স্বাধীনতা ঘোষণার আগের সেই নারকীয় রাত

[ডিসক্লেমারঃ এটি আমার লেখা নয়। পেয়েছি বিডিনিউজ২৪ এ। আমি লিঙ্ক দিব ভেবেছিলাম কিন্তু মনে হল এই লেখাটি থাকলে আমাদের সিসিবি সমৃদ্ধ হবে তাই পুরো লেখাটি তুলে দিলাম। লেখক এবং অনুবাদক এর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক]

অ্যান্থনি মাসক্যারেনহাস

রাত আটটার দিকে একটা রিকশা দ্রুতগতিতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির সামনে থামলো। রিকশাঅলাটি তখন ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে লোকটা জানালো ঝাড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে রিকশা চালিয়ে এসেছে সে। তার কাছে ছিল বঙ্গবন্ধুকে লেখা একটা চিরকুট যাতে বলা হয়েছে: আপনার বাড়িতে আজ রেইড হতে পারে।

ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন আমাকে বলেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আসন্ন রাতের ‘অ্যাকশন’ সম্পর্কে তাদের কাছে এটাই ছিল প্রথম সুনির্দিষ্ট আভাস। সেদিনই সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার বিনা নোটিশে ঢাকা ত্যাগ আওয়ামী লীগ শিবিরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। এরপর সেনাবাহিনীর সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে শেখ মুজিব তার সহযোগীদের সতর্ক হতে এবং আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য তৈরি থাকতে বলেন। বঙ্গবন্ধু নিজে পালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান।

এর পর থেকে তাকে দেখতে পেয়েছেন হাতে গোনা কয়েকজন।
বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের কেউ কেউ প্রায় আধঘন্টা পর পর ফোন করেছেন তার অবস্থা জানতে। বাড়ির কাজের লোকটি ফোন ধরে প্রতিবার তাদের আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু গুলির আওয়াজে চারদিক প্রকম্পিত আর আগুনের শিখায় রাতের আকাশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠার আড়াই ঘন্টা মত পরে বঙ্গবন্ধুর ফোন ডেড হয়ে গেলো। আতঙ্কিত জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো, বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর কব্জায়।

এর সপ্তাহতিনেক পর আমাকে ঘটনাটির বর্ণনা দেন এক প্রতিবেশী। তিনি আমাকে বাড়ির দেয়ালে গুলির চিহ্নও দেখালেন।

প্রত্যক্ষদর্শী এই প্রতিবেশীর ভাষ্যে, রাত দেড়টার দিকে দুটি সেনা জিপ ৩২ নম্বরের সামনে এসে থামে। পেছনে কয়েকটি ট্রাক। কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ির বাগান ভরে গেলো সৈন্যে। ছাদের দিকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় তারা। গুলি করা হয় ওপর তলার একটি জানলা লক্ষ্য করেও।

প্রতিবেশীটি আমাকে জানালেন, আক্রমণ নয় সেটা ছিল স্রেফ ভীতি প্রদর্শন। এই তাণ্ডবের মধ্যে তিনি শুনতে পান, ওপর তলার এক বেডরুম থেকে বঙ্গবন্ধুর গলা: “তোমরা এরকম বর্বর আচরণ করছো কেন? তোমরা আমাকে বললে আমিই নিচে নেমে আসতাম।”

পাজামার ওপর একটি মেরুন ড্রেসিং গাউন চাপিয়ে বঙ্গবন্ধু নেমে এলেন নিচে। সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল এক তরুন ক্যাপ্টেন। আমার তথ্যদাতার বক্তব্য অনুযায়ী সে ছিল বিনয়ী ও আন্তরিক। ক্যাপ্টেন বললো, “আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে স্যার।”

তারা বঙ্গবন্ধুকে তুলে নিয়ে চলে গেলো।

শেখ মুজিবের স্ত্রী ও শিশু সন্তানরা পাশের এক বাড়িতে পালিয়ে যান। এর ঘন্টাখানেক পর এলো একটি সেনা ট্রাক। এবার আর ভদ্রতার বালাই ছিল না সৈন্যদের মধ্যে।

নিচতলার ঘরের সব জানলা-দরজার কাচ ভেঙে গুড়িয়ে দিলো তারা। ঘরের আসবাব ভেঙে বিছানাপত্র ,বইয়ের আলমারি উল্টে তুলকালাম করলো। দেয়ালে টাঙানো ছবি টেনে ছিঁড়ে ফেলা হলো। মেঝেতে পড়ে থাকা একটা ছবি ছিল চেয়ারম্যান মাও সেতুংয়ের। রূপালি ফ্রেমে বাধানো ছবিটা তার স্বাক্ষর করা। কোত্থেকে পেলেন ছবিটা বঙ্গবন্ধু, ভাবছিলাম আমি। সৈন্যরা শুধু তল্লাশি চালাচ্ছিল তা নয়। তারা যেন কোনো শত্র”র ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছিল, যেমন করে সামনের গাছকেই আক্রমণ করে আহত বাঘ।

এপ্রিলের মাঝামাঝি আমি নিজে বাড়িটাতে গেলে ওই তাণ্ডবের চিহ্ন নিজের চোখেই দেখি। বাড়িটায় প্রাণের চিহ্ন বলতে ছিল একটি ছাইরঙা বড়সড় বিড়াল যে কিনা আমাদের দেখে বেরিয়ে এসে শান্তচোখে তাকিয়ে রইলো। বাড়ির পেছনে খাঁচার মধ্যে দশ-বারোটি কবুতর আর উঠোনে চরছে তিনটি মুরগি।

বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যে হানাবাড়ির নিঃসঙ্গতা আমি দেখেছি তা পরেও অসংখ্যবার চোখে পড়েছে গোটা পূর্ব বাংলা জুড়ে- বাড়ির পর বাড়ি, আস্ত গ্রাম আর শহর-জনপদ খা-খা করছে, সব মানুষ পালিয়ে গেছে প্রাণভয়ে।

ভাগ্য ভালো যাদের তারা পালিয়ে যেতে পেরেছে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে। অনেক সময় নিঃসম্বল হয়ে কেবল প্রাণটি হাতে করে। মুজিবের মতো বাকিরা পাকড়াও হয়ে চলে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। আর রয়েছে সেইসব হতভাগ্য যাদের ফুলে ওঠা লাশ চোখে পড়বে যত্রতত্র। বেয়নেটের খোঁচা আর বুলেটের ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত দেহগুলো পড়ে আছে মাঠ-ঘাট খানাখন্দে কিংবা মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা নীরব নারকেল বীথির ফাঁকে ফাঁকে।

ইস্টার্ন কমান্ড সদর দপ্তর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নিরাপদে করাচী নামার সংকেত পেয়েই মাঠে নামে ২৫ মার্চের রাতে। তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। মধ্যরাত নাগাদ সৈন্যদের নারকীয় তাণ্ডব অনেকখানি এগিয়ে গেছে। পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের দপ্তরে হামলা হলো ট্যাংক, বাজুকা আর অটোমেটিক রাইফেল নিয়ে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের হলো একই অভিজ্ঞতা। একই সময়ে। এ দু’জায়গা মিলিয়ে হাজার পাঁচেক অপ্রস্তুত বাঙালি হাতের কাছে যা পেলো তা নিয়েই কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলাফল যে কী হবে তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহের অবকাশ ছিল না। সেনাবাহিনীর সুবিধা ছিল একাধিক: প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত পাওয়া, সৈন্য সংখ্যা এবং বহুগুণে শক্তিশালী অস্ত্র সামর্থ্য। তবে বাঙালি সৈনিকরা প্রাণ দেওয়ার আগে পাকিস্তানী সৈন্যদের চরম বেগ দিয়েছে। অন্তত পরে আমাকে বিধ্বস্ত এলাকাগুলো ঘুরিয়ে দেখানোর সময় গাইড তাই বলেছে।

নগরীর অন্যান্য স্থানে সৈন্যের দল বাজুকা, ফ্লেম থ্রোয়ার (আগুন লাগানোর অস্ত্র), মেশিন গান ও স্বয়ংক্রিয় রাইফেলে সজ্জিত হয়ে আগে থেকে ঠিক করা টার্গেটের ওপর চড়াও হচ্ছিল। কখনো তাদের সঙ্গে ছিল ট্যাংকও। একটি দল গেলো আওয়ামী লীগ সমর্থক পত্রিকা ‘দি পিপল’ অফিসের দিকে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের টেরাসে জড়ো হওয়া আতঙ্কিত বিদেশী সাংবাদিকদের চোখের সামনেই ঘটছিল ব্যাপারটা। সরু গলিটায় ঢুকে সৈন্যরা খুব কাছ থেকে গুলি চালালো। যেসব কর্মী পালাতে চেষ্টা করেছিলো তারা নির্মমভাবে কচুকাটা হলো। গোলাগুলির পর ভবনটার যা বাকি থাকলো তাতে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। এভাবেই সেনাবাহিনীর একটা ‘শত্র”‘ শেষ হলো।

শহরের অন্য মাথায় শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক ইত্তেফাকের একই পরিণতি হলো। পরে ‘ভুল বুঝতে পেওে’ সেনাবাহিনী অফিসটা সংস্কার করে। একটা পুরনো ছাপাখানা যোগাড় করে কাগজটা আবার চালু করা হয়।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও স্টাফ কোয়ার্টারগুলিতে যে শতশত ছাত্র আর তাদের শিক্ষককে নিধন করা হলো তাদের জন্য শোক করার কেউ ছিল না। সবার অলক্ষ্যেই যেন শাঁখারিপট্টি, তাঁতীবাজার ও রমনা রেসকোর্সের মন্দিরের আশেপাশে থাকা অনেক হিন্দুকে হত্যা করা হলো। শাঁখারিপট্টিতে হত্যা করা হয় আট হাজারের মতো হিন্দু নারী,পুরুষ আর শিশুকে। রাস্তার দুই মাথা বন্ধ করে দিয়ে সৈন্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিধন করে তাদের।

নিউ মার্কেটের অদূরে লেঃ কমাণ্ডার মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়িতে হানা দিল সৈন্যরা। নৌবাহিনীর সাবেক এ অফিসার আওয়ামী লীগের একজন পরিচিত নেতা এবং ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অন্যতম অভিযুক্ত। স্ত্রীর চোখের সামনে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে খুন করা হলো তাকে।

পাক হানাদার বাহিনীর আক্রোশের বিশেষ টার্গেট ছিল ইকবাল হল এবং তার নিকটবর্তী জগন্নাথ হল। ইকবাল হল মুসলমান আর জগন্নাথ হল হিন্দু ছাত্রদের আবাসস্থল ছিল। সেনাবাহিনী এ দুটি হল ঘেরাও করে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছাত্রদের হত্যা করে। হল কম্পাউণ্ডের বাইরে তড়িঘড়ি গর্ত খুঁড়ে হিন্দু ছাত্রদের মাটিচাপা দেওয়া হয়। ইকবাল হলের মুসলমান ছাত্রদের মৃতদেহগুলো সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয় অথবা এলোপাতারি ফেলে রাখা হয়। হলের ছাদেও অনেক মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
সেই কালরাতে ঢাকায় ৪৮ ঘন্টা ধরে চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা। ২৬ মার্চ ভোরবেলা কথিত ‘কারফিউ ভঙ্গের’ অভিযোগে মাত্র কয়েকঘন্টায় কয়েকশ’ নিরীহ বাঙালির ওপর গুলি চালানো হয়, যদিও কারফিউ জারির কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। পরে সকাল দশটার দিকে কারফিউ জারি করা হলো। আর তা করা হয় সবাইকে ঘরে আটকে পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যস্থলে অভিযান চালানোর উদ্দেশ্যে।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত ওই গণহত্যা ছিল ‘শুদ্ধি অভিযান প্রক্রিয়া’, সেনাশাসকরা রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হিসেবে যে শুদ্ধি অভিযানকেই বেছে নিয়েছিল।

কুমিল্লায় পাকিস্তান আর্মির ১৬ ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে আমাকে খোলাখুলিভাবেই বলা হয়েছিল: “পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার হুমকিকে আমরা চিরতরে সমূলে বিনাশের ব্যাপারে বদ্ধপরিকর, এমনকি তার জন্য যদি ২০ লাখ মানুষকে হত্যা এবং প্রদেশটিকে ৩০ বছর ধরে উপনিবেশ হিসেবে শাসন করতে হয় তাহলেও আমরা তা করবো।”

আর সামরিক শাসকদের কাছে এটাই ছিল পূর্ববাংলার সমস্যার ‘চূড়ান্ত সমাধান’। হিটলারের পর আর এত নারকীয় ঘটনা ঘটেনি।

* অ্যান্থনি মাসক্যারেনহাসের ‘দি রেপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থ থেকে। অনুবাদ হুমায়ুন হাশিম

৮ টি মন্তব্য : “স্বাধীনতা ঘোষণার আগের সেই নারকীয় রাত”

  1. মুহাম্মদ (৯৯-০৫)

    কাকতাল। আমি গত পরশুই দ্য রেইপ অফ বাংলাদেশ পড়া শেষ করলাম। কিছু লিখব লিখব করেও লেখা হয়নি। আপনার লেখা সে অভাব পূরণ করল। ২৬শে মার্চ উপলক্ষ্যে সিসিবি-তে কোন লেখা আসেনি। এটা সে অভাবও পূরণ করল। থ্যাঙ্কিউ।

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

ফেসবুক মন্তব্য