random header image

প্ল্যানচেট

আধি ভৌতিক ব্যাপারে হিল্টুর দারুন বিশ্বাস। জনাথন রিচার্ড হিলটন, ওরফে হিল্টু কলকাতার অ্যাংলো। ওর দাদার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ আর্মির বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর। বংশ পরম্পরায় তার চেহারা ও সাস্থ্যকে ধারন করে আছে হিল্টু। ওর দাদা প্রথম বাঙালী বিয়ে করেন, যেটা ছিল বিধবা বিবাহ। দেখতে অবশ্য ও পুরোই বৃটিশ। ঝারা ছয় ফুট দেড় ইঞ্চি, সে রকমই সাস্থ্য, নীল বর্ণ চোখ আর লালচে সাদা চুল। ওকে দেখলেই শীর্শেন্দূ মুখোপাধ্যায়ের “পাগলা সাহেবের কবর” উপন্যাসের পাগলা সাহেবের কথা মনে পড়ে। আমার চেয়ে বয়সে ৫ বা ৬ বছরে বড় হবে, তবে ওকে নাম ধরেই ডাকি। হিল্টুর সাথে আমার প্রথম দেখা হয় কলকাতায়, সর্ববাংলা ফিউশন সঙ্গীত সম্মেলনে। সেতার, গিটার, বেহালা আর পিয়ানোয় ওর তুলনা নেই। ওর সেতারের সাথে আমার গিটারের “সেতার-গীটার” জুটি দারুন জমেছিল সেবার। তারপর গত গ্রীস্মে কলকাতার প্রচন্ড গরম সহ্য করতে না পেরে ও বাংলাদেশে আসে। এদেশে এখন পর্যন্ত তার প্রথম আসা।

ছোট্ট মফস্বল, নীলফামারী শহরের কোন উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নেই, আমতলার চায়ের দোকান ছাড়া। একটা ব্যাপার আছে অবশ্য, শান্তি। এ শহরে জ্যাম নেই, ভিড় নেই, ধোঁয়া নেই; সারাদিন নিরবতা বিরাজ করে। আর আমার বাসা ভর্তি গাছের ছায়া, পাখির বাসা, পাখির ডাক আর ডাব গাছের ডাবের মিষ্টি পানি তো ছিলই। শহর থেকে দূরে সূবর্ণরেখা নদীর তীরে দুই বন্ধু একসাথে গিটারে-সেতারে ঝড় তুললাম। হিল্টু বেশ ভালবেসে ফেলল এই শহরটাকে। সেসময়ের কথা, একদিন শহরের বাইরে এক পরিত্যাক্ত নীল কুঠিতে দুজন বসে বসে চারমিনার সিগারেট ফুকছি, সাথে কোল্ড-ড্রিঙ্কসের বোতল। চারমিনার এদেশে পাওয়া যায় না, তবে গোয়েন্দা ফেলুদা পড়ায় এর প্রতি আমার বেশ আগ্রহ। হিল্টু আমার জন্য পুরো এক কার্টুন নিয়ে এসেছে। আমি দ্বিতীয় সিগারেট ধরালাম, হিল্টু ততক্ষণে দুই নম্বরের শেষ দিয়ে তিন নম্বর ধরাচ্ছে। এমন সময় হিল্টু রহস্যময় ভাবে বলল, “মনে কর, এখানে একজন ফিরিঙ্গী সাহেবের আত্না ঘুরে বেড়াচ্ছে, প্রাণ ভরে নিচ্ছে আমাদের সিগারেটের সুবাস!” আমার সেভেন আপের বোতলটা শেষ হয়ে এসেছিল, ছিপি লাগিয়ে বোতলটা দূরে একটা ভাঙা জানালার কোটরের দিকে ছুড়ে ফেলে বললাম, “ভালই তো! আমরা গিটার বাজাব, সাহেবরা মেম সাহেবদের সাথে বল রুম নাচবে!” “দ্যাখ ব্যাটা রিদওয়ান, আমি ঠাট্টা করতাছি না!” উত্তেজনার চোটে রেগে গেলে বা ভয় পেলে হিল্টু এরকম ভাষায় কথা বলে। আমার বাসায় ঢোকার মুখে আমার কুকুর হালুমের ভয়ঙ্কর চিৎকার শুনে ভয়ে এমন ভাষায় ভয়ের কথা বলেছিল। “প্ল্যানচেট?” কথাটা মাটিতে পড়ার আগেই হিল্টু ধরে ফেলল, “Right! এখানেই হবে!” সেরেছে এবার, পাগলা সাহেব ক্ষেপেছে ভূত নামাবে বলে।

<<২>>

প্ল্যানচেট শুরুতে উত্তেজক মনে হলেও পরে দেখা গেল ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। একজনের মাঝে আত্না নামাতে হবে, তাও আবার তার রাশির কি ব্যাপার স্যাপার আছে। প্ল্যানচেটের তুকতাক সম্পর্কে হিল্টু ধারনা আছে, সে আগে একবার নাকি এটা করেছে। সেসব নিয়ে সমস্যা নেই, তুলা রাশির একজনকে জোগাড় করতে হবে। আমার এক বোনের রাশিই হচ্ছে তুলা, কিন্তু তাকে তো আর বলা যায় না। শেষ মেশ পাওয়া গেল, আমার ছোটবেলার প্রথম বন্ধু এবং আমাদের পাড়ার অরুন উদয় ক্লাবের সহ-অধিনায়ক কৌশিক। অনেক অনুরোধে রাজি করান গেল। তারপর আলোচনা কার আত্না নামান হবে। “বীটোফেন বা মোৎসার্ট?” আমি সায় দিলাম। ভাবলাম সফল হলে হিল্টুর কাছে এটা শিখে নেব, তারপর আমার প্রিয় কবিদের আত্না নামাব- কীটস, রবার্ট ব্রাউনিং, হুমায়ুন আজাদ। ব্রাউনিং প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড় এলিজাবেথ ব্যারেটকে, আমার মতিগতিও আবার ঐরকম! তাই যদি কোন নির্দেশনা পাওয়া যায় তাঁর কাছ থেকে! নীলকুঠির ওদিকে এক গ্রা্মের বাড়িতে খুজে পেতে নিয়ে আসা হল তিনটা চেয়ার আর একটা টেবিল। হিল্টুকে দেখে ওরা সহজে রাজি হয়ে গেল। আমাদের দেশের গ্রামের মানুষরা বিদেশীদের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক। হিল্টু তিনশ টাকা বকশিশ দিয়ে নীলকুঠির একটা ঘর পরিস্কার করিয়ে নিল। প্রতিক্ষা, আর দুদিন পর অমাবস্যা।

<<৩>>

অমাবস্যার রাত। গ্রামাঞ্চলে মানুষ এমনিতেই আগে ঘুমায়, আজ আরও নিরবতা। দূরে জ্বোনাকি জ্বলছে। ঝিঝির ডাক, আকাশের এক প্রান্ত থেকে এসে আরেক দিকে চলে যাওয়া বাদুরের ডানার শোঁ শোঁ শব্দ, দূরে থেকে থেকে শিয়ালের ডাক- সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ গা ছমছমে অবস্থা। নীলকুঠির ভেতরে ভাঙা কুঠুরিগুলোতে জোনাকি জ্বলছে। কুঠীর সামনে ভাঙা সিড়ির সাথে তিনটা সাইকেল তালা মেরে হেলান দিয়ে রাখা। বারান্দা দিয়ে ভেতরে ঢোকার প্রথম দরজার ফোকলা গহ্ববরের ভেতরে হল ঘর। জোনাকির আলো না থাকলে মনে হবে কে যেন কালি গুলিয়ে ঢেলে দিয়ে অন্ধকারকে আরও গাড় করেছে। হল ঘরের ঠিক ডান পাশেই একটা ছোট্ট ঘর। এটা খুব সম্ভবত একসময় কোন অফিস ঘর ছিল। দেয়ালে ফাইল পত্র রাখার ছোট কংক্রীটের কেবিনেটের ধ্বংসাবশেষের নমুনা আজও বিদ্যমান।

সেই ঘরের ভেতর বসে আছে তিন জন- আমি, হিল্টু আর কৌশিক। টেবিলের মাঝখানে একটা মোম জ্বলছে, নিঃশব্দ চারপাশ। ছোট টেবিলে বসে আছি আমরা। সবার হাত টেবিলের ওপর আঙুল প্রসারিত করে উপুড় করে রাখা, স্থির। হিল্টু গম্ভির গলায় ব্রিটিশ কায়দায় বলে চলেছে, “If there is you, honorable Beethoven or Mozart, please response to us. We humbly beg your kind response. …. If there is you,……” হিল্টুর ভরাট গম্ভির গলা প্রেতাত্নার মত ভেসে বেড়াতে লাগল্ পুরো ভাঙা বাড়ি জুড়ে। আমাদের চোখ বন্ধ, চোখের বন্ধ পর্দার সামনে মোমের আলোর হালকা ঝাপ্টা। হিল্টু অক্লান্তভাবে বলে চলেছে, কতযুগ যে কেটে গেল তার যেন কোন হিসেব নেই, হঠাৎ অনূভব করলাম বন্ধ চোখের সামনে আলোর ঝাপসা আভা নেই, মোম নিভে গেছে! আমার মুখোমুখি কৌশিকের অচেতন হয়ে টেবিলে মাথা লুটিয়ে পড়ার ধুপ শব্দ শুনলাম। কোমরের কাছ থেকে মেরুদন্ডের ভেতর দিয়ে মাথার ভেতর একটা শীতল স্রোত পোউছে গেল। “Honorable Beethoven, Honorable Mozart, have anyone of you, dignified souls come?” হিল্টুর প্রশ্নটা শেষ হতে না হতেই একটা অদৃশ্য, প্রচন্ড দৃড় গলায় উত্তর, “গুঠেন আবেন্ট!” আমি চমকে গেলাম এবং সম্ববত হিল্টুও। জার্মান ভাষায় সম্ভাষন। বীটোফেন ও মোৎসার্ট, দুজনেই জার্মান পারতেন। তবে এই গলাটা আমি চিনি, একবার একটা বিশ্বযুদ্ধ আর্কাইভের ভিডিওতে শুনেছিলাম তার ভাষন, অ্যাডলফ হিটলার! যাকে ঠেকাতে হিল্টুর পূর্ব-পুরুষদের কালা পানি বেড়িয়েছিল, সেই ভয়ংকর হিটলার এসেছেন!

ঠিক করা ছিল যে হিল্টুই সব প্রশ্ন করবে, কিন্তু কি থেকে কি সে তো পুরো বোবা হয়ে গেল, সম্ভবত ভয়ে। টেবিলে তার আঙুলগুলো ঠক ঠক করছিল, অস্পষ্ট শুনলাম ও বলছে, “মাইরা ফেলল আমারে!”।  কিছু একটা করা দরকার। মোটামুটি জার্মান পারি, তাই দিয়ে হিটলারকে জিজ্ঞেস করলাম যে আমাদের ভাষায় কথা বার্তায় তার কোন সমস্যা আছে কিনা। পরিস্কার বাংলা ভাষায় তিনি বললেন, “দেহ ছাড়লে আত্না সব ভাষাই বুঝতে পারে।তোমার বন্ধুকে বল আমি কাউকে মারতে আসিনি।” হিলটুর বেগতিক অবস্থা দেখে আমিই শুরু করলাম,

-এই যে আপনি আমাদের এখানে এলেন, আপনি কি আসলে আশেপাশেই ছিলেন নাকি আমাদের ডাক শুনে এসেছেন? আপনার জার্মা্নির দুই সঙ্গীত গৌরবকে আসলে আমরা ডাকার চেষ্ঠা করছিলাম। ইয়ে মানে, মহাত্নন, ক্ষমা করবেন ভুল বললে। আপনার সঙ্গও আমরা মানে আমাদের ভালই লাগবে।

-আমি মাঝে মাঝে আমি চিন্তা করি যে কারা ঠিক ছিল, আমি না চার্চিল। তাই ওদের মানে ব্রিটিশদের শাসনের নমুনাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখি, বোঝার চেষ্ঠা করি যে কারা বেশি ভুল আর অত্যাচার করেছে। ব্রিটিশদের অত্যাচারে নিহত নীল-চাষে অবাধ্য এক চাষীর সাথে কথা বলছিলাম। এমন সময় শুনি তোমরা ডাকাডাকি করছ। বীটোফেন আর মোৎসার্ট, দুজনই অন্য কাজে ব্যাস্ত।

-আচ্ছা মহাত্নন, আপনাকে একটা অন্য ব্যাপারে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছিল, একটু ব্যাক্তিগত।

-ইভার সাথে আমার প্রেম কিংবা যৌন জীবন নিয়ে? এখন পর্যন্ত দু’হাজার বারো জন আমাকে এই প্রশ্ন করেছে।

হিটলার কোন খারাপ ব্যবহার দেখাচ্ছিলেন না। আমি সহজ হয়ে এলাম, “না, একটা বইয়ে পড়েছিলাম যে আপনি নাকি এক ইহুদী মেয়ের প্রেমে পরেছিলেন?”

-হ্যা। সেটাই ছিল আমার জীবনের ভুল।

-কেন? একটু খুলে বলবেন কি মহাত্নন?

কৌশিক বসেছিল আমার মুখোমুখি, হিটলার ওর ওপর ভর করেছে। হিটলারের গলা আসছিল সেখান থেকেই।

-ইহুদীরা সেসময় ছিল সব বড় ব্যাবসা আর কোম্পানিগুলোর মালিক। আমি এক সাধারন মানুষের সাধারন সন্তান। আমার প্রতিবেশি ছিল ঐ মেয়ে, মুখোমুখি বাড়ি। একবার স্কুল থেকে ফিরছি, বয়স তখন কত আর, ধর চৌদ্দ। বাসায় ঢোকার মুখে একটা হাসির শব্দে পেছনে ফিরে দেখি সে তার কয়েকজন বান্ধবীর সাথে কি একটা ব্যাপার নিয়ে হাসাহাসি করছে। আমাদের এলাকায় কিশোরীদের একটা খেলা ছিল। সেটা খেলার জন্য সে প্রায়ই বাসার বাইরে যেত আর আমি চেয়ে থাকতা্ম আমার জানালা দিয়ে।

-তারপর?

-ওর পরিবার ছিল বেশ বড় ব্যাবসায়ী পরিবার। বোঝই তো, আমাকে আর আমার পরিবারকে খুব খারাপভাবে অপমান করল। তখন মনে হল ইহুদীরা এত দাপুটে না হলে এমন হত না। পরিবারের অপমান আমি সহ্য করতে পারিনি। মনে হচ্ছিল ইহুদী জাতিটাই বুঝি এমন, জার্মান খ্রীষ্টানদের দেখতে পারে না। ব্যাস, সেনাবাহিনীতে যাবার পর এই ব্যাপারটা খুব মাথায় আসত। তখনই ইহুদী হটানো আর দেশের নেতা হবার ইচ্ছা জাগে।

-সেই মেয়েটির সাথে আর ভাব জমানোর চেষ্ঠা করেননি?

- করিনি আবার! আমি কিন্তু একটু ভাবুক ধরনের ছেলে ছিলাম সেনাবাহিনীতে যাবার আগ পর্যন্ত। ও বলল এটা সম্ভব না, আর তাছাড়া ধর্মের কথাও বলল। তারপর শেষে যা হল তা বলার নয়।

-কি হয়েছিল?

-না, বলতে চাই না সেটা।

-ক্ষমা করবেন মহানুভব।

-না ঠিক আছে। তোমরা বেশ ভাল ছেলে।

-হঠাৎ এমন মনে হল কেন?

-সবাই শুধু আমার যুদ্ধ, ইভার সাথে প্রেম, পরিকল্পনার কথা জানতে চায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় মার্কিন সেনাবাহিনীর এক বেজন্মা মেজর আমাকে ডাকল। জানতে চায়, যুদ্ধে ভিয়েতনামীদের হারানোর উপায় কী? আমি বললাম কোন উপায় নেই। ব্যাটা শুনল না। ওরা অবশ্য ভাল কথা শোনার মত মানুষও না। উফ! এইসব লোকেদের ওপর আমি বিরক্ত। আমার ভুল দেখেও কেউ শিক্ষা নিল না। যারা আমাকে হারিয়ে দিল, ভেবেছিলাম তারা অন্তত এই ভুলগুলো করবে না। অথচ এই ভুল দিয়েই তারা এখন পৃথিবী শাসন করে। তোমরা আগের চেয়ে পিছিয়ে যাবে এরকম হলে।

যুদ্ধের কথা শুনতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। তাই বললাম, “আচ্ছা সেসব বাদ দিন মহানুভব, আজ আপনার নিজের কথাই শুনি। ছবি আঁকায় আপনার প্রতিভা ছিল জানতাম।” কিছুক্ষন সবকিছু নিরব, আশে পাশে ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজও পাচ্ছিলাম না কানে সেই ভয়াবহ নিরবতায়। তারপর কিছু সময় পর তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “হ্যা, ছবি আকতাম। ভাল কিনা জানি না। আর্থের অভাবে কখনও শিখতে পারিনি কোথাও। ব্যাটা আর্ট ইন্সটিটিউটের পরিচালক, হারামজাদা বলে আমার নাকি কোন প্রতিভা নেই। অনেক অনুনয় করেছিলাম, লাভ হয় নি। ওটাই ছিল আমার স্বাভাবিক জীবনে থাকার শেষ সুযোগ।”

-শেষ সুযোগ? শেষ সুযোগ বলতে কি বোঝাচ্ছেন আপনি?

-দেখ সেনাবাহিনীতে যাবার অত জোড়াল ইচ্ছে আমার ছিল না। আমি ছিলাম এমন এক কিশোর বা তরুণ, যে সব সময় নিজের হৃদয়ের কথা শুনেছে। চেয়েছিলাম চিত্র শিল্পী হয়ে আমার কষ্ট আর জীবন দর্শনকে তুলে তুলে ধরব। প্রথম প্রেমের সেই ক্ষত সারানোর জন্যও সেটার দরকার ছিল। সেটা হল না। তারপর আর কি, পরিবারের দায় টানতে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলাম। যেদিন উর্দি গায়ে শপথ নেই, শপথ নেবার সময়ও মনে হচ্ছিল যে আত্নহত্যার দিকে পা বাড়াচ্ছি। তারপর শুধু ভুল আর ভুল।

শেষের দিকে হিটলারের গলা ভেঙে আসছিল কষ্টে, দুঃখে। আমার নিজেরও কেমন কষ্ট হচ্ছিল তার জন্য। ইতিহাস যাকে ভিলেন বানিয়েছে এবং যে আসলেই একটা খলনায়ক, তার জীবন এমন হতে পারে, কেউ কি ভেবেছে? “আজ বহু বছর পর আমার মনের কথাগুলো কেউ শুনল। শেষ বলেছিলাম ইভাকে আত্নহত্যার কয়েক ঘন্টা আগে। বিদায় হে তরুণবৃন্দ, নিজের হৃদয়কে সবসময় অনুসর করবে। আমার ভুলকে অনুস্রন কর না। ইশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন।” দশ সেকেন্ডের মত কেটে গেল, কোন সাড়া শব্দ নেই। আরও কয়েক মুহূর্ত পর কৌশিকের মাথা আবার টেবিলের ওপর লুটিয়ে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে দেখি হিল্টু কৌশিককে পরীক্ষা করছে, মুখ অসম্বব গম্ভির। “ঠিক আছে, ঘুমাচ্ছে ও।” হিল্টুর কথায় আস্বস্ত হলাম। বাইরে তাকিয়ে দেখি, ভোর হয়ে এসেছে! আরে! আমরা প্ল্যানচেটে বসেছিলাম রাত ১২:৪৫ এ, আমার হিসেবে হিটলার এসেছেন দেড়টার আগেই। যা কথা বার্তা হল তাতে প্ল্যানচেট দুটোর আগেই শেষ হবার কথা। ঘড়িতে বাজে ভোর ৬টা! এত সময় ধরে প্ল্যানচেট হল কিভাবে? নাকি ভুলে গেলাম সব? নাকি সম্মোহনে ছিলাম আমরা যে সময় টের পেলাম না? কে জানে! আমার ব্যাগে বিস্কিট আর পানি ছিল। কয়েকটা বিস্কিট খেয়ে আমি আর হিল্টু চার মিনার ধরালাম। কষে কয়েক টান দিয়ে হিল্টু বল, “সম্মোহন! কয়েকটা কথার জন্য পুরো রাত শেষ? ভুল, এটা হতে পারে না, হয় না।” “তাহলে কৌশিক কেন জ্ঞান হারাল? কেনই বা হিটলারের গলা শোনাল? তুমি যা শুনেছ, আমিও তাই শুনেছি। এ সম্মোহন নয়, অন্য কিছু।” জবাব দিলাম আমি। “হয়ত দুটোই। আত্না এসেছিল এবং যাওয়ার আগে আমাদের সম্মোহিত করেছিল। সেই সম্মোহন ছিল ভোর পর্যন্ত।” এরকম আগডুম বাগডুম কথা হচ্ছে, এমন সময় চোখ ডলতে ডলতে কৌশিক এসে দাঁড়াল। ও বলল, “হিল্টু, রাতে কি হল? ঘুমিয়ে তো কাটালাম, টের পেলাম না কিছু।” যখন সব কিছু বলল হিল্টু, কৌশিক পুরো স্তব্ধ। “কিছু টের পাওনি? জ্ঞান হারানোর অনুভূতি?” হিল্টুর অবাক জিজ্ঞাসা। “হঠাৎ কেমন একটা অদ্ভুত ঘুম ঘুম ভাব, ব্যাস আর কিছু না।” বুঝলাম সম্মোহন কি জিনিস। সকালের আলো ফুটছিল, সব কিছু গুছিয়ে তারপর গ্রামের যে বাড়ি থেকে টেবিল চেয়ার নিয়েছিলাম, তাদের খবর দিলাম। হিল্টুকে ওরা বারবার খেয়ে যেতে বলল। কিন্তু তখন কি আর সে মানসিক অবস্থা আছে, বাধ্য হয়ে সে সেদিন দুপুরের দাওয়াত গ্রহন করল। নীলকুঠির কাছে ডেনমার্কের একটা মিশনারী কুষ্ঠ হাসপাতাল আছে। তার সামনে একটা হোটেলে আমরা সকালের নাস্তা খেতে গেলাম। অদ্ভুত একটা অনুভূতি, সাথে মাথায় বাজছিল হিটলারের সেই কথা, “নিজের হৃদয়কে সবসময় অনুসর করবে।”

উৎসর্গ- গায়ক অঞ্জন দত্তের বেজ গীটারিস্ট, কলকাতার অ্যাংলো লিও হিল্ট(Leo Hilt)। অঞ্জন দত্তের “রঞ্জনা আমি আর আসব না” নামের অসাধারন ছবিটা দেখার পর থেকেই অভিনয় আর বাজানোর জন্যে তাকে এত ভাল লেগে যায় যে ছবিতে তার নাম “হিল্টু” কে আমার লেখায় নিয়ে আসার চিন্তা করি। তার চেহারা আসলেই পাগলা সাহেবদের মত।

 

 

১ vote, average: ৫.০০ out of ৫১ vote, average: ৫.০০ out of ৫১ vote, average: ৫.০০ out of ৫১ vote, average: ৫.০০ out of ৫১ vote, average: ৫.০০ out of ৫ (ভোট, ৫.০০/ ৫)
রেটিং করার জন্য আপনাকে রেজিস্টার্ড সদস্য হতে হবে
Loading ... Loading ...
প্রকাশিত লেখা বা মন্তব্য সম্পূর্ণভাবেই লেখক/মন্তব্যকারীর নিজস্ব অভিমত। এর জন্য ক্যাডেট কলেজ ব্লগ কর্তৃপক্ষকে কোনভাবেই দায়ী করা চলবেনা।

৮ টি মন্তব্য

  1. মীম (২০০৬-২০১১)
       জুলাই ৭, ২০১২ at ৮:৫৩ অপরাহ্ন |

  2. সুষমা (১৯৯৯-২০০৫)
       জুলাই ৭, ২০১২ at ৮:৫৯ অপরাহ্ন |

    প্ল্যানচেট শিরোনাম দেখে পাঠক যেই কল্পনা নিয়ে লেখার মাঝে ঢুকবে ,পরে পুরাই বিস্মিত হবে। একেবারে আলাদা ট্র্যাক ! ইনফরমেটিভ ও :clap: :clap: ,অনেক ভাল লেগেছে

    [ জবাব দিন ]

    রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)
        জুলাই ১০, ২০১২ at ৪:৩৫ অপরাহ্ন |

    ইতিহাস যাদের খলনায়ক বানিয়েছে, তাদের অতীত হয়ত তেমন ছিল না। অনেকেই বাধ্য হয়েছে সেই পথে আসতে। আপু, আমি এখানে সেটাই দেখাতে চেয়েছি। আর সাথে রেখেছি কিছু কল্পনা আর গল্পের মিশেল।

    [ জবাব দিন ]

  3. ফজলে রাব্বি নোমান (৮৬-৯২)
       জুলাই ৮, ২০১২ at ৮:৪৩ পুর্বাহ্ন |

    ভাল লেগেছে :clap:

    [ জবাব দিন ]

  4. জিয়া হায়দার (৮৯-৯৫)
       জুলাই ৮, ২০১২ at ১১:৫৭ পুর্বাহ্ন |

    ”আমার প্রিয় কবিদের আত্না নামাব- কীটস, রবার্ট ব্রাউনিং, হুমায়ুন আজাদ”
    ভালোই হতো যদি এমন হতো……। তোমার গল্পের বর্ণনা ছিল অসাধারণ…। :clap:

    [ জবাব দিন ]

    রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)
        জুলাই ১০, ২০১২ at ৪:৩৫ অপরাহ্ন |

    ধন্যবাদ ভাইয়া। :)

    [ জবাব দিন ]

  5. খেয়া (০৬ - ১১)
       জুলাই ১০, ২০১২ at ৭:৩৩ পুর্বাহ্ন |

    খুব খুব খুব খুব খুব সুন্দর ভাইয়া। :thumbup:

    [ জবাব দিন ]

    রিদওয়ান (২০০২-২০০৮)
        জুলাই ১০, ২০১২ at ৪:৩৬ অপরাহ্ন |

    আসংখ্য ধন্যবাদ আপু। :)

    [ জবাব দিন ]

মন্তব্য করুন :

আপনার ই-মেইল ঠিকানা কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা শেয়ার করা হবেনা। দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা। আবশ্যিক তথ্যগুলো * চিহ্নিত করা আছে।

*
*
:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »


(বাংলায় টাইপ করতে ctrl+g চাপুন। একটি শব্দ লেখা শেষে স্পেস বার চাপুন। তাহলেই ইংরেজী থেকে শব্দটি বাংলায় রুপান্তরিত হবে।একই শব্দের একাধিক বানান অপশন দেখতে শব্দটির উপরে মাউস রেখে ক্লিক করুন)
Ekushey Inline virtual Bangla keyboard