random header image

আমার দেখা ‘৭১ এর মুক্তি যুদ্ধ।(দশ)

১৯৭১ এর শেষ কয়েকটি মাস।আবার ঢাকা শহর।  কোথাও কোন ঝামেলার চিঁহ্ন মাত্র নেই ।চারিদিক  জীবনযাত্রা সব স্বাভাবিক।  চোখের কোনে কিছু ধরা দিয়েও দেয়না। চারিদিকের  মাত্রাতিরিক্ত স্বাভাবিকতা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কে শুধু সাবধান করে দেয়, কোথায়ও বড় কোন  ঘাপলা আছে, বেশ বেখাপ্পা লাগে।দেশ বিদেশে এত কানাঘুষা আর এখানে ‘”সব কুছ ঠিক হ্যাঁয় ” এ হতেই পারেনা। তবে মানুষ গুলিকে খুব নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করলে সব প্রাণহীন দম দেয়া পুতুল “জম্বি” বলে মনে হয়।সব জু জুর ভয়ে কেমন যেন স্বতস্ফুর্ত নয়। বেসুরো -সেতারের ছেড়া তাঁর জোড়া দেয়ার মত।

আমাদের ঠিকানা হল মেঝ চাচার বাসায়।ধানমণ্ডির  জিগাতলা মিষ্টির দোকানের পাশে। বাবার পিঠা পিঠী ভাই। আব্দুল করিম। ‘৬৯ থেকে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, জিগাতলা ব্রাঞ্চের ম্যনেজার। হঠাৎ খোল নলচে পরিবর্তনের কারনে একটু বেশি উগ্র ধার্মিক ! না, অন্যদের মত পাকিস্তান সেনাদের ভয়ে রাতারাতি বনে যাওয়া হুজুর নয়।জল বসন্তে স্ত্রী-কন্যা বিয়োগে এই বৈরাগ্য।

আমরা ছোট বড় সকলেই খুবই কষ্টে ছিলাম ওই বাসায়।ভোর সাড়ে চারটায় উঠতে হতো ।জামাতে ফজর নামাজ আদায় করে তাঁর সাথে কোরান তেলোয়াত, সাতটায় দুইটা ‘আটার রুটি’ ও ভাজি।সাথে এক বাটি চা ও ‘রুমা বেকারির টোস্ট’।সাড়ে আঁটটায় উনি ব্যাংকে চলে যেতেন। ‘পিলখানা ই.পি.আর ‘ গেইট এর পার্শেই ব্যাংক । সারাদিন পাক আর্মি অফিসারদের সাথে গল্প-সল্প। চোস্ত উর্দু বলতেন, জমজমাট আসর আর চা নাস্তার আড্ডা বসতো ব্যাংকের ভিতরে।অনেকের সাথে আমারও মনের কোনে কিঞ্চিৎ ঘৃণা ভাব উথলে উঠতে চাইত তাঁর এই  পাক আর্মি অফিসারদের সাথে উঠাবসার কারনে।

কিন্তু একদিন রাতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অনেক বড় বিশ্ময়, সারা দিনের যোগাড় করা সমস্ত “ইনফরমেশন” যখন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন ব্যাংকের মালীকে। আর্মি মুভমেন্ট, ডিপ্লয়মেন্ট সম্বন্ধে সংগ্রহীত ছোট ছোট সমস্ত খবরা খবর। শুধু তাই নয়, নিজের জীবন বাজি রেখে ব্যাংকের ভোল্টে সযতনে জমা রাখতেন ঢাকার ‘ ক্রেক কমান্ডোদের হাতিয়ার ‘ ।মালীর ফুল গাছ নিড়ানি ‘কাস্তে-খুন্তির থলেতেই’ পার হত গ্রেনেড, রিভলবার ও গুলির ম্যাগাজিন।আলোর ঠিক নিচেই যেমন থাকে অন্ধকার, পিলখানার হাজারো আর্মির নাকের ডগায় তেমনি সুদৃঢ় ‘মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের’ (বর্তমানে জনতা ব্যাংকের) ভোল্টে গচ্ছিত থাকত ওদেরই মৃত্যু বাণ।হাজারো আব্দুল করিম সেই সময় জীবন বিপন্ন করে দেশ মাতার সেবা করে গেছেন।”বীর” খেতাবতো দুরের কথা, মুক্তি যোদ্ধা হিসাবে যারা নাম লিখানোর কথাও কখনো কল্পনায় আনেনি। তাঁদের অনেকেই আজ জীবিত নেই, কিন্ত সেই বিদেহী বীরদের আত্মার প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম।

সেজ চাচা, গ্রামের চেয়ারম্যেন আব্দুর রহিম সবসময়ই অনেক মজার মানুষ।আনন্দ, হৈ হল্লর করতে সব সময়ই পছন্দ করেন। শুধু এখন বেশ বেকায়দার মধ্যে আছেন।একেতো আর্মিদের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে বড় ভাইএর বাসায়  পালিয়ে আছেন, তার উপর এইরকম মানসিক যন্ত্রণা। একদিন ‘মেঝ’ ব্যাংকে যাওয়ার পরপরই আমাকে জিগ্যেস করলো , কি চাচা মিয়া, যাবা নাকি আমার সাথে? কোথায়, কেন, না শুনেই এক লাফে রাজি। জামা জুতো পরে চললাম চাচার সাথে। প্রথম গন্তব্য নবাবপুর। এক বন্ধুর সাথে দুপুর পর্যন্ত আড্ডা দিলেন।ঘুশ হিসাবে ‘ নবাবপুর এর বিখ্যাত  “খাশির চাপ, মোগলাই ও ক্ষীরি কাবাবে” পেট ঠেসে, তিনটার শোতে ছবি দেখতে গেলাম।আমার জন্যতো ইদের মতো খুশি। কি ছবি নাম মনে নাই, ‘ওয়াহিদ মুরাদ ও জেবা’ ছিল সম্ভবত নায়ক-নায়িকা । একটা গানের কলি এখনো কানে ভাসছে ঃ একেলেনা যানা, হামে ছোড়ে পের ক্যে, তুমহারে বিনা হাম ভালা ক্যা……

ছবি শেষে আরেক রাউন্ড পেট পূজা সেরে নবাবপুর থেকে সূতার  মালায় গাঁথা “তীর মার্কা” বাংলা সাবান কিনে ফুর ফুঁরে মেজাজে হাওয়ায় ভেসে ফিরছিলাম। রাত মনে হয় আঁটটাও হয়নি। রাস্তা ঘাট কেন জানি সম্পূর্ণ ফাঁকাই মনে হচ্ছে। রেস কোর্স, শাহ বাগ  এলাকা কেমন জানি থমথমে ভাব। শাহাবাগের দোকান গুলি পেড়িয়ে ইলিফেন্ট রোডের দিকে আসতে  এক্ষণ যেটা আজিজ মার্কেট , এর পরেই একটা ইলেকট্রিকের সাব স্টেশান ছিল, এখান পর্যন্ত রিক্সা আস্তেই দুনিয়া আমাদের মাথায় ভেঙ্গে পড়লো বুঝি।

রিক্সা ওয়ালা , চাচা বা আমি, কিছু বুঝে উঠার আগেই মনে হোল দুপাশের অন্ধকার থেকে প্রেতাত্মা এসে আমাদের  পীচ ঢালা কালো রাস্তায় চেপে ধরল। সম্বিত ফিরে পেলো ওদের আলো জ্বলে উঠার পর। সম্পূর্ণ ” কমব্যাট ড্রেস “,মাথায় জঙ্গল লাগানো হেলমেট সজ্জিত কম্যান্ডো দল আমাদের দু পাশ থেকে রাস্তায় প্যেরে ফেলেছে।  সেকেন্ডের মধ্যে তন্ন তন্ন করে দেহ তল্লাশি শেষে       ” ডান্ডি কার্ড ” (আইডেন্টি  কার্ড) দেখে, কোথা থেকে আসছি জেনে পরে ছাড়া পেলাম। ভাগ্যিশ চাচা সিনেমার টিকিটের অংশ রেখে দেয়াতে, ঐটা দেখানোতে ছাড়া পেলাম। শুনলাম ঐ বিকালে ও সন্ধ্যায় হোটেল ইন্টার কণ্টীনেন্টাল (বর্তমানে শেরাটন) এর সামনে বোমা বিস্ফোরণ ও ইলেকট্রিক সাব ইষ্টিশনটায় বোমা মেরে ক্ষতি সাধন করেছে আমাদের বিচ্ছুরা !

কোনরকমে বাসায় পৌঁছানোর পর শুরু হোল আরেক উপ্যক্ষ্যান ! আব্দুল করিম মিয়া সাহেব জানতেন আগে থেকেই আজকের কম্যান্ডো একশ্যান আর প্লান প্রোগ্রাম।তাই বিকাল থেকে ঘর-বাহির করেছেন হাজার বার, আমাদের ফিরার অপেক্ষ্যায়। সন্ধ্যের পর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে ছিল যে পাক সেনারা আমাদের ধরে নিয়ে গেছে।জিবনের সমস্ত বকা ঝকা হয়তো সেঝ চাচাকে একবারই  হজম করতে হলো, বিশেষ করে আমাকে সাথে নেয়ার জন্যে।এখনো ক্ষ্যপানোর ইচ্ছা নিয়ে ওঁর সামনে আমি  মাঝে সাঝে গেয়ে উঠিঃ একেলেনা যানা, হামে ছোড়ে পের ক্যে, তুমহারে বিনা হাম ভালা ক্যা……

(চলবে)

পুনশ্চ ঃ আজ আমার জীবনের একটা গর্বের দিন। “ফৌজিয়ান” ওয়েবে উপরুক্ত কাহিনী প্রচারিত হওয়ার পর ১১ তম ব্যচের  সুনামধ্যন্য মুক্তি যোদ্ধা ডঃ শাহারিয়ার হুদা লিখেছেনঃ  Shahariar Huda Two Ofns AFMA Harris (11) and Late Badi bhai (07) were in the groups involved with the operations you referred to. Thanks for your wonderful write ups.

একজন “ফৌজিয়ান” হিসাবে আমি ওঁদের জন্য গর্বিত। আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

২ votes, average: ৫.০০ out of ৫২ votes, average: ৫.০০ out of ৫২ votes, average: ৫.০০ out of ৫২ votes, average: ৫.০০ out of ৫২ votes, average: ৫.০০ out of ৫ (ভোট, ৫.০০/ ৫)
রেটিং করার জন্য আপনাকে রেজিস্টার্ড সদস্য হতে হবে
Loading ... Loading ...
প্রকাশিত লেখা বা মন্তব্য সম্পূর্ণভাবেই লেখক/মন্তব্যকারীর নিজস্ব অভিমত। এর জন্য ক্যাডেট কলেজ ব্লগ কর্তৃপক্ষকে কোনভাবেই দায়ী করা চলবেনা।

১০ টি মন্তব্য

  1. ফরিদ (৯৫-০১)
       অক্টোবর ৫, ২০১১ at ১১:০১ পুর্বাহ্ন |

    অসাধারণ দেশ প্রেম। চাচাকে সালাম

    জবাব দিন

    আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)
        অক্টোবর ৫, ২০১১ at ৫:৩১ অপরাহ্ন |

    এঁরা আমাদের কাছে “দেশ প্রেমিক” ওদের কাছে গাদ্দার! আমাদের দেশ এখন ‘অন্য দেশ প্রেমিকে’ ভরপুর, তাই ওঁরা (বাবা/চাচার দল) বর্তমানদের জন্য জায়গা খালি করে দিয়ে পরাপারে সম্ভবত ভালই আছেন। আল্লাহ ওঁদের জান্নাতবাসী করুন।

    জবাব দিন

  2. সামিয়া (৯৯-০৫)
       অক্টোবর ৫, ২০১১ at ১১:৪২ পুর্বাহ্ন |

    আপনার মেঝ চাচার মত মানুষদের সবার মনে রাখ উচিৎ। আজকাল একটা জেনারালাইজড মানসিকতা খুব লক্ষ্য করি, দাঁড়ি টুপি থাকলেই, পাঞ্জাবী পাজামা পড়লেই তাঁকে রাজাকার হিসেবে অভিহিত করা, নিদেন পক্ষে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা। কিন্তু এরম কতশত মানুষ যে আমাদের জন্য নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের পথের কাঁটা পরিষ্কার করে দিয়েছেন…এটা ভাবলেও আমার শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে।
    আসলে দাঁড়ি টুপিঅলা রাজাকারেরা এদেশের মানুষের মনে যে সন্দেহটা ঢুকিয়েছে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর।
    ভাইয়া লেখাটা বরাবরের চেয়েও আরও গুছানো হয়েছে।

    জবাব দিন

    আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)
        অক্টোবর ৫, ২০১১ at ৫:৪২ অপরাহ্ন |

    ” ধর্ম ভীরুতা “, ” ধর্মান্ধতা ” আর ” ধর্ম ব্যবসায়ী ” কখনো সমার্থক নয়! সত্যি দুঃখজনক কিন্তু তোমার কথা একদম সত্যি ! শুধু এদেশে নয়, ভারতীয় বাংলা টিভি থেকে যুক্ত রাশ্ট্র পর্যন্ত টুপী / দাড়ি মানেই মৌলবাদী, ব্যপারটা হাস্যকর !!

    একনিষ্ঠ পাঠক হিশাবে তোমাকে ধন্যবাদ ।

    জবাব দিন

  3. রাব্বী (৯২-৯৮)
       অক্টোবর ৫, ২০১১ at ১০:১১ অপরাহ্ন |

    এবারের পর্বের লেখা বেশ গোছানো। পড়ছি।

    জবাব দিন

  4. রুম্মান (১৯৯৩-৯৯)
       অক্টোবর ৬, ২০১১ at ১২:৫০ পুর্বাহ্ন |

    আজীজ ভাই,
    যে বাবা আর চাচাকে পেয়েছেন জীবনে তা নিয়ে গর্ব করেই তো জীবনটা পার করে দিতে পারবেন । ওনাদেরকে ::salute::

    জবাব দিন

    আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)
        অক্টোবর ৬, ২০১১ at ৯:২৫ অপরাহ্ন |

    কোন লাভ নেই রুম্মান! ওঁরা আসলে ‘ ডাইনোসর ‘ পৃথিবী থেকে অবলুপ্ত একটি প্রজাতি। ওদের তেল জ্বালিয়ে এক আধ প্রজন্ম আমরা হয়তো দামী গাড়ী হাঁকাবো, ঠাণ্ডা এয়ার কুলে বসে। তার পর সব শেষ…। যাদুঘরে ওঁদের কীর্তি গাঁথা পরে বাচ্চারা হেসে বলবেঃ কি বোকা ছিল বুড়ো গুলি !!!!!!!

    জবাব দিন

  5. আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)
       অক্টোবর ৭, ২০১১ at ৫:১৪ অপরাহ্ন |

    পুনশ্চ ঃ আজ আমার জীবনের একটা গর্বের দিন। “ফৌজিয়ান” ওয়েবে উপরুক্ত কাহিনী প্রচারিত হওয়ার পর ১১ তম ব্যচের সুনামধ্যন্য মুক্তি যোদ্ধা ডঃ শাহারিয়ার হুদা লিখেছেনঃ Shahariar Hudaঃ Two Ofns AFMA Harris (11) and Late Badi bhai (07) were in the groups involved with the operations you referred to. Thanks for your wonderful write ups.

    একজন “ফৌজিয়ান” হিসাবে আমি ওঁদের জন্য গর্বিত। আমার সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

    জবাব দিন

  6. নূপুর কান্তি দাশ (৮৪-৯০)
       অক্টোবর ১৪, ২০১১ at ১০:১৭ পুর্বাহ্ন |

    অসাধারণ বর্ণণা আজিজ ভাই।
    মেজ চাচার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসছে।
    উনি কি বেঁচে আছেন?

    জবাব দিন

    আজিজুল (১৯৭২-১৯৭৮)
        অক্টোবর ১৫, ২০১১ at ১:০৮ অপরাহ্ন |

    না, উনি বেঁচে নেই।গত বছর উনি ইন্তেকাল করেন। সততার জন্যে ‘জনতা ব্যাংক’ এর এম,ডি স্কোয়ার্ডে ” আব্দুল করিম” ছিলেন অন্যায়কারীদের জন্যে একটি ” ত্রাস “! এখনো পুরানো ব্যাংকারা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন, যারা ওঁকে চিনতেন।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন :

আপনার ই-মেইল ঠিকানা কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা শেয়ার করা হবেনা। দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা। আবশ্যিক তথ্যগুলো * চিহ্নিত করা আছে।

*
*
:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »


(বাংলায় টাইপ করতে ctrl+g চাপুন। একটি শব্দ লেখা শেষে স্পেস বার চাপুন। তাহলেই ইংরেজী থেকে শব্দটি বাংলায় রুপান্তরিত হবে।একই শব্দের একাধিক বানান অপশন দেখতে শব্দটির উপরে মাউস রেখে ক্লিক করুন)
Ekushey Inline virtual Bangla keyboard