একদিনের টিউশনি ও ২৯ টাকার গল্প

একদিন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, Student Wanted. Girl. Only Math. Class 12. Salary 10k+.

খোদা আমার দুরাশা পূরণ করলেন। 1st term পরীক্ষার দশ দিন আগে আমার এক ক্লাসমেট ব্যাচমেট বান্ধবী ফোন দিয়ে বলল, “তুই নাকি পড়াইতে চাস?”
আমি তখন রিডিং রুমে। টার্ম কাছে চলে এসেছে, তাই টিউশনির চিন্তাও মাথা থেকে আপাতত ঝেড়ে ফেলেছিলাম। তাই হঠাৎ এই অনাকাঙ্ক্ষিত কল এ ভড়কে গেলাম।
“হ্যাঁ।”
“আমার বোন ক্যাডেট, বুঝলি? ভ্যাকেশনে এসেছে। আমি তো ফিজিক্স কেমিস্ট্রি দেখিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু ম্যাথটা না…জানিস তো…ইংলিশ ভারশন…তুই কি একটু দেখিয়ে দিতে পারবি?”
ওরে বাপরে! মেয়েটা বলে কি? আমার তো ততক্ষণে কাঁপাকাঁপি লেগে গেছে। শুধু দেখিয়ে? দরকার হলে আরও কত কিছু করে দিতে পারব! তাও একটু ব্যস্ততা দেখিয়ে বললাম, “…তুই তো জানিস, তোর এখন যেরকম ব্যস্ততা(মানে টার্ম), আমারও সেইরকম…”
এইবার সরাসরি মেয়ের মা কথা বললেন, “তোমাকে ওর ম্যাথটা শেষ করিয়ে দিতে হবে…”
সত্যি কথা বলতে কি, নারীদের কিভাবে না বলতে হয় আমি তখনও শিখিনি। আর দু দুজন নারী, প্রশ্নই আসেনা। সুড়সুড় করে রাজি হয়ে গেলাম।
তো ঐদিন রাতে আমি হলে গেলাম। মাথার মধ্যে একগাদা দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। ধুর ছাই, নেহায়েত কমেন্ট পাওয়ার জন্য একটা স্ট্যাটাস দিলাম, আর বাঁশটা এইভাবে খাইলাম?  যাইহোক, পুরুষ মানুষ, একবার হ্যাঁ যখন বলেই ফেলেছি, না তো আর করতে পারি না।
পরামর্শের জন্য এক ক্যাডেট বান্ধবীকে ফোন দিলাম।
“দোস্ত, আমি তো মহা ঝামেলায় পড়সি।”
“কি ঝামেলা?”
“___ বলসে ওর বোনরে পড়াইতে হবে…”
“তুই তো এইটাই চাচ্ছিলি, তাই না? পড়া, অসুবিধা কি?”
“একবার তো হ্যাঁ বলেই দিসি, এখন তো পড়াইতেই হবে। টাকা দিবে তো?”
“ক্যান, টাকার কথা কিসু বলে নাই?”
“না।”
“আরে দিবে, দিবে, টেনশন করিস না।”
তো পরের দিন আমি ধুমধারাক্কা ড্রেস পড়ে বিশাল আকারে বডি স্প্রে মেরে হল থেকে বের হলাম। ক্লাসমেটকে ফোন দিলাম।
“আসব কেমনে?”
“রিকশায় উঠে বল, ___ মসজিদে আসতে। তুই নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়া, আমি তোকে নিয়ে যাব।”
“ভাড়া কত নিবে?”
“পনের টাকা”।
আমি পনের টাকা ভাড়া দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় গেলাম। কিছুক্ষণ পর ওর দেখা পেলাম। আমরা ওর বাসার দিকে হাঁটা ধরলাম। যাবার পথে ও কিছু ফ্রি টিপস দিল।
“প্রথম দিন কিছু পড়ান দরকার নাই, আগে তুই ওর সাথে পরিচিত হয়ে নে।”
“নেক্সট দিন থেকে এইখানে রিকশা দাঁড় করাবি, আর এই পথ দিয়ে আসবি।” ইত্যাদি ইত্যাদি।
ও এইসব উপদেশ দিচ্ছিল আর আমি সামনের মাঠে একগাদা মানুষ খেয়াল করছিলাম। আমার মত একটা বদ চেহারার পোলা, লগে সুন্দরী সমবয়সী মাইয়া, তায় আবার গল্প(!) করতে করতে হাঁটতেসে, এইটা তো সচেতন জনসাধারণের উদ্বেগ উদ্রেককারী বৈকি! আমি কি ভুল বললাম?
তো আমি ওর বাসায় ঢুকলাম, বসলাম ড্রয়িং রুমে।
অবশেষে আমার ‘ছাত্রী’ উপস্থিত হল। ছাত্রী ভদ্র ভদ্র চেহারার। হঠাৎ ওর মা এসে কি কি পড়াতে হবে হবে এইসব হাবিজাবি বলে গেলেন। অজ্ঞাত কারণে আমি ওনার দিকে চোখ তুলেও তাকালাম না। ভাব করলাম ছাত্রীকে নিয়ে ব্যস্ত আছি।
কিছুক্ষণ উল্টাপাল্টা বকবকানির পর শুরু হল পড়ান।
ম্যাথ বই লাস্ট ধরসি এক বছর আগে। বুঝলাম, বিশাল ক্যাচালে পড়সি। আজাইরা কিছু বিচ্ছিন্ন গণিত ঝাড়ার পর ছাত্রী বলে, “ভাইয়া, আমাকে কিন্তু পুরো বলবিদ্যা শেষ করে দিতে হবে।”
হায় হায়, ছেড়ি বলে কি? পুরা বলবিদ্যা!!! এরপর  কি বলবে, “ভাইয়া, আপনার মাথাটা কাইটা রাইখা দিমু, পাইতা দেন??!!”
এই বলবিদ্যা আবার শেষ করতে হবে আট দিনের মধ্যে।
তাও টানা আট দিন! কারণ, ক্যাডেটদের ভ্যাকেশন তো কমই হয়, তাই অনেকে ভাবে পুরা টার্মের পড়া এক টানেই শেষ কইরা যামু…আর এই ভাবনার ‘বলির পাঁঠা’ হয় আমার মত হতভাগারা!
যাই হোক, সেইদিন কোন ভাবে গাইড আর ক্যালকুলাসের উপর দিয়া চালায়া দিলাম। ছাত্রী আবার মহা আঁতেল, ক্যালকুলাস নিজেই কইরা রাখসে বহুদূর(!)। আমি আর কি করব, ছাত্রী বকবক করল, আমি ছাগলের মত মাথা নাড়াইলাম আর মনোযোগ সহকারে গাইড দেখতে লাগলাম।
এইভাবে প্রায় তিন ঘণ্টা পার হয়ে গেল। টাইম কোনদিক দিয়ে গেল টেরই পেলাম না।
অবশেষে ছাত্রী বলল, “ভাইয়া, আজকে থাক”।
আমি অতীব আনন্দের সাথে ভাবলাম, “যাক, মেশিন তাইলে ঠাণ্ডা হইসে।“
তবুও মুখে কৃত্রিম উদ্বেগ ফুটিয়ে তুলে বললাম, “কেন?” এমন একটা ভাব যে এত তাড়াতাড়ি কেন যাচ্ছ, আরও একটু পড়ে গেলে হত না?
আমি ভাবসিলাম উত্তর আসবে, “ভাইয়া আমি টায়ার্ড”।
কিন্তু মানুষ যা ভাবে সবসময় তা হয় না।
ছাত্রীর উত্তরে আমার খালি হার্টফেল করা বাকি।
“ভাইয়া, আমার আরেকটা টিচার আসবে!!!!!!!!!!”
বাপরে!!! এতো পুরা রকেটের ইঞ্জিন!!! ফুয়েল ওভারলোডেড। এই ইঞ্জিন আর কতক্ষণ চলবে?
আমি বিদায় নিয়ে সুড়সুড় করে চলে আসার পথে সিঁড়িতে এক ব্যাটার মুখোমুখি হলাম। এ-ই মনে হয় নেক্সট। আরও ‘নেক্সট’ আছে কি না কে জানে?
রাস্তায় এসে মানিব্যাগ খুলে দেখি ১৪ টাকা আছে। মানে, পুরো রাস্তা ব্যাক করার ভাড়াও নেই।
কি আর করার, ১ টাকার রাস্তা(!) হেঁটে গেলাম, এবং ১৪ টাকার রাস্তা রিকশায় গেলাম!
পরের দিন আমার আবার যাবার কথা।
সকালে ক্লাসমেটকে ফোন দিলাম, “এখন আসব?”
“না। তুই বিকালে আয়”। ধুর।
বিকালে ফোন দিলাম, “আসব?”
ভাবলাম মধুর একটা রিপ্লাই পাব, “আয়”।
বাস্তবে রিপ্লাই পেলাম, “আমার মামা এসে তো ওকে দেশে নিয়ে গিয়েছে, তোর বোধহয় আর আসা লাগবে না”।
মনে হল কেউ আমার মাথায় আইফেল টাওয়ার ভেঙেছে। অথবা টুইন টাওয়ার।
তবু এমন একটা ভাব দেখালাম, যেন এটাই আমি চাচ্ছিলাম। বললাম, “আলহামদুলিল্লাহ”।
ও দুর্বলভাবে হাসল। আমি ফোন রেখে দিলাম।
পোলাপাইন, এটাই আমার প্রথম ও শেষ টিউশনি। একদিনের টিউশনি।
এবার একটু তোমাদের ম্যাথের স্কিল টেস্ট করে নিই। বল তো, ১৫ + ১৪ = কত?
পেরেছ? এবার এটার আগে একটা মাইনাস সাইন লাগাও।
লাগিয়েছ? সাব্বাস, এটাই আমার প্রথম টিউশনির ইনকাম! সবাইকে ধন্যবাদ।
পুনশ্চঃ আমি এমনই বলদ, ছাত্রীর নামটাই জিজ্ঞেস করিনি। তোমরা FGCC 2011 ইনটেকের কাউকে জিজ্ঞেস কোর তো, আমায় চেনে কি না? চিনলে বলবা, আমি বলেছি, “যেখানেই থাকো, ভাল থেক আপু”।

|

২৮ টি মন্তব্য : “একদিনের টিউশনি ও ২৯ টাকার গল্প”

  1. আহসান আকাশ (৯৬-০২)

    মজার অভিজ্ঞতা :)) :))

    অফটপিকঃ সিসিবির পাঠকদের মাঝে তোমার ক্লাসমেট বা জুনিয়র থেকে সিনিয়রের সংখ্যাই বেশি, তাই পাঠকদের সম্বোধনের ক্ষেত্রে এটা খেয়াল রাখা ভাল।


    আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
    আমি সব দেখে শুনে, ক্ষেপে গিয়ে করি বাংলায় চিৎকার ৷

    জবাব দিন
  2. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    ক্যাডেট কলেজের নামের মধ্যে G শব্দটা দেখলে মনটা খুশিতে নেচে উঠে। আশা করছি তোমার এই পোষ্টের কল্যানে FGCC মেয়েরা এই ব্লগের সন্ধান পেয়ে দলে দলে এখানে যোগ করবে। তাই যদি হয় তোমার ২৯ টাকা আমি তোমাকে ফেরত দেব।


    “Happiness is when what you think, what you say, and what you do are in harmony.”
    ― Mahatma Gandhi

    জবাব দিন
    • রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)

      এইটা কি বললেন আপু ? ওই ২৯ টাকার সংগে আর মাত্র ৯৯৯৭১ টাকা যোগ করে সেটা দিয়ে শেয়ার ব্যাবসা করলে ওর এতদিনে মোটামুটি লাখ তিনেক হবার কথা । দিলে ওইটা দিবেন আর না দিলে নাই । ২৯ টাকা ফেরত দেবার কোন কথা তো এখানে আসতেই পারে না B-)


      আমার কি সমস্ত কিছুই হলো ভুল
      ভুল কথা, ভুল সম্মোধন
      ভুল পথ, ভুল বাড়ি, ভুল ঘোরাফেরা
      সারাটা জীবন ভুল চিঠি লেখা হলো শুধু,
      ভুল দরজায় হলো ব্যর্থ করাঘাত
      আমার কেবল হলো সমস্ত জীবন শুধু ভুল বই পড়া ।

      জবাব দিন
  3. শশী? আমি তো ভাবসিলাম "স্বপ্ন" বা এরকম কিছু। ভালো ভালো। ওর বুয়েটে চান্স পাওয়া উপলক্ষ্যে ওর বোন (আমার সাবেক নিয়োগদাত্রী) সবাইকে খাওয়াইসে, আমাকে বাদে :no: :no:


    সালেহ

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য