বলের বদলে গ্রেনেড (১০ম পর্ব)

আগের পর্বগুলোঃ

১৯।

কামদেবপুর গ্রাম, মেহেরপুর মহকুমা।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যে কোন দিন আক্রমণ করতে পারে এই ভয়ে বেশিরভাগ পুরুষ মানুষই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে। যারা রয়ে গেছে, তাদের আসলে যাবার আর কোন জায়গা নেই কিংবা অন্যত্র সরে যাবার মতন শারীরিক সক্ষমতা নেই। অবশ্য সোলায়মান, রহমত এবং মফিজ-যারা কিনা বর্তমান ‘গণ্ডগোল’ এর বিরুদ্ধে, তারা উলটো অধীর আগ্রহে পাক বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করছে।

অবশেষে ২৮ সেপ্টেম্বর দুপুর নাগাদ পাক বাহিনী গ্রামের একেবারে উপকণ্ঠে দু’টি জিপে করে এসে পোঁছল। বেলুচ রেজিমেন্টের এই দলটি বেশি বড় নয়, কমান্ডিং অফিসার একজন ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেন সরফরাজ গ্রামের একমাত্র পাকা স্কুল ঘরের সামনে একটি চেয়ার পেতে বসে তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলো,
-সাব শালে বাঙ্গাল কুত্তো কো ঢুন্ডো অর মার ডালো!

নির্দেশ পেয়ে সৈন্যরা হৈ হৈ করতে করতে এগিয়ে গেল। পরবর্তী ৪০ মিনিট ধরে গ্রামের উপর যেন ঝড় বয়ে গেল। দূর থেকে সৈন্যদের হাঁক-ডাক, চিৎকার, গুলির শব্দ, কান্নার শব্দ শোনা গেল। বেশ কয়েকটি ঘরে ওরা আগুনও ধরিয়ে দিল। ফলে, দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুরো গ্রাম ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল।

সৈন্যরা যখন ধ্বংস-যজ্ঞ চালাচ্ছিল ক্যাপ্টেন সাহেবের খেদমতে উক্ত তিনজন যেন উঠে পড়ে লাগল। প্রথমেই একজন গাছ থেকে কচি ডাব পেরে তার তৃষ্ণা মেটাল। এরপর অন্য আরেকজন দ্রুত পুকুরে জাল ফেলে ইয়া বড় বড় কয়েকটি রুই মাছ ধরল। মফিজ তো এরই মধ্যে একটি ছাগল জবাই করে ফেলল। উল্লেখ্য, ছাগলটি ওর নিজের ছিল না।

বেশ খানিকক্ষণ পরে সৈন্যরা স্কুল ঘরের কাছে ফিরে এলো। ক্যাপ্টেন সরফরাজ ডাবের পানি পান করতে করতে জিজ্ঞাসা করল,
-মার ডালা সাবকো?
-জ্বি সাব, লেকেন বহুত তাকলিফ হুয়া। হামকো বহুত ভাগায়া!
-কিতনে থে?
-সাব ছে থা।
-লিকেন ইয়ে লোগনে তো কাহাথা কামছে কাম পানারা-বিশ হোগা!
-ক্যায়া বাত কার রাহে সাব, ইতনি সারে কুত্তে, ও ভি এয়সি ছোটি সি গাঁও মে??

ক্যাপ্টেন সাহেবের পুরো দশ সেকেন্ড লাগল পুরো ব্যাপারটি উপলব্ধি করতে। গাধার বাচ্চা সৈনিকের দল আক্ষরিক অর্থেই কুকুর মনে করেছিল, অথচ ‘বাঙাল কুত্তে’ বলতে ক্যাপ্টেন সরফরাজ আসলে বাঙালি পুরুষদের কথা বলতে চেয়েছিল!! সে এতটাই অবাক হয়ে গেল যে সোলাইমানের চিৎকার করে বলা ‘বোমা!’ শব্দটা মাথায় প্রথমে ঢুকলই না। যখন সম্বিত পেল, ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। ঠিক তখনি কয়েক ফুট সামনে পড়া গ্রেনেডটি প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হল। ক্যাপ্টেন সরফরাজ চেয়ার উলটে পড়ে গেল এবং কাছে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচ জন সৈন্য একেবারে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। যারা বেঁচে ছিল তাদের উপর প্রায় সাথে সাথেই শুরু হল গুলি বৃষ্টি। বাকি সৈন্যরা দ্রুত গাড়ির আড়ালে অবস্থান নিয়ে পালটা আক্রমণ করার চেষ্টা করল, কিন্তু একেবারে ফাঁকা জায়গায় থাকার কারণে সুবিধে করতে পারল না। কোন আড়াল না থাকার কারণে একে একে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়তে থাকল। এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা আড়াল নিয়ে ছিল বলে ওদের কারও গায়ে আঁচড় পর্যন্ত লাগল না।

লড়াই বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই পাকিরা সবাই খতম হয়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধারা গুণে দেখল ১১ জন পাকিস্তানী সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে! একই সাথে রাজাকার সোলাইমানও মারা গেছে। একদিনে এই প্রথম এত জন পাকি দুশমনকে ওরা খতম করতে সমর্থ হল! নিঃসন্দেহে আজকের দিনটি ওদের দলের জন্য বিরাট সাফল্যের!

আসলে পাক বাহিনী আসছে শুনে শান্ত এবং অনিকরা গতকাল রাত থেকেই গ্রামের বাইরের পাট ক্ষেতের মধ্যে অবস্থান নিয়ে ছিল। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল শত্রুপক্ষ যদি সংখ্যায় বেশি না হয় কেবল সেক্ষেত্রেই ওরা আক্রমণ করবে। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে সৈন্যরা যখন গ্রামে জ্বালাও পোড়াও করছিল তখনই ওরা চারিদিক থেকে গ্রামটাকে ঘিরে ফেলেছিল। অনিক দূর থেকে শান্ত ভাই এর নির্দেশ পেয়ে গ্রেনেড ছুঁড়ে মেরেছিল। এর নিখুঁত নিশানার কথা শান্ত ভাই এর অজানা নয়।

ক্যাপ্টেন সরফরাজকে সানগ্লাস পড়া অবস্থায় উলটো হয়ে পড়ে কাতরাতে দেখা গেল। শান্ত ভাই এগিয়ে এসে স্টেনগানের একটি গুলি দিয়েই ব্যাটাকে চিরতরে চুপ করিয়ে দিলেন। ব্যাটার চেহারায় তখনো বিস্ময়ের অভিব্যক্তি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল।

একজন মুক্তিযোদ্ধা শান্ত ভাই এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
-ভাই একটা জিনিস বুঝতাছি না, হারামজাদা এত কিছু থাকতে কুত্তার পেছনে লাগলো ক্যান? গেরামের সবডি মাইরা ফালাইছে!
-উঁহু, সবগুলোকে এখনো মরে নি…

কথাগুলো ঠাণ্ডা ভয়ংকর কণ্ঠে বলে তিনি স্টেনগান নিয়ে মফিজ এবং রহমতের দিকে এগিয়ে গেলেন।

মফিজ, রতন দুজনেই ছুটে এসে শান্ত ভাই এর দুই পা জড়িয়ে ধরে হাউ-মাউ করে কান্না শুরু করল। একই সাথে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রাণ ভিক্ষা করতে লাগল। কিন্তু শান্ত ভাই এর মন মনে হল গলল না, তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে ওদের দিকে তাক করলেন।

অনিক দ্রুত কিছুটা সামনে এসে শান্ত ভাই কে বলল,
-ভাই, একটু এদিকে আসুন। আপনার সাথে কথা আছে।
দুই রাজাকারকে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের জিম্মায় রেখে ওরা কয়েকজন একটু পাশে সরে গেল।
-কি বলবি, অনিক?
-ভাই, ওদেরকে এভাবে মেরে ফেলার দরকার আছে কি? হ্যাঁ, ওরা পাকিদের খাবার-পানি দিয়ে সাহায্য করেছে ঠিকই, কিন্তু অন্য কোন কিছু তো করে নি। এর চেয়ে ওদেরকে আরেকটি সুযোগ দেয়া যায় না? ওরা তো বাঙ্গালিই- আমাদের দেশেরই লোকজন…
-অনিক, তুই এত নরম মন নিয়ে যুদ্ধ করবি কেমন করে? এই জাত গোক্ষুরগুলো পাকিস্তানকে নিজের দেশ মনে করে। এরা স্বাধীন বাংলাদেশ চায় না। আজকে হয়ত হত্যা-লুটে অংশ নেয় নি, কিন্তু ছেড়ে দিলে একদিন ঠিকই করবে।
-তারপরও… যদি মত বদলে ভাল হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়বে।
-নাহ, তুই একদিন আমাদের বিপদে ফেলবি মনে হচ্ছে। যাহোক, ওদেরকে একটি সুযোগ দিচ্ছি…

শান্ত ভাই সামনে এসে স্টেনগানটা মফিজের ঠিক মাথায় ধরে বললেন,
-বল, তোরা পাকি হারামজাদাদের সাহায্য করেছিলি কেন? জানিস না ওরা আমাদের শত্রু?
-হুজুর, আমরা তো শুনেছি মুক্তিরাই দেশের শত্রু। হিন্দুরা ষড়যন্ত্র করে মুসলমানদের বড় দেশ ভেঙ্গে টুকরো করতে চাইছে…
-এদিকে তাকা, আমাদের যে ২২ জন আছে, তার মধ্যে মাত্র ৪ জন হিন্দু। বাকি সবাই মুসলমান। এদের মধ্যে ঐ যে ওসমান ভাইকে দেখছিস-উনি কোরআনের হাফেজ। তাহলে বল, এটা কি হিন্দুদের ষড়যন্ত্র? পশ্চিম পাকিস্তানের ইয়াহিয়া থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি নেতাই মদ খায়, ব্যভিচার করে, নামাজ-রোজা করে না। ওরা কেমন করে ইসলামের প্রতিনিধি হয়? ওদের সৈন্যরা নিরীহ শিশু থেকে শুরু করে নারী, পুরুষ, বুড়োদের মেরে ফেলছে, মেয়েদের ইজ্জত নষ্ট করছে, লুট করছে- এটা কি ইসলাম ধর্মের শিক্ষা? আসলে এই যুদ্ধের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নেই। এটা আমাদের অধিকারের লড়াই, এটা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই, এটা ভুলকে শুদ্ধ করার লড়াই।
-আমাদের ভুল হয়ে গেছে, হুজুর। এবারের মত মাফ করে দেন।
-এবারের মত মাফ করে দিচ্ছি। কিন্তু পাকিদের সাথে আবার হাত মিলিয়েছিস শুনলে এরপরের বার কোন কথা না বলে সরাসরি যমের বাড়ি পাঠিয়ে দেব, মনে থাকবে?
-জ্বি, হুজুর। মনে থাকবে। কাঁদতে কাঁদতে ওরা দুজন বলল।

শান্ত ভাই ওদেরকে ছেড়ে দিলেন। ছাড়া পেয়ে দুজন পড়িমরি করে ছুটে চোখের আড়াল হয়ে গেল।

মৃত পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে ওরা বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ পেল। অবশ্য, জিপ দুটো গুলিতে একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সবাই মিলে ঠেলা দিয়ে গাড়ি দুটোকে গ্রামের পাশের খালের মধ্যে ফেলে দিল। পাকিদের মৃতদেহগুলোও একই ভাবে সরিয়ে ফেলা হল। কেননা, পাকিস্তানী সৈন্যরা এভাবে গাড়ি এবং সহযোদ্ধাদের লাশ পড়ে থাকতে দেখলে প্রতিশোধ নেবার জন্য পাগল হয়ে যেতে পারে।

ইতোমধ্যে পাকিস্তানী সৈন্য সব খতম হয়ে গেছে শুনে গ্রামের বেশ কয়েকজন অধিবাসী ফিরে এসেছে। তাদের শক্ত সামর্থ্য এবং কমবয়সী লোকদের মধ্যে ওরা কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিতরণ করল। তাদের সবাইকে বিকাল পর্যন্ত হালকা ট্রেনিং দিয়ে অস্ত্র চালনার জন্য মোটামুটি তৈরি করল। আশা করল এরপর আক্রান্ত হলে কিছুটা হলেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে।

রাতটা ওরা গ্রামেই কাটালো। গ্রামের মানুষ কৃতজ্ঞতা স্বরূপ পরম মমতায় ওদেরকে রাতের খাবার খাওয়াল। আয়োজন খুব সামান্য হলেও অনেকদিন পর ওরা সবাই তৃপ্তির সাথে খাওয়ার সুযোগ পেল।

ভোরবেলা গ্রামবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ওরা কুষ্টিয়ার দিকে রওনা হল।

২০।

অক্টোবর, ১৯৭১।

গত দুই সপ্তাহে ওরা কুষ্টিয়া এবং কুষ্টিয়ার আশপাশের এলাকাগুলোতে অনেকগুলো সফল অপারেশন পরিচালনা করল। ওদের চোরা-গুপ্ত আক্রমণে পাকবাহিনীর একেবারে দিশেহারা হয়ে গেল। প্রায়ই প্রতিদিনই ওদের পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরিত হয়ে পাকিদের গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতে লাগল। একই সাথে হঠাৎ ছুঁড়ে মারা গ্রেনেড বা গুলিতে আহত বা নিহত হল অনেক পাকিস্তানী সৈন্য।

১৫ অক্টোবর কুষ্টিয়ার বেলগাছিয়া গ্রামে পাকিস্তানী সৈন্যরা আক্রমণ করে। এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে হত্যা করে ১০ জনেরও বেশি নিরীহ গ্রামবাসী। খবর পেয়ে আশপাশ থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ঐ গ্রামের দিকে ছুটে যায়। শান্ত, অনিকরাও এই যুদ্ধে যোগ দেয়।

পুরো একদিন ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলতে থাকে। পাকিদের পাঁচ জনেরও বেশি সৈন্য মারা যায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনিকদের দলের আফজাল নামের একজন এই যুদ্ধে শহীদ হন। তিনি অসাবধান-বশত একটু বেশি এগিয়ে গিয়েছিলেন। ওদের ছোঁড়া গুলি তাঁর মাথা একেবারে ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়েছে। মৃত্যু এখন অনেক স্বাভাবিক হয়ে গেলেও সহযোদ্ধা হারানো সবসময়ই অনেক কষ্টের। তবে শোককে দ্রুত শক্তিতে পরিণত করে ওরা দ্বিগুণ শক্তিতে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। অবশেষে পাকিস্তানী বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

১৯ অক্টোবর ওরা দুই দলে ভাগ হয়ে একটি গ্রুপ ভেড়ামারার দিকে অন্যটি কুষ্টিয়া শহর অভিমুখে রওনা হল। ভেড়ামারা দলের দায়িত্ব আছেন শান্ত ভাই, অনিক নেতৃত্ব দিল কুষ্টিয়ার দলটিকে। শান্ত ভাইদের দায়িত্ব নদীতে পাক বাহিনীর কোন জলযান দেখতে পেলে তা ধ্বংস করা বা তাড়িয়ে দেয়া। অনিকদের দায়িত্ব কুষ্টিয়া টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বিকল করা।

২০ অক্টোবর রাতে অনিক এবং ওর দল এক্সচেঞ্জের একেবারে কাছে পৌঁছল। ঢাকার সাথে কুষ্টিয়ার টেলিফোন যোগাযোগ বন্ধ করতে পারলে পাকিস্তানী বাহিনীকে বেকায়দায় ফেলা যাবে, তাই এই অপারেশনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ! ভবনের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর অনিক ও চারজন সহযোদ্ধা গ্রেনেড হাতে সামনে এগিয়ে গেল। বাকিরা পেছনে রইল ওদের কাভার করার জন্য। রাত এগারোটার দিকে ওরা একযোগে গ্রেনেড হামলা করল। এতে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হল। আগুন, কালো ধোঁয়ায় পুরো অফিস আচ্ছন্ন হয়ে গেল। এমন সময়ে কয়েকজন সৈন্য ওদের দিকে গুলি করা শুরু করল। সাথে সাথেই পেছনে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা কাভার ফায়ার করে ওদেরকে পিছু হটিয়ে দিল। এই সুযোগে অনিক এবং অন্যরা দ্রুত পালিয়ে গেল। ওদের জানার কথা নয়-এই অপারেশনের পর অনেকক্ষণ এই টেলিফোন এক্সচেঞ্জটি বিকল হয়ে রইল।

পরদিন সন্ধ্যায় অনিক এবং শান্ত ভাই এর আলাদা দল দু’টি মিরপুরের কাছে নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হল। শান্ত ভাই জানালেন ওরাও সফল অপারেশন চালিয়েছে। ভেড়ামারায় একটি খালের মধ্যে দু’টি দ্রুতগামী পাকিস্তানী স্পিড বোট ধ্বংস করেছে। স্পিড বোটে অস্ত্র এবং গোলাবারুদ ছিল।

ঐ দিন রাতে খবর পেল মেহেরপুর শহরের বাইরে কাথুলি থেকে কামদেবপুর পর্যন্ত পুরো এলাকা জুড়ে মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকিস্তানীদের প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। দ্রুত সবাই মিলে যুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত নিলো। ভোরের আগেই ওরা মেহেরপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল।

ওরা যখন কামদেবপুরে পৌঁছল ততক্ষণে মুক্তিবাহিনী অনেকটাই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। আশপাশ থেকে আরও অনেকে যোগ দেবার ফলে মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা পাকিস্তানী বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি হল। একই সাথে ওরা গ্রামের মধ্যে প্রচার করে দিল যে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা থেকে আরও মুক্তিযোদ্ধা দলে দলে ছুটে আসছে। শান্ত ভাই এর ধারনা ছিল গ্রামের লোকদের মারফত এই কথা নিশ্চয়ই পাকিদের কানে পৌঁছবে।

তিন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা ঘিরে থাকার কারণে পাকবাহিনী এমনিতেই কোন ঠাসা হয়ে ছিল। আরও মুক্তিযোদ্ধা আসার খবর পেয়ে ওদের মনোবল একেবারেই শূন্য হয়ে গেল। কয়েক ঘণ্টা পর পাক বাহিনীর তরফ থেকে কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া শুরু করল। এক পর্যায়ে তারা বুঝতে পারল পাক বাহিনী পালিয়ে গেছে।

খবর পেয়ে গ্রামের সাধারণ মানুষজনও ঘর থেকে বের হয়ে এলো। সবাই মিলে হৈ হৈ করতে করতে পাকিস্তান বাহিনী যেখানে অবস্থান নিয়েছিল সেখানে গিয়ে দেখতে পেল ওরা আসলেই পালিয়ে গেছে। পালিয়ে যাবার সময় অনেকেই অস্ত্র, গোলাবারুদ ফেলে গেছে। এমনকি বেশ কয়েকটি সামরিক পোশাকও ওরা খুঁজে পেল। অর্থাৎ কাপুরুষগুলো সিভিলিয়ান ড্রেস পড়ে পালিয়ে জান বাঁচাবার ফন্দি করেছে।

পুরো এলাকা সার্চ করে ওরা ২০ টি চাইনিজ রাইফেল, দু’টো এল এম জি, একটি মেশিনগান এবং প্রচুর গুলি খুঁজে পেল। সামনের দিনগুলোর জন্য ভাল রসদ পাওয়া গেল। একই সাথে ওরা দেখতে পেল ক্যাপ্টেন পদের একজন অফিসারসহ পাক বাহিনীর ১৭ জন মারা গেছে। এই বিজয়ের কথা লোক মারফত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। যশোর, ঝিনেদা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া এবং এর আশপাশের অঞ্চলগুলো সহ পুরো মুক্তিবাহিনীর জন্যই ছিল এটি অন্যতম সেরা বিজয়।

পবিত্র রোজা শুরু হবার কারণে ওরা পরবর্তী কয়েকটি দিন বিশ্রাম নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো। এরপর সকল মুক্তিযোদ্ধা পুরো উদ্যমে নতুন নতুন এলাকা অভিমুখে রওনা হয়ে গেল। শান্ত ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন এখন থেকে পাক বাহিনীর পরিবহন ব্যবস্থায় আক্রমণ করা হবে, অর্থাৎ সড়ক, নৌ এবং রেল পথে। এতে করে পাকিস্তানী বাহিনী খাবার ও রসদের অভাবে পড়বে এবং ওরা ধীরে ধীরে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।

————-

গত কয়েকদিন ধরে ওরা দর্শনার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে আছে। দেখেই বোঝা যায় বাড়ির লোকজন অত্যন্ত তাড়াহুড়ার মধ্য দিয়ে পালিয়ে গেছে। বেশিরভাগ জিনিসপত্রই ছড়ানো-ছিটানো পড়ে রয়েছে। এমনকি ছাদে এখনো কাপড় নেড়ে রাখা রয়েছে।

বাসার আঙিনায় বাঁধাই করা তুলসী গাছ, ভেতরে সাজানো পূজার বেদী দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না-এই বাড়ির লোকজন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ হিন্দু ছিল। ভেতরের একটি ঘরে ওরা সবাই মিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে পড়ল। অনেক রাত হয়ে গেছে কিন্তু এখনো কেউই ঘুমায় নি। হঠাৎ করে শান্ত ভাই অনিককে সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন,
-অনিক তোর বাসার কথা মনে পড়ে না?
-কি যা বলেন শান্ত ভাই, মনে পড়বে না কেন? গত কিছুদিন ধরে তো খুবই কষ্ট হচ্ছে! খালি মনে হচ্ছে এক ছুটে গোপালগঞ্জ চলে যাই।
-রোজার ঈদের সময়ে যাস। আশা করা যায় তখন পাক হারামিগুলো একটু শান্ত থাকবে। অবশ্য ওদের কোন বিশ্বাস নেই- শালাদের না আছে কোন ধর্ম, না আছে কোন মানবতা। এ কয়দিনে একটি ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েছি-পৃথিবীতে পাকিদের মতন হারামি জাতি খুব কমই আছে।
-হুম!
-আচ্ছা, তুই তো নাকি খুব ভাল ক্রিকেট খেলতি…যদি এমন হয় যে যুদ্ধে আমরা হেরে গেলাম, এরপর তোকে পাকিস্তানের জন্য খেলার জন্য ডাক দিল-তুই কি করবি?
-শান্ত ভাই, যুদ্ধে আমরা জিতবই! দৃঢ় কণ্ঠে জানালো অনিক।
-তারপরও ধর আমরা হেরে গেলাম…তখন?
-আমি জীবনেও আর ক্রিকেট খেলবো না। আমি যুদ্ধ করতে করতেই মরে যেতে রাজি আছি, কিন্তু পাকিদের সাথে একই দলে ক্রিকেট খেলার প্রশ্নই আসে না।
-এই যুদ্ধে তাহলে তোর প্রেরণা ক্রিকেট?
-অবশ্যই। আমি স্বপ্ন দেখি বাংলাদেশ দলের হয়ে টেস্ট খেলার জন্য মাঠে নেমেছি। স্টেডিয়ামে অন্যদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উঠছে… অনিকের চোখ দুটো হ্যারিকেনের মৃদু আলোতেও চক চক করতে লাগল!
-ইনশা আল্লাহ তোর ইচ্ছে পূরণ হবে। আন্তরিক কণ্ঠে অনিক ভাই বললেন। অন্যান্যরাও মাথা দুলিয়ে সায় সবাই জানালেন।

শান্ত ভাই এবার সাত্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-তুই নাকি লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখিস? সত্য নাকি?

সাত্তার লজ্জা পেয়ে গেল। ও আসলেই কবিতা লেখে। অবশ্য কখনো কাউকে পড়তে দেয় না। বলেছে দেশ স্বাধীন হবার পর সব একসাথে দেখাবে।
-জ্বি, শান্ত ভাই।
-একটা পড়ে শোনা তো! তোর কবিতা শুনে আমরা সবাই অনুপ্রাণিত হই।
-ভাই, নিজের কবিতা দেশ স্বাধীন না হলে কাউকে শোনাবো না বলে প্রতিজ্ঞা করেছি। আপনাকে বরং বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা কবিতাটা শোনাই।
-সর্বকালের সেরা কবিতা? শোনা দেখি…

সাত্তার আস্তে করে উঠে ঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালো। কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে শুরু করল,
“ভায়েরা আমার, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন…!!’’

এরপর টানা বিশ মিনিট ধরে বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের ভাষণ ও অনর্গল বলে চলল। শেষের দিকে ধীরে ধীরে সাত্তারের কণ্ঠস্বর চড়ে যেতে লাগল। শান্ত ভাই কোন বাঁধা দিলেন না। সবশেষে ও যখন বলল “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা” কেন জানি ওরা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট পজিশনে চলে গেল! সবাই সবাই চোখের দিকে তাকিয়ে দেখল প্রত্যেকের চোখ যেন একেকটি মশাল হয়ে গেছে, ধিকি-ধিকি করে জ্বলছে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর শান্ত ভাই এগিয়ে এসে সাত্তারকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
-কি শোনালি রে ভাই! বুকটাই জড়িয়ে গেল! আসলেই এটা বাংলা ভাষার সর্বকালের সেরা কবিতা!

শান্ত ভাই এর দেখাদেখি অন্যান্য সবাই এগিয়ে এসে সাত্তারকে বাহবা দিতে লাগল।

শান্ত ভাই আবার কথা বলে উঠলেন,
-সাত্তার, তুই নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুকে নিয়েও অনেকগুলো কবিতা লিখেছিস?
-জ্বি ভাই, তাঁকে ছাড়া কি কবিতা লেখা সম্ভব?
-আমার একটি অনুরোধ রাখবি?
-অবশ্যই! বলুন।
-কয়েকটি কবিতা তাজউদ্দীন আহমেদকে নিয়েও লিখিস। আমার কেন জানি মনে হয় বরাবরের মত প্রচার বিমুখ এই মহান মানুষকে নিয়ে লেখার মত বেশি লোক থাকবে না…

রাত বেশি হয়ে যাবার কারণে ওরা আর বেশিক্ষণ জেগে রইল না। চার জন অস্ত্র হাতে নিয়ে পাহারা দিতে থাকল, বাকিরা ঘুমিয়ে পড়ল। চার ঘণ্টা পর পালা বদল করে অন্য একটি দল পাহারা দেয়া শুরু করবে, এখনকার চারজন তখন ঘুমাতে যাবে।

ভোর বেলায় অনিককে ওরা জেগে ওঠাল। এখনকার চারজনের মধ্যে ও একজন। বাকি তিনজন হচ্ছে কায়েস, নারায়ণ এবং জসিম ভাই। ঘুম থেকে উঠেই এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখতে পেল। পূজোর বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে নরেনদা পূজো করছেন। আর তার খানিকটা পেছনে ওদের দুইজন সহযোদ্ধা ফজরের নামাজ পড়ছেন। মনটাই ভাল হয়ে গেল। এমন সময়ে শান্ত ভাইও ঘুম থেকে উঠে ওজু করে আসলেন।
-অনিক, তুই নামাজ পড়িস না কেন? আর নারায়ণ, তোকে তো কখনো পূজা করতে দেখি না, কাহিনী কি? এই যুদ্ধে জিততে আমাদের সব ধরণের সাহায্যের প্রয়োজন হবে।

কায়েস বলল,
-ভাই আমি তো কোন ধর্মে বিশ্বাস করি না। আমি কি করবো?
-তুই আর কি করবি? অস্ত্র হাতে বাড়ির সামনে গিয়ে পাহারা দিতে থাক!

অনিক ওজু করার জন্য টিউব ওয়েলের সামনে এগিয়ে গেল। ততক্ষণে নারায়ণ ঐ বাসার পূজার বেদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মন্ত্র জপ করা শুরু করেছে।

১টি মন্তব্য “বলের বদলে গ্রেনেড (১০ম পর্ব)”

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

ফেসবুক মন্তব্য