।
দেশের আমজনতা অর্থাৎ আমরা কিন্তু মোটামুটি ধরেই নিচ্ছিলাম যে এই দেশকে দিয়ে আর কিচ্ছু হবে না । আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আর জাফর ইকবাল সহ হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া তরুণ সমাজের ওপরে অধিকাংশ মানুষই আশার বীজ কখনোই বপন করতে পারেনি এবং আগামী দুই দশকেও পারতো না । আবুল , মুহিত, হাসিনা, খালেদার ভিড়ে কখনোই আর তাজউদ্দীন, রফিক, জব্বার, নূর হোসেন জন্ম নিত না । কিন্তু ঠিক সেই মুহুর্তে কি চমৎকার । আগেই বলেছি – না হুমায়ুন, না তার মৃত্যু, কোনটাই আমার ভাবার বিষয় না । কারণ তিনি আমার আত্মীয়ও না, প্রিয় লেখকও না । আমার ভাবার বিষয়, আরও স্পষ্ট করে বললে আমার চরম আনন্দের বিষয় হচ্ছে বাঙলার মাঝে ভালোবাসা বিলীন হয়ে যায়নি । কারণ এইতো গত পরশু দিনই তো হুমায়ুনের জন্য তার এক পঞ্চাশোর্ধ ভক্ত কেঁদে উঠলো শিশুর মতো যিনি কিনা আজীবন তার বই পড়েছেন কিন্তু কখনোই তাকে সামনে থেকে দেখেননি । কারণ বাঙলার মায়েরা এখনো অশ্রুবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত আজো তারা টলমল করে । (মা-দেরকে নিয়ে এই লাইনটা প্রিয় কবি হুমায়ুন আযাদের ‘আমাদের মা’ থেকে নেয়া) । সুদূর আমেরিকায় হুমায়ূনের জন্য এতগুলো বাঙালির একসাথে জমায়েত হওয়া, এগুলোই কি প্রমাণ করে না যে মায়ের জন্য যদি ভালোবাসা বেঁচে থাকে, প্রিয় লেখকের জন্য যদি অন্তরের কান্না বেরিয়ে আসে তাহলে এই দেশের জন্যও ভালোবাসা অটুট আছে, শুধু অগ্নুৎপাতের অপেক্ষায় আছে জাতি ।
আমি তাই স্বপ্নে বিভোর, আনন্দে মশগুল । হুমায়ুনের জন্য লাখ লাখ বাঙালি রাস্তায় নেমে এসেছে, দেশের প্রয়োজনে লাখের সংখ্যা কোটিতে গিয়ে পৌঁছাবে । হুমায়ুনের জন্য মানুষ কাঁদছে, হাসিনা খালেদার অনিয়মের বিরুদ্ধের মানুষ শীঘ্রই সংগ্রামে নামবে । একটা উপলক্ষ দাও, একটা এক হওয়ার মঞ্চ দাও । বাঙলার মানুষ আবার জেগে উঠবে ।
পরিশেষে আবারও ধন্যবাদ দিতে চাই হুমায়ুন আহমেদকে । ভালো থাকবেন । দেশের জন্য দোয়া করবেন ।




৯ টি মন্তব্য
লেখকের আশাবাদের সাথে একাত্মতা পোষণ করতে পারলে ভালো লাগতো, কিন্তু বাস্তবতার বিচারে সেটা করতে পারছি না। কারণ হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে যা হয়েছে এবং হচ্ছে সেটা আমার মতে স্রেফ হুজুগে বাঙালীর ক্ষণস্থায়ী প্রক্ষোভ। হুমায়ুন আহমেদকে যতটা সম্মান জানানো হলো তার সিকিভাগও হুমায়ূন আজাদ বা তারেক মাসুদ পাননি। এই দেশ ও দেশের মানুষের এই আচানক হম্বিতম্বি আমাকে আশাবাদী তো করেই না বরং আরো হতাশ করে দেয়।
[ জবাব দিন ]
media er jonnoi ata hoyese.
[ জবাব দিন ]
আমিও সৌমিত্রের সাথে অনেকখানি একমত, পুরো বিষয়টার অনেকখানি জুড়েই ছিল হুজুগ। মিডিয়াও এটাকে ব্যবহার করেছে, করছে নিজের স্বার্থে। আর শোক প্রকাশ করতে গিয়েও দাফন বিতর্কে ঠিকই দু তিন দলে বিভক্ত হয়েছে মানুষ, যা নিয়ে এখনো জাল ঘোলা করা হচ্ছে।
দেশের প্রতি ভালবাসায় সিক্ত হয়ে বাংলার মানুষ সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, এরকম স্বপ্ন আমি ঠিক দেখতে পারি না, কারন আমরা অধিকাংশই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে এই সব অনিয়ম থেকে সুবিধা লাভ করছি, আর এসকল সুবিধাগুলোতে যখনই টান পড়বে তখন আমরা অনিয়মকারীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাব। একজন হুমায়ূনকে শ্রদ্ধা জানাতে বা ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোন বিজয় উদযাপনে আমাদের নিজেদের স্বার্থের কোন ক্ষতি হয় না, আমাদের সম্মিলিত আনন্দ বা বেদনা প্রকাশেও কোন সমস্যা হয় না।
[ জবাব দিন ]
ধন্যবাদ
[ জবাব দিন ]
বিশ্বাস করো, এটাই একমাত্র মাথা ঘামানোর বিষয় হতে পারে। লেখক হুমায়ূন আহমেদের মূল্যায়নই কেবল জরুরি হতে পারে।
[ জবাব দিন ]
সামগ্রিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে আমরা কি খুব একটা জেগে উঠি? বরং সাময়িক আবেগ তাড়িত হয়ে মাঝে মাঝে রোদবৃষ্টিতে গা ভেজাই।
বহু বিভক্ত এই সমাজে ‘এক হওয়ার মঞ্চ’ তো আধুনিক ‘ঠাকুর মা’র ঝুলি’ তেও কল্পনা করা যায় না।
কিন্ত তবুও আমি চাই স্বপ্ন বেঁচে থাক।এরকম নির্ভেজাল স্বপ্ন গুলোই এক সময় সত্যি হয়। তোমার দৃষ্টি ভঙ্গি ভালো লেগেছে
।
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
শাওন আপুর সাথে নাকি মাজহার কাকার পরকীয়া ছিল…হুমায়ূন আহমেদকে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে খুন করার আভাস আছে…এতদিন মানুষ্রে লয়া হু আ গল্প লিখতো…এখন কাকারে লয়াই মানুষ লিখতেসে…আমরাও মজা পাচ্ছি…দেখা যাক আর কি কি নাযিল হয়!
[ জবাব দিন ]
btw,এক হয়ে উঠুক…সহমত লেখক। (সম্পাদিত)
[ জবাব দিন ]