random header image

১৫ নম্বর কেবিনের যাত্রী : স্টেশন- মুর্তজা বশীর গল্পসংগ্রহ

অনেকদিন পর লিখতে বসে টের পাচ্ছি, লেখালেখি ব্যাপারটা আসলে অলসদের জন্য বেজায় অসুবিধার। দুচারটে লাইন সাজিয়ে ফেসবুকে “কি, কেমন দেখলে !” টাইপ স্ট্যাটাস দেয়া এক কথা, আর সুস্থির হয়ে বসে একটা- দুটো ভাবনাকে মনমতো হরফবন্দী করাটা আরেক কথা- মেলা ভাবতে হয়! তবু, পানিতে নামতে হলে ঝাঁপটা তো একসময় দিতেই হবে, তাই বসে গেলাম লেখার হাতটা খানিক মকশো করে নিতে ।

কদিন ধরে একটা বই পড়লাম- মুর্তজা বশীর গল্পসমগ্র। মুর্তজা বশীর সম্পর্কে আমার জানাশোনাটা ছিলো এরকম ( কেউ ক্ষেপে যাবেননা প্লিজ! )- ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ছেলে, অনেক বড় চিত্রশিল্পী, মাঝে মাঝে টুকটাক লেখালেখি করেন আরকি। ঘুরতে ঘুরতেই সেদিন পাবলিক লাইব্রেরি গিয়ে কিনে আনলাম বইটা… আর ধারণাটা একশো আশি ডিগ্রী ঘোরা শুরু হলো। মন পড়তে পারার কি অদ্ভুত ক্ষমতা এই ভদ্রলোকের! যদিও ক্ষীণ সন্দেহ হচ্ছে যে অনেকদিন পরে ছোটগল্প পড়তে বসার কারণেই এতখানি ভালোলাগা কাজ করছে কিনা। তবে উনার লেখার প্যাটার্নটা যে চমৎকার সন্দেহ নেই। কঠিন কঠিন শব্দ না লাগিয়ে একদম সাদামাটাভাবে বলে যেতে পারাটা দারুণ একটা আর্ট। এমন না যে সাদামাটা মানে শুধু দৌড়ে দৌড়ে কাহিনীর বর্ণনা, ঘটনা-সংলাপ-সমাপ্তি। যেখানে যতটুকু আবেগ দরকার, দার্শনিকভাব দরকার, ততটুকু কিন্তু ঠিকই আছে! ইউনিক একটা লেখার স্টাইল, মেদহীন।

“কাচের পাখির গান” গল্পটা দিয়ে বইটার শুরু। উনার প্রথম গল্পগ্রন্থের নামও কাচের পাখির গান। পুরো বইয়ে সম্ভবত সেরা গল্প এটাই- পড়তে পড়তে মন ভিজে গেলো। মুর্তজা বশীরের লেখা গল্পগুলোর একটার সাথে আরেকটার চরিত্রে কিন্তু মিল আছে। গল্পগুলোর প্লটে খুব যে বৈচিত্র্য, খুব যে এক কাহিনী ঢাকার ওয়ারীতে, আরেকটা খুলনার কোন গন্ডগ্রামে- এমনও না। কাহিনীগুলো গড়ে উঠেছে সত্তরের দশকের ঢাকার মধ্যবিত্ত জীবন নিয়ে। কেন্দ্রীয় চরিত্রে কখনো হতাশাগ্রস্থ চাকরীজীবী, বিবাহিত প্রৌঢ়, নিঃসঙ্গ চিত্রশিল্পী, ড্রপ-আউট ছাত্র। পঁচিশ থেকে চল্লিশ বছরের মাঝের জীবনের সাইকোলজিতে লেখকের আগ্রহটা ধরতে পারা যায়।

কথা হচ্ছে, মুর্তজা বশীরের প্লটে বৈচিত্র্য কম, চরিত্রে বৈচিত্র্য কম, তাহলে কোন জিনিসটা তাকে এত অসাধারণ করে তুললো যে আমার মত অলস-অকর্মা এত এত লেখক বাদ দিয়ে উনার বই নিয়ে লিখতে বসে গেলো? আগেই দিয়েছি উত্তরটা। মানুষের মন বুঝতে পারার দুর্লভ ক্ষমতাটা উনার আছে- কয়েকটা গল্প পড়ার সময় চমকে চমকে উঠেছি, আরে- আমি কি ভাবছি তা কি চল্লিশ বছর আগেই ভেবে রেখে গেছে নাকি ? গল্পের চরিত্রগুলো খুব ব্যালান্সড। গল্প লিখতে গেলে মানুষগুলো যে একদম বাস্তবের মত হতে হবে এমন কোন কথা নেই- তাহলে কিন্তু আপনি পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন-কারণ বাস্তব চরিত্রগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রেডিক্টেবল, আর কেউই আমরা প্রেডিক্টিবিলিটি পছন্দ করিনা। আবার এত লাগামছাড়া আনপ্রেডিক্টেবল চরিত্র ফাঁদাও ঠিক না যে গাঁজাখুরি বলে মনে হয়- হুমায়ুন আহমেদ পড়তে গেলে যেমনটা মনে হয় মাঝেমধ্যে। এই ভারসাম্যটা চমৎকারভাবে রেখেছেন মুর্তজা বশীর।

একটা জিনিস ভেবে খুব মজা লাগলো যে এখনকার এই ইন্টারনেট যুগে আমরা যে ধরনের ডিপ্রেশানে ভুগি, যে হতাশায় ঘুরপাক খাই, চল্লিশ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরাও প্রায় একই ধরণের দুঃখবোধে আক্রান্ত হতেন- দিন দিন পাল্টাচ্ছে প্রতিক্রিয়াটা (নিঃসন্দেহে আমি ফেসবুকে “life is a mess” টাইপ স্ট্যাটাসের কথা বলছিনা, পাঠক একটু ভেবে বের করুন। )

বইটা পড়তে গিয়ে মুর্তজা বশীর সম্পর্কে কিছু কিংবদন্তীর প্রশংসাটাও চোখে পড়লো- মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান। তবে ইন্টারেস্টিং লেগেছে জহির রায়হানের লেখা কাচের পাখির গান বইয়ের ভূমিকাটা। শেষটা হয়েছে এভাবে-

“মুর্তজা বশীর একজন নিঃসঙ্গ মানুষ।
নিঃসঙ্গ চিত্রকর।
নিঃসঙ্গ লেখক।
তাঁর জীবনের এই নিঃসঙ্গতার অন্ধকারের মধ্যে থেকেও তিনি চান হীরের মতো উজ্জ্বল দ্যুতি।
তিনি মানুষকে ঘৃণা করেন।
ঘৃণা করেন বলেই হয়তো তাদেরকে গভীরভাবে ভালবাসতেও জানেন।আর এটাই হচ্ছে মুর্তজা বশীরের রচনার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।”

“একটি বেওয়ারিশ ডায়েরির কয়েকটি পাতা” গল্পটার জন্যে এই মহান ভাষাসৈনিককে আমাদের প্রজন্মের পক্ষ থেকে অভিবাদন।

চেয়ে পাওয়া যায়না এ জিনিসটা, নাহলে হয়তো চাইতাম- যদি গল্প লেখার সুযোগ হয় কখনো, মাথায় যাতে খানিকটা “মুর্তজা বশীর সিনড্রোম” থাকে।

শেষে বলে নেই, এটা কিন্তু কোন সমালোচনা আর্টিকেল না- মানুষকে বইটা নিয়ে আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা আরকি (জীবনে বেশি ভাল কাজ করি নাই, এইবেলা যদি কিছু করা হয়!) মতলবটা আসলে মাথার ভেতরের আড়ষ্টতাটা কাটানো। অনেক বিদগ্ধ পাঠক আছেন ব্লগ দুনিয়ায়, আমার ভুলগুলো ঠিক করে দিয়ে গেলে খুব খুশি হবো।

পরের স্টেশনে দেখা হবে !

৩ votes, average: ৪.০০ out of ৫৩ votes, average: ৪.০০ out of ৫৩ votes, average: ৪.০০ out of ৫৩ votes, average: ৪.০০ out of ৫৩ votes, average: ৪.০০ out of ৫ (ভোট, ৪.০০/ ৫)
রেটিং করার জন্য আপনাকে রেজিস্টার্ড সদস্য হতে হবে
Loading ... Loading ...
প্রকাশিত লেখা বা মন্তব্য সম্পূর্ণভাবেই লেখক/মন্তব্যকারীর নিজস্ব অভিমত। এর জন্য ক্যাডেট কলেজ ব্লগ কর্তৃপক্ষকে কোনভাবেই দায়ী করা চলবেনা।

৪ টি মন্তব্য

  1. নাছিম জামান লিমন
       এপ্রিল ১৭, ২০১২ at ১১:৩২ অপরাহ্ন |

  2. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)
       এপ্রিল ১৮, ২০১২ at ১:৪৯ পুর্বাহ্ন |

    এই লেখাটা যেন এক পশলা বৃষ্টিমাখা খোলা হাওয়া,
    একটানে সতেজ করে দিলো আমায়।

    মুর্তজা বশীর যে গল্প লেখেন তা-ই জানতামনা।
    গল্পগ্রন্থ নিয়ে নির্মেদ আলোচনাটুকু পুরোপুরি উপভোগ করলাম।

    জবাব দিন

  3. রকিব (০১-০৭)
       এপ্রিল ২১, ২০১২ at ১:২৭ পুর্বাহ্ন |

    মুর্তজা বশীর সাহেব যে গল্পও লেখেন জানা ছিল না।
    দারুণ লিখেছো তোমার পাঠ-প্রতিক্রিয়া। চালিয়ে যাও।

    জবাব দিন

  4. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)
       এপ্রিল ২৫, ২০১২ at ৫:৩৭ অপরাহ্ন |

    ধন্যবাদ পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। নিশ্চিত সুযোগ বলে উনার কিছু পড়ে দেখব।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন :

আপনার ই-মেইল ঠিকানা কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা শেয়ার করা হবেনা। দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা। আবশ্যিক তথ্যগুলো * চিহ্নিত করা আছে।

*
*
:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »


(বাংলায় টাইপ করতে ctrl+g চাপুন। একটি শব্দ লেখা শেষে স্পেস বার চাপুন। তাহলেই ইংরেজী থেকে শব্দটি বাংলায় রুপান্তরিত হবে।একই শব্দের একাধিক বানান অপশন দেখতে শব্দটির উপরে মাউস রেখে ক্লিক করুন)
Ekushey Inline virtual Bangla keyboard