[কলেজে আমাদের দুইটা গ্রুপ ছিল- এক পার্টি ইন্টারের পর ফৌজিতে যাইব আর এক পার্টি যাইব না...আমি ছিলাম দ্বিতীয় দলে...তো আমরা বিজ্ঞ প্রতিপক্ষকে পঁচানোর জন্য বিভিন্ন কিছু করতাম...এর মধ্যে একটি ছিল গল্প বানানো...আজকের এই গল্পটি মূলটি হতে একটু আলাদা হলেও থিম এক...সময় বিবর্তনে ও কাহিনীর প্রয়োজনে হালকা রঙের প্রলেপ টানা হয়েছে মাত্র...তবে একটা কথা, খোদার কসম, কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে গল্পটি লেখা হয় নি...]
রাত দশটা আট। সোহাগ বাসের কাউন্টার, মালিবাগ। ঈদের দুই দিন আগে বলে ভীড় একটু বেশীই। কাউন্টার ভর্তি নানান বয়সী মানুষ…কারও গন্তব্য খুলনা, কারও চট্টগ্রাম কারও বা সিলেট। কেউবা এসেছে প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে।
‘কোচ নম্বর ১২৪, ঢাকা টু খুলনা…কোচ নম্বর ১২৪…’- ঘোষনাটা শোনা মাত্র কিছু লোকের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিল। এক দম পিছনে বসে থাকা দুইজন যুবকও উঠে দাঁড়াল। দুজনের হাতেই মাঝারি সাইজের হ্যান্ডব্যাগ, পরনে টি-শার্ট এবং জিন্স। হাঁটা-চলার মধ্যে একধরনের ড্যাম কেয়ার কিন্তু চটপটে ভাব আছে। বাসের সুপারভাইজার তাদেরকে ‘আপনারা কি এই বাসের?’-প্রশ্ন করতেই উত্তর না দিয়ে দুজনে ঠান্ডা চোখে তার দিকে তাকাল…সুপারভাইজার আর কিছু না বলে সরে তাদেরকে ওঠার জায়গা করে দিল…এরপর ধীরে ধীরে সবাই ওঠার পর দশটা আঠার মিনিটের দিকে বাস খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা করল।
বাস আরিচা ঘাট পার হয়েছে এক ঘন্টার বেশি হয়ে গেছে…বেশির ভাগ যাত্রীই গভীর ঘুমে বিভোর। শুধু অন্ধকার চিরে টানা চলছে নৈশকালীন বাসটি। ফরিদপুর ও মাগুরার মাঝামাঝি এসে হঠাৎ করে বাস থেমে গেল…বাসের পিছন থেকে লোকজন ‘কি হয়েছে?’ প্রশ্ন করতেই ড্রাইভার জানাল রাস্তার মাঝে গাছের ডাল পড়ে আছে, না সরানো পর্যন্ত বাস চালানো যাবে না…কথাটা শোনা মাত্রই যুবক দুজন সজাগ হয়ে গেল, উঠে দাঁড়াতেই বাসের পিছন থেকে আওয়াজ থেকে আওয়াজ এল, ‘খবরদার, কেউ জায়গা ছেড়ে নড়বেন না, যে উঠবে তার লাশ ফেলে দেব’…কথাগুলো বলতে বলতে এক হাতে মোবাইল অন্য হাতে একটা পিস্তল নিয়ে একেবারে পিছনের সিটের যাত্রীটি সামনে আসতে লাগল। সবাই বুঝল, এই লোক ডাকাত দলের সদস্য। ইতোমধ্যে চার-পাঁচ জনের মূল ডাকাত দলটি বাসটিকে ঘিরে ধরেছে। ডাকাত দলের যে সর্দার সে বাসে উঠে জানাল সবাই যদি সহযোগিতা করে তবে কোন রক্তপাত ছাড়াই তারা তাদের কাজ সম্পন্ন করে চলে যাবে…ইতোমধ্যে বাসের সবার ঘুম ভেংগে গেছে, যে দুই তিন জন মহিলা যাত্রী ছিলেন তারা তো কান্নাই শুরু করে দিলেন।
ডাকাত সর্দার কড়া গলায় ধমক দিয়ে তাদের কান্না থামিয়ে দিল আর বাসের ড্রাইভার এবং সুপারভাইজারকে বাসটাকে রাস্তার পাশের স্কুল মাঠে পার্ক করে চুপচাপ বসে থাকার নির্দেশ দিয়ে বাকি যাত্রীদের বলল,
-’আমার লোক এক এক করে সবার কাছে যাবে, আপনারা যার যার মোবাইল, গহনা, টাকা-পয়সা দিয়ে দেবেন…কোন চালাকি করার চেষ্টা কেউ করবেন না। আর কেউ যদি বীরত্ব দেখানোর চেষ্টা করেন, ফল হবে ভয়াবহ!!!’
আমাদের ‘সেই দুই যুবক’ কিন্তু এতক্ষণ চুপচাপ সব কিছু শুনে যাচ্ছে। তাদের সিট একেবারে সামনে হবার কারনে ডাকাত সর্দারের খুব কাছাকাছি তাদের অবস্থান। যুবকদের একজন মনে মনে পুরো পরিস্থিতিটা যাচাই করছে…ডাকাতদের সংখ্যা মোট ছয়…আগ্নেয়াস্ত্র মাত্র দুটি, একটি সর্দারের কাছে-অন্যটি যাত্রীর বেশে থাকা ডাকাতটির কাছে, যে কিনা এই মুহূর্তে অন্য আরেকজন ডাকাতের সাথে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে ‘কালেকশন’ এ ব্যস্ত। কোনমতে যদি একটি অস্ত্র কেড়ে নেয়া যায়…যুবকদের একজন হঠাৎ করে উঠে দাঁড়াল, দুই হাত উপরে তুলে চোখ-মুখে ভয়ের অভিব্যক্তি ফুটিয়ে সর্দারকে বলতে লাগল,
-’প্লিজ আমাদের মারবেন না, আমাদের যা আছে নিয়ে যান…এই যে মোবাইল, ঘড়ি, ওয়ালেট…প্লিজ মারবেন না…প্লিজ’- বলতে বলতে সে ধীরে ধীরে সর্দারে দিকে এগোতে লাগল। সর্দার কিছু বলার আগেই যুবকটি একেবারে কাছে চলে গেল…গিয়ে সর্দারের পায়ের সামনে বসে সুর করে একই রকম অনুনয় বিনয় করতে লাগল…এদিকে ‘কালেকশন’ পার্টিও একেবারে সামনের দিকে চলে এসেছে…যুবকদের সিটের কাছাকাছি আসতেই অন্য যুবকটিও উঠে দাঁড়াল…তার দাঁড়ানো দেখে পিস্তলধারী অন্য ডাকাতটি তার মাথায় পিস্তল ধরে সিটে বসার নির্দেশ দিল…ঠিক এই মুহূর্তটার অপেক্ষায়ই যুবকদ্বয় ছিল…যিনি ডাকাত সর্দারের পায়ের কাছে বসে ছিলেন তিনি হঠাৎ করে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে পিস্তলধরা হাত চেপে ধরলেন এবং হাঁটু দিয়ে সর্দারের উরুসন্ধিতে গুঁতো মেরে দিলেন…চোখের পলকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে সর্দারে গলা চেপে ধরে গমগম কন্ঠে বলে উঠলেন,
-’পিস্তল ফেলে দাও, নইলে তোমার সর্দারের মাথা উড়িয়ে দেব…’
ঘটনার আকস্মিকতায় চমকে গেলেও অন্য পিস্তলধারী দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
- ‘পিস্তল তুমি ফেল, তা না হলে তোমার সংগীকে আমি গুলি করব…’
যুবক দেখল বাসের ভেতর গোলাগুলি হলে যে কেউ জখম হতে পারে, তাই সে সর্দারের মাথায় পিস্তল ধরা অবস্থায় তাকে টানতে টানতে বাসের নিচে নামাল…অন্য ডাকাতগুলো তো ভয়েই অস্থির…বোঝা গেল তারা কেউ প্রফেশনাল নয়…যাইহোক, যুবককে নামতে দেখে অন্য পিস্তলধারীও অপর যুবকের মাথায় পিস্তল ধরে তাকে নিয়ে বাস থেকে নামল…এবং বলল,
-’আমি আবার বলছি, পিস্তল ফেলে দাও…তা না হলে তোমার বন্ধুর মরনের জন্য তুমিই দায়ী থাকবে…আমি ওর মাথা ফুটো করে দেব…’
-’মাথায় গুলি করবে???’- বলে যুবক হাসতে শুরু করল…দেখাদেখি মাথায় পিস্তলধরা যুবকও হাসতে লাগল…!
পাগলের মত হাসতে হাসতেই মৃদু আলোয় দুই যুবকের মধ্যে চোখের ইশারায় ভাব বিনিময় হয়ে গেল…মাথায় পিস্তলধরা যুবকটি ঝুঁপ করে বসে পড়ল এবং অন্য যুবকটি সাথে সাথে গুলি করল…যাত্রীবেশী ডাকাতের হাতে গুলি লাগল…তবে তার আগে স্রেফ রিফ্লেক্সের বশে তার চালানো গুলি বসে পড়া যুবকটির মাথা ছুঁয়ে চলে গেল…
দশ মিনিট পরের ঘটনা। সব ডাকাতদের আচ্ছা করে গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে…তবে হাতে গুলি লাগা ডাকাতটিকে বাঁধা হয়নি, প্রচুর রক্তপাত হয়ে তার অবস্থা কাহিল…প্রাণে বাঁচলেও সারাজীবন তাকে এক হাত নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে বলে মনে হচ্ছে…পুলিশকে খবর দেয়া হয়েছে…হাইওয়ে পুলিশকেও বলা হয়েছে…যে কোন মুহূর্তে তারা চলে আসবে…আপাতত বাসের সবাই মিলে দুই যুবককে ঘিরে ধরে কথা বলছে…যুবকদের এক জনের মাথায় হাল্কা ব্যান্ডেজ, গুলিটা মাথা ছুঁয়ে যাবার সময় হাল্কা আঁচড় কেটে গেছে…এক মহিলা যাত্রী তার ব্যাগ থেকে শাড়ি বের করে সেটা থেকে কাপড় ছিড়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে…
-আপনাদের ভাই সাহস আছে…কি ভাবে ডাকাতগুলোকে ধরলেন…আমার তো এখনও ভেবে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে…!!! – এক যাত্রী বললেন।
-আচ্ছা, ঐ ডাকাত আপনার মাথায় পিস্তল ধরল তারপরও আপনার একটুও ভয় লাগল না??? গুলিটা যদি আর একটু এদিক-ওদিক হত???- অপর এক যাত্রীর প্রশ্ন।
এবার এক যুবকের হাসিমাখা জবাব,
-আমি ক্যাপ্টেন হায়দার…আর ও ক্যাপ্টেন আসিফ…আমরা কোর্সমেট, সে কারনেই আমাদের বোঝাপড়া অনেক ভাল…আর ডাকাতটি যদি পিস্তল মাথায় না ধরে অন্য কোথাও ধরত তা হলে ওদের আটকানো সম্ভব হত না…
-মানে????- যাত্রীদের সমস্বরে অবাক প্রশ্ন।
-’বাদ দিন, আপনারা বুঝবেন না’- মুচকি হেসে দুই যুবকের উত্তর!
এমন সময় পুলিশের সাইরেন শোনা গেল। যুবক দু’জন একজন আরেক জনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘কংগ্রেট্স, ম্যান’…
এরপর দুজন একসাথে ‘জয়তু, গুটনা’ বলে উচ্চস্বরে হেসে উঠল…!!!



৩০ টি মন্তব্য
মজা পাইসি।
[ জবাব দিন ]
নাম দুইটা চিনা চিনা লাগল।
জয়তু গুটনা।
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
যাক, কথাশিল্পী এখন সুন্দর কইরা লিখা শুরু করসে!
মাশাল্লাহ!
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
মজা লাগলো
[ জবাব দিন ]
ঝাক্কাস।
[ জবাব দিন ]
ক্যাপ্টেন জুনায়েদ ভাই….ইউ আর জাষ্ট অসাম..
[ জবাব দিন ]
মজাক পেলুম।
[ জবাব দিন ]
খালি হাটুতে ধরলেই হইসিলো কাজ… মজা পাইলাম…
[ জবাব দিন ]
ডাকাতগুলা তো ঠিকই ‘আঘাত’ পাইল। একটা তো রীতিমত ‘গুলিবিদ্ধ’।
জুনা, গল্প ভাল হইসে।
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
আমার কাল বিসিএস পরীক্ষা আছে…সিট পড়ছে বাসা থেকে ২০০ কি মি দূরে…এখন যাইতেছি বন্ধুর বাড়ি…পথ এগিয়ে থাকার জন্য…কাল আপনেগো সাথে দেখা হইব ইনশাল্লাহ্!!! আপাতত খোদা হাফেজ…
[ জবাব দিন ]
তুইও বিসিএস দিতাছোস নাকি!
সারাদিন সিসিবিতে পিরা থাইকা প্রিপারেশন কি নিছোস কে জানে!
এনিওয়েজ, বেস্ট অব লাক। ভালা মতো দিস।
[ জবাব দিন ]
exam sheet-এ আবার খালি প্রশ্নপত্রের কমেন্ট মাইরা চইলা আসিস না।
বেস্ট অব লাক। ‘জানি তুমি পারবেই’ …
[ জবাব দিন ]
আমার বউ কইলো ফোনে কোয়েশ্চেন নাকি আবার আউট হইছে।
আপডেট জানায়েন। পরীক্ষার জন্য শুভকামনা।
[ জবাব দিন ]
যারা আমার বিসিএস এর জন্য দোয়া করলেন, তাদের জন্য খারাপই লাগছে…কতগুলা দোয়া নষ্ট হইল…
আমার প্রিলিতে হইলে বুঝতে হবে দুনিয়ায় আসলেই ইনসাফ নাই…
[ জবাব দিন ]
জুনাতো দিনকে দিন দুর্ধর্ষ লেখক হয়া উঠতাছোসরে
[ জবাব দিন ]
হবে ‘জুনাতো দিনকে দিন দুর্ধর্ষ লেখক হয়া ‘গজায়া’ উঠতাছোসরে’
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
সব বর্তমান ও ভবিষ্যত (আমার ও মুস্তাকীম এর মত) হাটুদের প্রতি আহবান
” নিরাপদ হাটু চাই”
[ জবাব দিন ]
প্রচুর রস আপনার।
[ জবাব দিন ]
ভালো হইছে
।
??
আরও আছি নাকি এইরকম স্টকে
[ জবাব দিন ]
সায়েদ ভাই, স্টক যাই হোক জীবন তো একটাই…আমারে মিয়া অকালে মারবার চান নাকি???
[ জবাব দিন ]
আমাদের কলেজে এই গল্পের অন্য একটা ভার্সন চালু ছিল
।
।
সেখানে নাইট কোচের পরিবর্তে ছিল “পাগলা গারদ” আর হাঁটুর জায়গায় ছিল “পশাচৎদেশ”
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
কবীর,
ভালো লাগছে…
[ জবাব দিন ]
আয়-হায়! আপনি এই লেখা পড়ছেন???
শরমিন্দায় পইড়া গেলাম…
[ জবাব দিন ]
আরে পাগল… শরমিন্দার কি হইছে?
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]