random header image

চৌইদ্দ জন ক্যাডেট নিখোঁজ হওয়ার কাহিনী

আবারও সেই সি এইচ এম এর কাহিণী। ক্লাস ইলেভেন এর এক্সকারসন এ আমরা সবাই যখন আনন্দে আত্মহারা,এক রাতে চৌইদ্দজন ক্যাডেট এর নিখোঁজ হওয়ার আচমকা এক সংবাদ ফর্ম মাস্টার,এডজুট্যান্ট,প্রিন্সিপাল,স্টাফ সবার রাতের ঘুমই শুধু কেড়ে নিলনা, জনৈক ফর্ম মাস্টারের বুড়ো বয়সে হানিমুন পালনকে ঘোর অমাবস্যার অন্ধকারে ডুবিয়ে দিলো।

তিন মাসের লম্বা ছুটি শেষ করে আসার পর এক একটি মস্তিস্ক তখন শয়তানের শিল্প কারখানা। কক্সবাজারে বার্মিজ মার্কেট এ রাখাইন কন্যা ভিও, পিংকির সাথে বিদ্যুত চলে গেলে জনৈক স্মার্ট বন্ধু রাজু কি করেছিল সেই কাহিনি এইখানে বিধৃত করলে আপনারা সবাই একবাক্যে বলবেন আমি সস্তা স্থূল রসিকতার অবতারনা করছি। তবে সৃজনশীল চিন্তাও খেলত অনেক।এই যেমন টেকনাফ থেকে ফেরার পথে রাস্তায় পঁচা খিচুরি খাওয়ার পর রাতের বেলায় পানির অভাবে কেউ কেউ প্রাকৃতিক কর্ম শেষে মোজ়া দিয়ে জুতা যেভাবে সক্স করে ঠিক সেভাবে ঘটীর কাজ সেরেছিল, কেউবা রাডার এর টাওয়ার এ ঝুলে ৩৬০ ডিগ্রিতে জিলাপি বানিয়েছিল।কারণ একটি টয়লেট,লোক ৫০ জ়ন। তার উপর আবার পানি ছিল না।

খিচুড়ির লঘুচাপে মাথা থেকে দুষ্টু চিন্তাগুলি যখন চলে গিয়েছিল তখন চৌদ্দ জন ক্যাডেট এর মাথায় আসলো রাতের সমুদ্র দেখবে, ঢেউ এর সাথে সমুদ্রের পানিতে কিভাবে ফসফরাস জ্বলে তা না দেখলে জীবনে পূর্ণতা আসবে না। যেই কথা সেই কাজ। ১৪ জন মিলে রওনা দিলাম সাগর দর্শনে,ফসফরাসের রহস্য উন্মোচনে। আমাদের রেস্ট হাউস ছিল পাহাড়ের উপরে। রেস্ট হাউস বললে ভুল হবে,ওটা ছিল সৈনিকদের একটা ব্যারাক। নিচে নামতেই টহল পুলিশ এর সাক্ষাত পেলাম।

এত রাতে কই যান?
আপনাদের পরিচয়?

আমাদের স্মার্ট বন্ধু জুন্নু খুব ভাবের সাথে উত্তর দিল

-আমাদের দেখে বুঝেন নাই? আমরা সার্কিট হাউস এর গেস্ট, ক্যাডেট কলেজ থেকে এসেছি।

ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রিন্সিপাল বা এডজুট্যান্ট স্বয়ং ও নিজেই।

আমরাও খব মজা পেলাম। জুন্নুর ভাব কাজে দিল।পুলিশ ভাই আমাদেরকে আর কোন বাড়তি প্রশ্ন না করে ভদ্র ভাবে বল্লেন,দেখুন এত রাতে যাওয়া ঠিক হবে না,নিরাপদ না,আপনারা বিপদে পড়তে পারেন,যায়গাটা ভাল না।পুলিশের কথা তোয়াক্কা করে কে……….তেলাপোকাও পাখি পুলিশও একটা মানুষ…..এমন একটা ভাব নিয়ে সবাই সমুদ্র দর্শনে গেলাম।

চৌদ্দজনের চৌদ্দ রকম কৌতুহল। আবার দুষ্টু চিন্তা খেলতে শুরু করল সবার মাথায়। বন্ধু বোয়াল তার অঢ়হড় ভাষায় বললো, এই দোস্ত জানিস অই যে ছাপড়ার ঘরগুলি দেখছিস, অইগুলাতে নাকি জলসা বসে , উদ্দাম নৃত্য হয় চল দেখে আসি । বোয়ালের চোখ জ়্বল জ়্বল করছিল সেই রহস্য উন্মোচনের জন্য। এক এক করে সব কয়টা ঘরে বেড়ার ফাঁক দিয়ে বোয়াল তার বড়ো বড়ো চোখে যতভাবে দেখা সম্ভব দেখলো। কিন্তু নিরাশ হয়ে বিরস বদনে ফিরে এল। আসলে ওগুলি ছিল দোকান।

কারও কারও মধ্যে খিচুড়ির লঘু চাপ তখনও ছিল। তারা তাই প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে সাগরের জলে প্রকৃতির জিনিস প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিয়ে ঋণ শোধ করল। কয়েকজ়নের মাথায় বুদ্ধি আসলো জন্মদিনের পোশাকে সাগরের জলে সমুদ্র স্নান করে শরীর মন জুড়াবে। মুক্ত হাওয়া থেকে দীর্ঘদিন বঞ্ছিত শরীরাংগসমুহকেও সুযোগ করে দিলাম হাওয়া খাওয়ার। মন ও শরীর দুইই জুড়িয়ে গেল। প্রচন্ড ক্লান্তি আর স্বর্গীয় সুখ নিয়ে সবাই রুমে ফিরছি। এমন সময় দেখলাম পাহাড়ের চূড়ায় দুই তিনজন লোক পায়চারি করছে। একজনের চেহারা আর আকৃতি ঝাপসা আলোতেও সুস্পষ্ট। বুঝতে বাকি রইল না আমরা ধরা পড়েছি।কারণ সি এইচ এম তাহের এর সুবিশাল ভুড়ি থেকে ঝাপসা আলোতেও যেন রেশন বের হয়ে আসছিল………অনেক্টা ছোটখাটো কেয়ামত এর আলামত এর লক্ষন সুস্পষ্ট ছিল তার ভুড়িতে। উপরে গিয়ে দেখলাম আমাদের রুম এর দরজাগুলো বাইরে থেকে তালা মারা। আমাদের ভাল ক্যাডেট কয়জন জুনিয়র প্রিফেক্ট আমাদের অপেক্ষায় বাইরে দাঁড়ানো ছিল।ওরা বললো, স্টাফ বলছে সবাইকে বাইরে ফল ইন করতে। সি এইচ এম তাহের ফর্ম মাস্টারের রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে সমানে কড়া নেড়ে যাচ্ছে আর স্যার, স্যার বলে অনবরত চিৎকার করছে। কিছুক্ষন পর স্যার সি এইচ এম এর ডাকে সাড়া দিলেন। স্যার কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই অকস্মাৎ প্রচন্ড জোরে আমরা সবাই একটা চিৎকার শুনতে পেলাম,

স্যার,স্যার, সর্বনাইশ হয়ে গেছে স্যার, চৌঈদ্দজন নাই স্যার, পাড়ায় গেছে স্যার। স্যার,যদি কিছু একটা হয়ে যায়,পুলিশ যদি ওদের আটকে রাখে স্যার,সর্বনাশ হইয়া যাইব স্যার।

তখনও সে জানে না যে আমরা চলে এসেছি। কিন্তু বাইরে থেকে তালা থাকাতে আমাদের আর শেষ রক্ষা হল না।

স্যার বের হয়ে আসার পর সে বলল-
- স্যার,আমি যাই তাড়াতাড়ি এডজুট্যান্ট স্যারকে জ়ানাই।

এদিকে আমরা শীতে কাঁপছি। কিছুক্ষন পর স্টাফ এসে আমাদের নাম নোট করে বল্লেন সবাই সারা রাত বাইরে ঘুমুবে। ভেতর থেকে অন্যরা কিছু কম্বল দিল সেই দিয়ে ঘুমনোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু সারা রাত মশার কামড়ে ঘুম হলো না একটুও।

পাড়ায় যাওয়া শব্দটার সাথে আমরা কেউ পরিচিত ছিলাম না। সে দিন সি এইচ এম তাহের আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন।

কলেজে ফেরত আসার পর পাড়ায় যাওয়ার অপবাদে আমাদেরকে অনেক পিষেছিল।

পরে তাহের স্টাফকে হুমকির স্বরে বলেছিলাম, স্টাফ কাজটা ঠিক করেন নাই। সে উত্তর করেছিল,আমি তো তোমাদেরকে ধরার জন্য উৎ পাতি নাই। ভয়ে আমার ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল এই ভেবে যে আমি বাইরে বারান্দায় এত উঁচু পাহাড়ের উপর ঘুমাইসি। এতগুলা দুষ্টু ছেলে, সবগুলা মিলে যদি আমারে পাহাড় থাইক্যা ফালাইয়া দেয় কি হইব। তাই ভয়ে ঘুমাই নাই। আমি ত এডজুট্যান্ট স্যারকে জানাইতে চাই নাই।আমি ফর্ম মাস্টারকে বলছিলাম, স্যার, পোলাপাইন মানুষ আপনি একটু বকে ছাইড়া দেন। কিন্তু স্যার বল্লেন, না আমি একটু আরামে হানিমুন করতে চাইছিলাম। ওরা আমাকে তা করতে দেয় নাই। আপনি এডজুট্যান্টকে জানান। আমি প্রিন্সিপাল স্যারকে জানাচ্ছি…………।

মিথ্যার কি ভয়ানক নমুনা!!

শুনে আমার মনে হচ্ছিল ধরণী তুমি দ্বিধা হও,আমি উহাতে প্রবিষ্ট হই…………………।
এসব কথা মনে পড়লে দারুণ মজা পাই। মনে মনে টেনিসন এর উক্তিটা আওড়াই………
Time marches on
But memories stay
Torturing silently
The rest of our day

শেয়ার করুন
০ votes, average: ০.০০ out of ৫০ votes, average: ০.০০ out of ৫০ votes, average: ০.০০ out of ৫০ votes, average: ০.০০ out of ৫০ votes, average: ০.০০ out of ৫ (ভোট, ০.০০/ ৫)
রেটিং করার জন্য আপনাকে রেজিস্টার্ড সদস্য হতে হবে
Loading ... Loading ...
প্রকাশিত লেখা বা মন্তব্য সম্পূর্ণভাবেই লেখক/মন্তব্যকারীর নিজস্ব অভিমত। এর জন্য ক্যাডেট কলেজ ব্লগ কর্তৃপক্ষকে কোনভাবেই দায়ী করা চলবেনা।

১৪ টি মন্তব্য

  1. রবিন (৯৪-০০/ককক)
       জুন ৩০, ২০০৮ at ৮:৫২ অপরাহ্ন |

    aldin, bohudin por mone poira gelo sei raat er kotha. sara rat baire ghumaite j ki lagsilo ekhono feel korte pari. wht a night tht was.

    [ জবাব দিন ]

  2.   saif aldin
       জুন ৩০, ২০০৮ at ৯:০০ অপরাহ্ন |

    হ ঠিক ই কইছস

    [ জবাব দিন ]

  3. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)
      মাসরুফ
       জুন ৩০, ২০০৮ at ১১:৩১ অপরাহ্ন |

    সাইফ ভাই,আপ্নের পাড়ায় যাওয়ার অভ্যাস তাইলে অইদিন থিকা শুরু………জট্টিল মজা পাইছি……

    [ জবাব দিন ]

      saif aldin
        জুলাই ১, ২০০৮ at ১:০৭ পূর্বাহ্ন |

    অই বেটা,তাহের এর মত অপবাদ দিবি না,বরদাশ্ত করুম না,…………।।হা হআ হা হা

    [ জবাব দিন ]

  4. কুচ্ছিত হাঁসের ছানা (৯৯-০৫)
       জুন ৩০, ২০০৮ at ১১:৪০ অপরাহ্ন |

    দারুণ।
    ইলেভেনের এক্সকারশনে আমাদের সবগুলার সামনে প্রিফেক্টশীপের মুলা ঝুলায়া রাখছিল।
    সবাই বেশি বেশি তেল মারায় ব্যস্ত। আর কে কত বেশি প্রশ্ন করতে পারে তার প্রতিযোগিতা। অসহ্য।

    লেখাটা পড়ে এতটাই নস্টালজিক হয়ে গেলাম যে , কমেন্ট লেখতে গিয়ে দেখলাম অনেক বড় হয়ে গেছে। তাই আরেকটা পোস্ট হিসেবে দিয়ে দিলাম। :D

    [ জবাব দিন ]

  5. সিরাজ (৯৪-০০)
       জুলাই ১, ২০০৮ at ১২:২৯ পূর্বাহ্ন |

    আলদিন কড়া লিখছোস……………।।

    [ জবাব দিন ]

  6.    জুলাই ২, ২০০৮ at ৮:০৬ অপরাহ্ন |

    আলদিন

    মিছা কথা কস কেন? তোরা তো সত্যি সত্যি পাড়ায় গেছিলি।

    [ জবাব দিন ]

    রবিন (৯৪-০০/ককক)
        জুলাই ২, ২০০৮ at ১০:৩৪ অপরাহ্ন |

    হা হা। আলদিন, কস নাই তো

    [ জবাব দিন ]

    সিরাজ (৯৪-০০)
        জুলাই ১৫, ২০০৮ at ১২:১৮ পূর্বাহ্ন |

    সাইফ পাড়ায় যাবার পোলাই না……………।

    [ জবাব দিন ]

      shahed
        সেপ্টেম্বর ২৬, ২০০৯ at ১:৫৫ অপরাহ্ন |

    i agreee

    [ জবাব দিন ]

  7.   saif aldin
       জুলাই ৩, ২০০৮ at ৮:০৬ অপরাহ্ন |

    অই শালা ,তাইলে তো তুই অ গেছস

    [ জবাব দিন ]

  8. তারেক (৯৪ - ০০)
       জুলাই ৩, ২০০৮ at ৮:০৭ অপরাহ্ন |

    দীনস,
    এই টয়লেট কাহিনি একদিন টাইম কইরা লিখে ফেলতে হবে। তোরে দেইখা উৎসাহ পাইলাম।

    [ জবাব দিন ]

  9. সাইফ (৯৪-০০)
       জুলাই ৩, ২০০৮ at ৮:১০ অপরাহ্ন |

    লিখে ফেল ভাই
    ,এই শালা ফ্রি থাকলে মেসেঞ্জার এ আয়

    [ জবাব দিন ]

  10. হাসান (১৯৯২-১৯৯৮)
       জুলাই ১৪, ২০০৮ at ৪:৫৩ অপরাহ্ন |

    Wonderful article. সমুদ্র দেখতে যাবার আগে সত্যি সত্যি সি,এইচ,এম কে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে গেলে ভালো করতেন। :))

    [ জবাব দিন ]

মন্তব্য করুন :

আপনার ই-মেইল ঠিকানা কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা শেয়ার করা হবেনা। দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা। আবশ্যিক তথ্যগুলো * চিহ্নিত করা আছে।

*
*
:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »


অভ্র প্রভাত ফোনেটিক ইউনিজয় ইংরেজী
(বাংলায় টাইপ করতে ctrl+g চাপুন। একটি শব্দ লেখা শেষে স্পেস বার চাপুন। তাহলেই ইংরেজী থেকে শব্দটি বাংলায় রুপান্তরিত হবে।একই শব্দের একাধিক বানান অপশন দেখতে শব্দটির উপরে মাউস রেখে ক্লিক করুন)
Ekushey Inline virtual Bangla keyboard