[ মালেয়শিয়া তে ৮০ হাজার বৈধ ও ৪০ হাজার অবৈধ শ্রমিক কাজ করছে । এদের প্রায় সবাই নিদারুন কষ্টে আছে। তাদের কষ্ট দেখার কেউ নাই। এই সব হতভাগ্য মানুষ দের কিছু ঘটনা নিয়ে লিখছি ... ]
১৯৬৫ সালেও মালয়শিয়া ছিল ৩য় বিশ্বের একটা দেশ। আর আজকে তারা পৌঁছে গেছে উন্নত বিশ্বের দরজায়, ২০২০ সালে তারা নিজেদের কে উন্নত বিশ্বের দেশ হিসাবে ঘোষনা দিবে। কুয়ালালামপুরের প্রায় সব সরকারি অফিসের দরজায় লেখা থাকে “ওয়াসান ২০২০” আর “মালেয়শিয়া বোলে” এর মানে হল, টাগেট ২০২০ আর মালায়শিয়া পারে। আসলে মালায়শিয়া পারে, কারন আমার এই ২ বছরে মালয়শিয়া আর বাংলাদেশের মধ্যে খুব একটা পাথক্য চোখে পরেনি। এদের প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে শুধু পাম অয়েল আর গ্যাস। গ্যাস আমাদের কম নেই। আর এখনে পাম বাগানে কাজ করে সব বাংলাদেশি। শুধু তায় নয়, কুয়ালালামপুরের ‘কে এল আই’ বেস্ট এয়ারপোট পুরস্কার জিতছে, কিন্তু এই বিশাল এয়ারপোট ২৪ ঘন্টা ধুয়ে মুছে রাখছে
২ হাজার বাংলাদেশি ক্লিনার। এরা প্রতিদিন ১৮ ঘন্টা কাজ করে মাত্র ৬০০-৭০০ রিংগিত পায়। তাও আবার সব সময় ঠিক মত বেতন দেয় না।
শুধু তাই নয় এখানকার সব রেলওয়ে স্টেশন, মাকেট, থেকে শুরু করে আমাদের এপাটমেন্ট এর ক্লিনার বাংলাদেশি। আফসোস এরা নিজের দেশের এয়ারপোট টা যে কি করে রাখছে। একবার আমার এক ইন্ডিয়ান ক্লাসমেট এর সাথে বিশাল জগড়া লেগেছিল, ওই শালা বলে, ঢাকা এয়ারপোট এ নাকি কুত্তা ঘুরাঘুরি করে আর এয়ারপোট এর ভিতরে নাকি ভুট্টা ভাজা বিক্রি করে। আমি তাকে ইন্টারনেট এর ঢাকা এয়ারপোট এর সব ছবি দেখাই, পরে সে বলছে, তাকে নাকি তার এক দাদা বলেছে, সে নিজে দেখেনি।
এদের অনেকেই ঢাকায় এর চেয়ে অনেক ভাল কাজ করত, আমার পরিচিত একটা ছেলে, ঢাকায় বেশ ভাল বেতনে কাজ করত সুয়েটার কারখানায়, এখানে সে একটা দোকানে ক্লিনার কাজ করে। মালিক ৩ মাস বেতন দিচ্ছে না । বেতন চাইলে মারে, আর রাতে রুমের দরজা তালা লাগিয়ে রাখে যাতে পালিয়ে না যায়। আরেক ছেলের সাথে একবার বাসে কথা হল, সে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনাস পাশ করে আসছে, দালাল বলে ছিল, এখানে অফিসিয়াল জব পাবে, সে জন্য শুধু কালো প্যান্ট আর সাদা শাট নিয়ে আসছে। বেচারা এখন একটা গরুর ফামের রাখাল। কালো প্যান্ট আর সাদা শাট নিয়ে খুব অসুবিদায় আছে। কারন এখানে কাপড় এর দাম খুব বেশি। মালিক পাসপোট দিচ্ছে না তাই অন্য কো্থাও যেতেও পারছে না।
গত মাসে একবার বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়েছিলাম, পাসপোট রিনিউ করতে। আমরা আমাদের আইকাড (ছাত্র ও এক্সপাট দের বিশেষ পরিচয় পত্র) দেখিয়ে সরাসরি সচিবের সাথে দেখা করতে পারি। কিন্তু শ্রমিক ভাইদের সেই অধিকার নেই, তারা গেটের সামনে বসে থাকবে, কখন শ্রম বিভাগের কেউ একজন দয়া করে নিচে এসে বলবে, “এই তো্মাদের কার কি সমস্যা বল”। আমি একবার আমার পরিচিত সহকারি সচিব মহোদয়ের কাছে জানতে চাইলাম, আপনারা কিছু করেন না কেন। উনি বলেন, আমাদের কথা মালায়শিয়ান কোম্পানি গুলা শুনে না। আমি হতবাক ওনার কথা শুনে। বাংলাদেশ থেকে কোন শ্রমিক আনতে হলে, ও নার অনুমতি নিতে হয় আগে, তার কথা শুনে না কেমনে ? আসলে এরা মালায়শিয়ান কোম্পানি থেকে ঘুষ নিয়ে, আনুমতি দিয়ে দেয়, আর কিছু বলতেও পারে না ।
একদিন বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে ৩-৪টা মালায় ছেলে কয়েকজন বাংলাদেশি কে ইচ্ছা মত পিটাচ্ছে, পরে হাইকমিশনের লো্কজন গিয়ে ওদের তাড়িয়ে দেয়। এর পরে পুলিশ আসল, ওরা ওই ৫ জন বাংলাদেশির কাছ থেকে ৩০০ রিংগিত জরিমানা করল। কারন ওরা নাকি ছিনতাই এর চেষ্টা করেছিল। হাইকমিশনের কেউ কিছু বলেনি । পুলিশ টাকা নিয়ে চলে গেল। লোকগুল হাউ মাউ করে কাঁদছে। কত কষ্ট করে এই টাকাটা জমিয়েছিল ।
এই মানুষ গুলো আমাদের কারো ভাই, আমাদের কারো বাবা, কারো ছেলে। এদের অনেক কষ্টের টাকায়, আমাদের হাইকমিশনার বেতন পান, আমার পরিচিত সচিব মহোদয় বেতন পান। আর এসি রুমে বসে কোন মদ ভাল আর কোন মাকেট এ আজ কে ভাবি কে নিয়ে বেড়াতে যাবেন তা নিয়ে খোশ গল্প করেন। যে সব দালালরা এই সব শ্রমিকদের মিথ্যা কথা বলে মালায়শিয়াতে নিয়ে আসছেন, তারা সারা দিন তার রুমে বসে আড্ডা মারে।
বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ৫০-৬০ গজ দূরে, আম্পাং – কে এল হাইওয়ের নিচে, একটা ড্রেন এর পাশে ২০-২৫ বাংলাদেশি থাকেন অনেক দিন ধরে। তাদের পাসপো্ট নেই, চাকরি নাই, টাকা পয়সা নাই, এরা ওখানে শুয়ে থাকেন, ড্রেন এর পানি দিয়ে গোসল করেন, আর রেল স্টেশন বা হাইকমিশনের টয়লেট ব্যবহার করেন। আর অপেক্ষা করেন কবে হাইকমিশন থেকে কিছু খেতে দিবে। হয়ত ২-৩ দিন পরে তাদের দয়া হয়। তারা খুব ভাল আছে। মালায়শিয়ান প্রধানমন্ত্রী চলেন দেশি প্রোটন পারদানা গাড়ীতে, আর আমাদের হাইকমিশনের উপ কিম্বা সহকারি সচিব ও চলেন ইম্পোটেট মাসিডিজ এ । আমাদের হাইকমিশনার মহোদয় যখন ওই ড্রেন এর উপরের আম্পাং – কে এল হাইওয়ের উপর দিয়ে তার সাদা বিএমডাব্লিউ তে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে চলেন, তখন আমার খুব কান্না পায়।





২৭ টি মন্তব্য
দুঃখজনক
[ জবাব দিন ]
ওহ, আমি দেখি গোল্ড মারছি…
[ জবাব দিন ]
সিলভার
[ জবাব দিন ]
আমি সাম্প্রতিক ঘুরে আসলাম মালয়েশিয়া থেকে। এর কিছু চিত্র আমি নিজেই দেখেছি। এমনকি কয়েকজনের সাথে কথা বলে একি চিত্র পেয়েছি
[ জবাব দিন ]
খুবই দুঃখজনক।।,।
(হাই কমিশন) 
এরা কী জন্য যে চাকরী পায়
আল্লাহ তাদের সহায় হোক
[ জবাব দিন ]
পে*ব করি শালার বিএমডাব্লিউ তে…
মেহেদী, লেখাটা অনেক তথ্যবহুল, একই সাথে টাচিং হইসে…
[ জবাব দিন ]
ধন্যবাদ ভাইয়া
[ জবাব দিন ]
ঠিক কইছ। এইগুলার সাদা-কালো পাায় লাত্থি মারতে পারলে বেহেস্তের শান্তি পাইতাম।
[ জবাব দিন ]
শালাগো ইয়ে দিয়ে বেতন পাকায়া পাকায়া ঢুকায়া দিতে পারলে শান্তি পাইতাম…
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
জুনা ভাই শান্তি পাইলে আমিও শান্তি পাইতাম
[ জবাব দিন ]
মনটাই খারাপ হয়ে গেলো
[ জবাব দিন ]
শুধু মালয়শিয়া’ই কি …
সবখানে একই চিত্র …
ভাল লাগে না।
[ জবাব দিন ]
বস,
অন্ততঃ জাপানে অবস্থা এতো খারাপ না…
[ জবাব দিন ]
এইসব সেক্টরে কি একটাও ভালো মানুষ নাই? আমাদের দেশের এই নিরপরাধ মানুষগুলোর কষ্ট দেখার কোথাও কি কেউ নাই
কিছুদিন আগে মধ্যপ্রাচ্যের সো কল্ড আরবি শেখগুলো কি করলো বাংলাদেশী শ্রমিকদের সাথে! অথচ এরা অনেকভাবেই ব্যাপক নির্ভর করে থাকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের উপর। ইয়াসমীন কবীর নির্মিত একটা ডক্যুমেন্টারি ফিল্ম আছে, “পরবাসী মনটা আমার”, মালয়শিয়া প্রবাসী এক যুবকের করুণ কাহিনি নিয়ে, দেখে চোখের পানি আটকে রাখা মুশকিল।
সরকারী ভাবে ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবেনা আমার মনে হয়। হাইকমিশনগুলোতে দলীয় বিবেচনায় লোভী দুর্নীতি বাজ লোক নিয়োগ বন্ধ করে কবে যে কিছু ভালো মানুষ দেয়া হবে!
[ জবাব দিন ]
লেখাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ মেহেদী।
[ জবাব দিন ]
[ জবাব দিন ]
পরবাসী মনটা আমার, কোথায় পাব?
[ জবাব দিন ]
দুঃখটা বাড়লোই খালি ………….।
পরিচিত কেউ কেউ আছেন এমন কষ্টকর পরিস্থিতিতে – ভাবতেই খারাপ লাগে।
[ জবাব দিন ]
ভাইয়া
আমরা চেষ্টা করছি এদের জন্য কিছু করতে। গত সপ্তাহে একজন কে দেশে পাঠালাম। প্রায় ২ মাস চেষ্টার পর তার পাসপোর্ট বের করতে পেরেছি। এখন সে দেশে আছে। দোয়া করবেন যেন আর কিছু করতে পারি।
[ জবাব দিন ]
ওয়াও,
[ জবাব দিন ]
দোস্ত, প্রাউড অফ ইউ…
[ জবাব দিন ]
মালয়েশিয়ায় কয়েকজন বাংলাদেশীর সাথে দেখা ও কথা হয়েছিল।
একটা সুপার শপের সুইপার প্রায় কান্না করে তার দূর্দশার কথা বলছিল। বেচারা নাকি সারাদিনের ১৬-১৮ ঘন্টার কাজে একবারও বসতে পারেনা!
আর দুইজন ওয়েটারের কেউই খুব একটা খারাপ নাই, দৈনিক টিপস এ তাদের চলে যায় দিন ভালোভাবেই।
খুব খারাপ লাগে!
মেহেদী, অনেক ভালো লিখছ!
[ জবাব দিন ]
ভাইরে কয়জন আর তোমার মত ভাবে বল?
[ জবাব দিন ]
সুমন ভাই গ্রেট এফোর্ট।
[ জবাব দিন ]
এই লেখাটা মিস করলাম কি ভাবে ????
মেহেদী ভাই আপ্নেকে একটা স্যালুট দেওয়া দরকার এই ভাবে সত্য তুলে ধরার জন্য
[ জবাব দিন ]
মেহেদী ভাই, অনেক ধন্যবাদ এমন মর্মস্পর্শী একটি লেখা দেয়ার জন্য।
[ জবাব দিন ]