জিদান – কিং অফ লিজেন্ডস

আচ্ছা সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে? সবাই মারামারি শুরু করে দিবেন কে বড় তা নিয়ে। পেলে নাকি ম্যারাডোনা? কিন্তু যারা অন্ধ নয়, যাদের চোখ খোলা, তারা এই দুইজনের সাথে আরেকটা নাম নিশ্চিন্তেই যোগ করবেন- জিনেদান জিদান। বিংশ শতাব্দীর অবিসংবাদিত ফুটবল যুবরাজ।

আলজেরিয়ান দরিদ্র পরিবারে জন্মানো জিদান এর ক্যারিয়ার এর মূল পর্বটা শুরু যখন তার উপর চোখ পড়ে এ এস ক্যানসের ভ্যারার্ডের।

১৯৯২-৯৩ মৌসুমে জিদান যখন Bordeaux ক্লাবে, তখনই তার দ্যুতি ছড়িয়ে যেতে থাকে। ১৯৯৪ সালে মৌসুমের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরষ্কারটা জিতে নেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় Intertoto Cup ঘরে তুলেন ১৯৯৫ সালে। অবশ্য সেবার উয়েফা কাপ জিততে পারেননি।

অতঃপর নানা ঘটনার পর জিদান যোগ দেন তখনকার ইতালীয় আইকন দেল পিয়েরোর জুভেন্টাস এ। ধীরে ধীরে কোচ মার্সেলো লিপ্পির আস্থা ভাজন হয়ে উঠা জিদান পরপর দুবার জিতে নেন সিরি- এ লীগ টাইটেল। সেটা ১৯৯৬-৯৭ ও ১৯৯৭-৯৮ এর ঘটনা। সেই সময় পরপর দুবার তিনি দলকে নিয়ে যান চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে। তবে শিরোপা ছাড়াই ফিরতে হয় তাকে। কিন্তু প্রতি ম্যাচেই মন্ত্র মুগ্ধ করে রাখেন পুরো ফুটবল বিশ্ব কে।

২০০১ মৌসুম টা অবশ্য জিদানের জন্য খুব একটা ভালো ছিলোনা। শুধু সিরি – এ শিরোপা ঘরে তুলেন সেবার। এই মৌসুমেই বিশ্ব রেকর্ড পরিমাণ ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে জিদান যোগদান করেন স্প্যানিশ ফুটবল জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদে। এর পর মূলত তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে গ্যালাকটিকোসদের দল। চার বছরে দলের হয়ে একটা লা লীগা সহ মোট ছয়টি শিরোপা জিতেন। সাথে জয় করেন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শীরোপা। সেটা ২০০১-০২ মৌসুমের ঘটনা। বা পায়ের এক দূর্দান্ত ভলিতে ম্যাচের জয়সূচক গোলটি করেন জিদান। চোখ ধাধিয়ে দেয়ার মতন গোল। জিতেন ৫০ বছরের সেরা ইউরোপিয়ান খেলোয়াড় এর খেতাব।

জাতীয় দলে জিদানের দ্যুতি ছড়াতে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ইউরোতে। তখন ফ্রান্স দলে তারকা বলতে ম্যান ইউ আইকন এরিক ক্যান্টোনা। জিদান কিছুটা ধীর গতির। যথেষ্ট গতি সম্পন্ন নন। তাই দলে মানিয়ে নিতে ও তার বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। জিদান কে আবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেখা যায় ১৯৯৮ সালে। শুরুটা অবশ্য ভাল হয়নি। মেজাজ হারিয়ে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন তাই সব ম্যাচ খেলা হয়নি। জিদান ফিরেন কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালীর বিরুদ্ধে, আর বুঝিয়ে দেন কি জাত খেলোয়াড় তিনি। সেমিতে সেটা ধরে রাখেন । তবে বড় খেলোয়াড়রা আসল খেলাটা ধরে রাখেন বড় ম্যাচের জন্য। জিদান যেনো পুরোটাই জমিয়ে রেখেছিলেন সেই ফাইনাল ম্যাচের জন্য। ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনাল শুরুর আগে ব্রাজিল ছিলো একতরফা ফেভারিট। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা ব্রাজিলিয়ান ফেনোমেনন রোনালদো তখন সবাইকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষায়। কিন্তু জিদান এতটাই দূর্দান্ত হয়ে উঠলেন, যেনো মনে হচ্ছিলো অন্য গ্রহের ফুটবল খেলছেন তিনি। হেড দিয়ে অসাধারণ ভঙ্গিমায় দু দু’টো গোল করেন। ফলাফল পরাক্রমশালী ব্রাজিল বিধস্ত ৩-০ গোলে, শুধু এক জিদান যাদুতে।

১৯৯৮ বিশ্বকাপের মোহভঙ্গ হতে না হতেই কড়া নাড়ে ইউরো ২০০০। সেখানে চ্যাম্পিয়ন কোন দল? জিদান যে দলে খেলেন সেখানে কি আর কারো পাত্তা থাকে? ফ্রান্স জিতে নেয় ইউরো টাইটেল। ফাইনালে ইতালিকে হারিয়ে।

এরপর আসে ২০০২ বিশ্বকাপ। জিদান ইনজুরিতে। ফলাফল ইংলিশ লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা থিয়েরী অরি আর ত্রেজেগে থাকার পরও ফ্রান্সের বিদায় গ্রূপ পর্ব থেকে ।

ইউরো ২০০৪ এ কোয়ার্টার ফাইনালে দুর্দান্ত খেলতে থাকা গ্রীসের কাছে হার, পরাজয়ের গ্লানী সইতে পারেননি জিদান। অবসর নিয়ে নেন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে।

২০০৬ এ আবার বিশ্বকাপ। কিন্তু এবার বাছাইপর্বেই জিদান বিহীন ফ্রান্স ভূগছিলো শুরু থেকে। এরপর তৎকালীন কোচ ডমেনেখের অনুরোধে জিদান অবসর ভেঙ্গে ফেরত আসেন এবং দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পান । আর বদলে যেতে থাকে ফ্রান্সের চেহারা। মূল পর্বের কোয়ার্টার ফাইনালে প্রবল পরাক্রমশালী ব্রাজিল কে হারায় ফ্রান্স। কারণ একটাই জিদানের সেই অতি মানবীয় এসিষ্ট, ফ্রি-কিক থেকে। আর সেমিফাইনালে পর্তুগালের সোনালী প্রজন্মকে হারাতে নিজেই গোল করেন জিদান। ফাইনালে জিদান খেলেন দূর্দান্ত। ১-১ গোলে সমতার ম্যাচে ফ্রান্সের পক্ষে গোলটী ছিলো তার ই করা। অতিরিক্ত সময়ে জিদানের দূর্দান্ত হেড বুফন যে কিভাবে ফিরালেন, সেটা আজও এক বিস্ময়। কিছুক্ষণ পরেই মাত্তারাজির সাথে জিদানের বাকবিতন্ডা হয়। শোনা যায় মাত্তারাজি জিদানকে তার বোন নিয়ে গালি দিয়ে তাকে প্রভোক করেছিলেন। ফলশ্রুতিতে জিদান মাথা দিয়ে মাত্তারাজির বুকে আঘাত হানেন এবং লাল কার্ড দেখে মাঠের বাইরে চলে যান। টাইব্রেকারে ত্রেজগে মিস করার কারণে ফ্রান্স বিশ্বকাপ হেরে যায়। তবে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল পান জিদান।
খেলোয়াড় হিসাবে জিদান ছিলেন দলের নেতা। বড় ম্যাচের নার্ভ বুঝতে পারতেন। ড্রিবল এ ছিলেন দূর্দান্ত। কিন্তু জিদান শুধু খেলোয়াড় হিসাবেই থেমে যাননি। ম্যানেজার হিসাবে তার রেকর্ড ঈর্ষনীয়। একই একাদশ নিয়ে বেনিতেজের আমলে মাদ্রিদ যেখানে হিমশিম খাচ্ছিল, সেই দলকেই এক সুতোয় গেঁথে অসামান্য সাফল্য আনা মুখের কথা না।

২০০২ এর ফাইনালে জিদানের সেই গোলে জয়ের পর রিয়াল পুরো এক দশক আর চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতেনি। জিদান মূল দলের দায়িত্ব (অন্তরবর্তীকালীন) যখন নেন তখন লীগে রিয়াল ১৩ পয়েন্ট পিছিয়ে। জিদান আসার পর গ্যাপটা চলে আসে ১ এ। লীগে বাকি ম্যাচগুলোয় বার্সা না হারাতে রানার্স-আপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় জিদান কে। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লীগ টাইটল ঠিকই জয় করে নেন জিদান একে একে বার্সা, বায়ার্ন মিউনিখ আর এথলেটিকো মাদ্রিদ কে হারিয়ে।
পরের মৌসুমে জিদান এবার অন্তরবর্তী কালীন নয়, মূল কোচ হয়ে। জিদান যে দলের কোচ, সে দলের আর কি লাগে? ফলাফল লীগ শিরোপা রিয়ালের ঘরে। আর তার সাথে যোগ করুন টানা ২য় বারের মতন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়। ফাইনালে এবার জুভেন্টাস বধ। আর সেটা করতে গিয়ে একে একে হারিয়েছেন বায়ার্ন, এথলেটিকোর মতন ক্লাবকে।

কোচ হিসাবে জিদানের একটা বড় গুন হলো তিনি জহুরী চেনেন। যেমন নিজ নেটোয়ার্ক কে কাজে লাগিয়ে দলে ফিরিয়েছেন ইস্কো আর ভারানে কে। ভারানে কে চেয়েছিল ম্যান ইউ এর ফার্গুসন। কিন্তু জয় হয় জিদানের ই। তাছাড়া ধরেন মার্সেলো কে কাজে লাগানো। রোনালদো কে ম্যানেজ করা। কাজে লাগানো করিম বেনজামোর অসাধারণ বল হোল্ডিং এবিলিটিকে। জিদানের আরেকটা বড় গুণ হলো পুরো মৌসুম জুড়ে সব খেলোয়াড় কেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলান তিনি। ফলাফল গ্যারেথ বেল বা রোনালদো না থাকলেও রিয়াল এর বি টীম খেলে যায় রিয়ালের মতন। অথচ যাদুকর মেসি থাকা স্বত্ত্বেও এক নেইমার কে হারিয়ে বার্সা নিজেকে খুঁজে ফিরছে।

জিদান ই এই গ্রহের একমাত্র যে কিনা খেলোয়াড় হয়ে, এসিস্ট্যান্ট কোচ হয়ে এবং মূল কোচ হয়ে- এই তিন ভূমিকাতেই চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতা ফুটবল দেবতা। তার সাথে বিশ্বকাপ জয় আর একবার বিশ্বকাপের রানার্সআপ।

আর কি কোন সন্দেহ আছে পেলে- ম্যারাডোনার পর কার নাম উচ্চারিত হবে ফুটবল বিশ্বে।

সুত্রঃ
1) https://successstory.com/people/zinedine-yazid-zidane
2) https://www.biography.com/people/zinedine-zidane-9541232
3) https://www.theguardian.com/football/2004/apr/04/sport.features
4) https://www.thefamouspeople.com/profiles/zinedine-zidane-5241.php
5) http://www.football-history.net/who-is-who/z/zinedine-zidane.htm#biography
6) https://en.wikipedia.org/wiki/Zinedine_Zidane
7) www.goal.com
8) www.realmadrid.com

লেখাঃ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শাওন,
তারিখঃ ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ (বাংলাদেশ সময়)।

২৩৬ বার দেখা হয়েছে

৩ টি মন্তব্য : “জিদান – কিং অফ লিজেন্ডস”

  1. জিহাদ (৯৯-০৫)

    আপনার লেখা দেখে মনে পড়লো বহু বছর আগে আমিও জিদানকে নিয়ে একটা লিখা লিখসিলাম।
    http://www.cadetcollegeblog.com/zihad/25496
    আর বাংলা উইকিতে জিনেদিন জিদান আর্টিকেলের সিংহভাগ লেখা আমার :P

    জিদান আমার খুব প্রিয় খেলোয়াড়। বুঝেনই তো


    সাতেও নাই, পাঁচেও নাই

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য