গবেষণা পদ্ধতি শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা

গবেষণা পদ্ধতি শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
————————————————— ডঃ রমিত আজাদ

বাংলা গবেষণা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত গবেষ শব্দ থেকে। ঋগবেদে প্রাপ্ত এই শব্দটির অর্থ অন্বেষণ বা অনুসন্ধান। গবেষণা = গবেষ + অণ + আ । ইংরেজী Research শব্দটির ব্যুৎপত্তি ফরাসী recerche থেকে, যার অর্থ বিস্তারিত অনুসন্ধান। আবার Research মানে Re-search অর্থাৎ পুনরায় অনুসন্ধান, এভাবেও ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। আমরা কোন কিছুর অনুসন্ধান করছি, প্রথমবার অনুসন্ধান করার পর পাওয়া গেলনা, তাহলে পুনরায় অনুসন্ধান করতে হবে, আবারও যদি না পাওয়া যায়, আবারও অনুসন্ধান করতে হবে, এভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত পাওয়া না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত অনুসন্ধান চলবে।

Method শব্দটির অর্থ পদ্ধতি, উপায়, প্রক্রিয়া, রীতি, কার্যপদ্ধতিইত্যাদি। Logy শব্দটির ব্যুৎপত্তি গ্রীক logos থেকে যার অর্থ কথা, শব্দ, আলোচনা, ইত্যাদি। জ্ঞানের অনেক শাখার নামের শেষেই এই Logy শব্দটি পাওয়া যায় (যেমন: Biology, zoology, sociology ইত্যাদি। জীব সংক্রান্ত আলোচনা – Biology, প্রাণী সংক্রান্ত আলোচনা -zoology, সমাজ সংক্রান্ত আলোচনা – sociology ইত্যাদি )। বাংলা ভাষায় এর অনুবাদ বিদ্যা বা শাস্ত্র হতে পারে। সেই হিসাবে Research Methodology -র বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র’।

কি নিয়ে আলোচনা করে এই শাস্ত্র তা তার নামেই বোঝা যাচ্ছে। এককথায় বলা যায় যে কি পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয় মূলতঃ তা নিয়েই আলোচনা করা হয় এই শাস্ত্রে। তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার আগে গবেষণা কি এবং গবেষণার গুরুত্ব কি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

গবেষণা হলো নতুন তথ্য আবিষ্কার করে বর্তমান জ্ঞান বৃদ্ধি বা সংশোধনের নিমিত্তে পদ্ধতিগত অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া। গবেষণার মাধ্যমে সত্যের অনুসন্ধান করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যকে না পাওয়া যায় ততক্ষণ পর্যন্ত অবিরাম এই খোঁজ চলতেই থাকে। সত্যকে জেনে সেই সত্যকে প্রকাশ করার সাহসিকতাই গবেষণা। সত্য খুঁজে না পেয়ে মিথ্যা বলা বা সত্য খুঁজে পেয়েও উদ্দেশ্যমূলকভাবে সত্যকে গোপন করে মিথ্যা প্রকাশ করা গবেষণা নয়। গবেষণার তিনটি ধাপ রয়েছে: প্রথমটি – প্রশ্ন উত্থাপন করা, দ্বিতীয়টি – প্রশ্নের উত্তর তথ্য সংগ্রহ, এবং তৃতীয়টি প্রশ্নের প্রাপ্ত উত্তরটি যথাযথভাবে উপস্থাপন করা। যেকোন গবেষণায় নতুনত্ব (novelty) থাকতেই হবে। অর্থাৎ ইতিপূর্বে মানবজাতির জানা ছিলোনা এমন সত্য আবিষ্কার এখানে থাকতেই হবে। নতুনত্ব (novelty) না থাকলে সেটাকে গবেষণা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া যায়না। গবেষণা হলো সেই নিয়মাবদ্ধ (systematic) পথ যেখানে চলে আমরা নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তুলি।

ধর্মবিশ্বাস ও বিজ্ঞান উভয়ের মতেই এই জগৎের সর্বশেষ সন্তান হলো মানুষ। তাহলে জগতে যা ঘটার তার প্রায় সবটুকুই ঘটে গিয়েছে মানবজা্তির আগমনের আগে। একারণেই মানব জাতির জ্ঞানভান্ডার এত ক্ষুদ্র। জগৎ-সংসার সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে মানুষ প্রথমে যেটা করতে পারে তা হলো ধারণা। কিন্তু ধারণার সাথে বাস্তবের মিল থাকবে এমন নিশ্চয়তা দেয়া অসম্ভব। বাস্তস সত্যটি কি এটা জানার একমাত্র পথটিই হলো গবেষণা। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল আমকে যাচাই করে দেবে সত্যের সাথে আমাদের ধারণার কতটুকু মিল বা অমিল আছে। একারণেই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বলেছেন, “সকল গবেষণাই হলো মানুষের ধারনার (idea) জগৎ ও প্রতিভাস (phenomena)-এর জগৎের মধ্যকার পার্থক্য (gap) কমিয়ে আনা।

মানবজীবনে গবেষণার গুরুত্ব:
মানবজীবনে গবেষণার গুরুত্ব কি বলার আগে আসুন আলোচনা করি মানব জীবনের উদ্দেশ্য কি? এই নিয়ে অনাদিকাল থেকেই দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা আলোচনা করে গেছেন ও যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে গেছেন। জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সেই মহাসাগর সেঁচে যে দুটো মুক্তা তুলে আনা যায় তা হলো ১। মানবজীবনের দৈনন্দিন জীবনের আরাম-আয়েশগুলো বৃদ্ধি করা (অন্যকথায় মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করা), ২। সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন করা (জীবনের অর্থ খুঁজে বের করা)। এই মহান দুটি কর্তব্য সাধনে গবেষণার কোন বিকল্প নেই।

মনে করি কোন একটি এলাকায় কোন একটি অজানা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারীর আকার ধারণ করে তা বহু মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের করণীয় কি? নিঃসন্দেহে এই ভয়াবহতার হাত থেকে সকলকে উদ্ধার করাই আমাদের কর্তব্য। এটা করতে হলে আমাদের প্রথমে রোগের কারণ খুঁজে বের করতে হবে, তারপর কি করে তা দমন করা যায় সেই উপায় আবিষ্কার করতে হবে। এই সব কিছু গবেষণা করেই করা সম্ভব। এক সময় আহত মানুষের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে তার গায়ে পশুর রক্ত দেয়া হতো, এতে রোগীর মৃত্যু হতো। তারপর মানুষের রক্ত দেয়া শুরু হলো। সেখানে দেখা গেলো কিছু মানুষ বেঁচে যায় আবার কিছু মানুষ মরে যায়। কেন? তবে আশার আলো দেখা গেলো যে কিছু মানুষ বেঁচে যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের শরীরে মানুষের রক্ত দান করে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। এখন প্রয়োজন জানা যারা মারা যাচ্ছে তারা মারা যাচ্ছে কেন? অনেক অনুসন্ধানের পরে মানুষের ব্লাড গ্রুপ সম্পর্কে জানা গেলো । গবেষণার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এই সেদিনও ডায়রিয়ায় গ্রামের পর গ্রাম নিস্চিহ্ন হয়ে যেত। কিন্তু বাঙালী ডাক্তারদের অক্লান্ত সাধনা গবেষনার ফলে আবিষ্কৃত ওরস্যালাইনের কল্যাণে আজ ডায়রিয়া জীবনবিনাশী কোন অসুখই নয়।

যেমন আমাদের রয়েছে বিদেশ নির্ভরতা ও স্বদেশ বিপর্যয়। কেন এই নির্ভরতা ও বিপর্যয়? পাশাপাশি এ’ থেকে উত্তরণের পথ কি? এইগুলো বুঝতে হলে ও উত্তরণ পেতে হলে প্রয়োজন যথাযথ গবেষণার। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরেও আমরা বাংলাদেশীরা উন্নয়নের মুখ দেখতে পাচ্ছি না। অগ্রগতির ধারা অত্যন্ত শ্লথ। কেন? এটা বুঝতে হলেও প্রয়োজন গবেষনার। আবার অনেকে এর জন্য জাতীয় রাজনীতিকেই দায়ী করে থাকেন। সেক্ষেত্রে গতানুগতিক রাজনীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কি করে যুগপোযোগী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায় সেটা আবিষ্কার করতে হলেও প্রয়োজন গবেষণার। এককথায় যেকোন সমস্যা formulate (সূত্রাকারে বা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা) করা, তার সমাধান খুঁজে বের করা ও তা প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা এই পুরো পদ্ধতিটিই গবেষণা। গবেষণা ছাড়া উদ্ভুত যে কোন সমস্যা বোঝা যেমন সম্ভব না তেমনি তা সমাধান করাও সম্ভব না।

কি নিয়ে আলোচনা করে গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রঃ
যে শাস্ত্র পাঠ করলে গবেষণা ও গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায় তাকেই গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র বলে। গবেষণা যথেচ্ছভাবে করা যায়না, একটি নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মনে তা করতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি, চা তৈরী করতে গেলে চা পাতা, চিনি, পানি, কেতলি ও চুলা লাগে এটা আমরা জানি। এখন যদি আমরা চুলায় প্রথমে কেতলি রাখি, তারপর তা উত্তপ্ত হওয়ার পর সেখানে চায়ের পাতা ফেলি, তা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর চিনি দেই, চিনি গলে কটকটি হয়ে যাওয়ার পর সেখানে পানি ঢালি, তবে ঐ চা খাওয়ার যোগ্য হবে না। চা তৈরীর যথানিয়মে প্রথমে চুলায় কেতলি, তারপর পানি, পানি ফোটার পর চা পাতা ও চিনি দিয়ে প্রস্তুত করলেই পরিবেশনযোগ্য চা তৈরী হবে। অনুরূপভাবে যথানিয়মে গবেষণা করলেই গবেষণার ফলাফল পাওয়া যাবে ও প্রাপ্ত ফল মানবজাতির জন্য উপকারী হবে।

ছাত্র-ছাত্রীরা কেন গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়ন করবে?
ছাত্র-ছাত্রীরা কেন গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়ন করবে? – বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এমন প্রশ্ন দেখা দেয়না, কারণ স্কুল জীবন থেকেই গবেষণাগার দেখে তারা অভ্যস্ত। বিজ্ঞান ও গবেষণা এই দুটি শব্দ অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত এই ধারণা তাদের মধ্যে বদ্ধমূল। কিন্তু বাংলাদেশের মত দরিদ্র ও পশ্চাদপদ দেশে অ-বিজ্ঞান ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এমন প্রশ্ন ব্যপকভাবে প্রচলিত। তাদেরকে বলতে চাই সমস্যা নাই বা অজানা নাই এমন কোন জ্ঞানের শাখা আমাদের জগৎে নাই। সমস্যা থাকলেই তা সনাক্ত করা, তার কারণ ও সমাধান খুঁজে বের করা জরুরী, অন্যথায় সেই শাখার উন্নয়ন থমকে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানের (বিজ্ঞান,অ-বিজ্ঞানযে কোন জ্ঞান) সর্বচ্চো বিদ্যাপিঠ, এর মূল উদ্দেশ্য দুইটি ১। জ্ঞান দান করা, ২। নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। এই নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন গবেষণা। ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্র-ছাত্রীদের বলবো, অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে ব্যবসায় বিনিয়োগ করা সম্পুর্নই নির্বুদ্ধিতা। “উত্তম ব্যবসার সূত্রপাতই হয় উত্তম গবেষণার মধ্যে দিয়ে।” একারণেই গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়ন করা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়নের পূর্বশর্তঃ
গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়নের আগে কয়েকটি বিষয়ে দখল থাকা জরুরী ১। দর্শন, ২। গণিত, ৩। পরিসংখ্যান, ৪। বিজ্ঞান ৫। ভাষাজ্ঞান

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞান:
বাংলা দর্শন শব্দটির ইংরেজী অনুবাদ Philosophy। ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে এই শব্দটিই প্রচলিত আছে। দর্শন (philosophy) জ্ঞানের অন্যতম প্রাচীন একটি শাখা। ফিলোসফি শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেছিলেন গ্রিক চিন্তাবিদ ও গণিতজ্ঞ পিথাগোরাস। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দের দিকে শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। পিথাগোরাস নিজেকে প্রাজ্ঞ ভাবতেন না, বরং প্রজ্ঞার অনুরাগী ভাবতেন। তিনিই ফিলোসফি শব্দটি ব্যবহার করেন love ফোর wisdom তথা প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ অর্থে। দর্শনের সংজ্ঞা হিসেবে এই বিষয়টিকেই গ্রহণ করা যায়। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে দর্শন প্রজ্ঞার এমন একটি ধারা যা, মানুষের কিভাবে জীবন নির্বাহ করা উচিত (নীতিবিদ্যা); কোন ধরনের বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে এবং তাদের প্রকৃতি কি (অধিবিদ্যা); প্রকৃত জ্ঞান বলতে কোন জিনিসটিকে বোঝায় এবং কারণ প্রদর্শনের সঠিক নীতিগুলো কি কি (যুক্তিবিদ্যা); এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে।[২]

দর্শন শব্দটির ইংরেজি অনুবাদ philosophy । ফিলোসফি শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে। গ্রিক ভাষায় φιλοσοφία (philosophía) শব্দটি দুটি শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। শব্দ দুটি হল: φίλο (ফিলো: অনুরাগ, ভালোবাসা ) এবং σοφία (সোফিয়া: প্রজ্ঞা)। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, দর্শনের সাথে মূল সম্পর্ক হচ্ছে প্রজ্ঞার, আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসার। জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়। ঘটনা ও তথ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ও নির্ভুল ধারণা থেকে জ্ঞান লাভ করা যায়, কিন্তু দার্শনিক (যিনি দর্শন চর্চা করেন তাকেই দার্শনিক বলা হয়) কেবল তথ্যগত জ্ঞানের উপর নির্ভর করেন না। দর্শনের প্রধান কাম্য বিষয় প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার অনুসন্ধান ও চর্চার মাধ্যমেই দর্শন বিকাশ লাভ করে। পিথাগোরাস সারা জীবন প্রজ্ঞার সাধনা করেছেন, কখনও জ্ঞানের গরিমা অনুভব করেননি। এজন্য তিনি দার্শনিক হিসেবে বিদগ্ধ। দর্শনের জন্য যে প্রজ্ঞা কাম্য তার মধ্যে রয়েছে, অন্তর্দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গির অভ্রান্ততা, বিচারের ভারসাম্য ও বিশ্লেষণের সামঞ্জস্য।

বিজ্ঞান (ইংরেজি: Science) হচ্ছে বিশ্বের যাবতীয় ভৌত বিষয়াবলী পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, যাচাই, নিয়মসিদ্ধ, বিধিবদ্ধ ও গবেষণালদ্ধ পদ্ধতি যা জ্ঞানকে তৈরিপূর্বক সুসংগঠিত করার কেন্দ্রস্থল। ল্যাটিন শব্দ সায়েনটিয়া থেকে ইংরেজি সায়েন্স শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ বিশেষ জ্ঞান। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফলে কোন বিষয়ে প্রাপ্ত ব্যাপক ও বিশেষ জ্ঞানের সাথে জড়িত ব্যক্তি বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিদ কিংবা বৈজ্ঞানিক নামে পরিচিত হয়ে থাকেন।
সকল বিজ্ঞানই জ্ঞান কিন্তু সকল জ্ঞানই বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান হলো বিশেষ জ্ঞান, বিশেষত্বটি কোথায়? বিজ্ঞানের জ্ঞানটি হলো সেই জ্ঞান যা ‘মেথড অব ইনভেস্টিগেশন’ নামক একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অর্জিত। তথা জ্ঞানটি পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত। বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া কোন কিছু গ্রহন করেনা।

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রে একদিকে যেমন রয়েছে প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ রেখে গভীর দৃষ্টিকোন থেকে গবেষণার টপিকটি বোঝা, জানা ও অপরকে জানানো। আবার রয়েছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যখ্যা বিশ্লেষণ পূর্বক প্রমাণ সহ তা উপস্থাপন করা। এই হিসাবে গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞান।

গবেষণায় দর্শনের গুরুত্বঃ
পূর্বেই বলেছিগবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রে রয়েছে প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ রেখে গভীর দৃষ্টিকোন থেকে গবেষণার টপিকটি বোঝা, জানা ও অপরকে জানানো। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই গবেষণা উত্তর প্রাপ্ত একটি বড় ডিগ্রীর নাম PhD বা Doctor of Philosophy । অর্থাৎ সেখানে গবেষক উল্লেখ করছেন What is his philosophy।

গবেষণায় বিজ্ঞানের গুরুত্বঃ
পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লদ্ধ সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান। প্রাচীনকালে বিজ্ঞানে পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণের বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে ছিলোনা। এটি প্রবর্তনের পুরো কৃতিত্বই মুসলিম বিজ্ঞানীদের। Islamic Golden Age -এ এটা প্রবর্তিত হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন আল হাইয়াম (Al Hazen), আল বিরুনী, ইবনে সিনা, ওমর খৈয়ামের মত পলিম্যাথরা। মুসলিম বিজ্ঞানীদের পথ অনুসরণ করে ষোড়শ শতাব্দিতে ইউরোপে একটি মেথড চালু করেন Galileo Gallelei। এই মেথডের নাম Method of Investigation। মেথডটি নিম্নরূপ ১। পর্যবেক্ষণ (observation), ২। বৈজ্ঞানিক অনুমান (hypothesis), ৩। আইন/তত্ত্ব (law/theory), ৪। যাচাই (verification) ।
অর্থাৎ কোন একটি প্রাকৃতিক প্রতিভাস (Natural Phenomenon) প্রথমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। উদাহরণ স্বরূপ নিলাম যে একটি হাতে ধরা পেন্সিল ছেড়ে দিলাম, আমি পর্যবেক্ষণ করলাম যে পেন্সিলটি নিচে পড়ে যায়। এখন মনে প্রশ্ন জাগলো যে, কেন পেন্সিলটি পড়ে গেল। এরপর আসে বৈজ্ঞানিক অনুমান (hypothesis), আমি মনে মনে একটি ব্যখ্যা অনুমান করলাম যে, পেন্সিলটি যেহেতু উপরে গেলনা, বা সামনে পিছনে ডানে বায়ে কোনদিকেই গেলনা, গেলো কেবল নিচের দিকে তাহলে পতনের কারণটি নিচেই কোথাও আছে। এর পরবর্তি ধাপ আইন/তত্ত্ব, সেই অনুযায়ী গবেষক তত্ত্ব তৈরী করতে পারে যে, নিচের পৃথিবী যে কোন অবজেক্টকে তার দিকে টানে। অনুরূপ একটি আইনও তৈরী করা যেতে পারে (স্যার আইজাক নিউটন ও রবার্ট হুক মহাকর্ষ আইন নামে এই আইন অনেক আগেই প্রতিষ্ঠা করেছেন)। ব্যাস অনেক সাবজেক্টই এই তৃতীয় ধাপটিতে এসে থেমে যায়। কিন্তু বিজ্ঞান এখানে থেমে থাকেনা। চতুর্থ অর্থাৎ যাচাই (verification) ধাপটিও বিজ্ঞানের জন্য বাধ্যতামূলক। আইনটি/তত্ত্বটি পরীক্ষার দ্বারা ১০০% প্রমাণিত হতে হবে। যদি তা না হয় তবে তাকে বিজ্ঞান বলা যাবেনা, আর যদি প্রমাণিত হয় তখন সেই জ্ঞানটি বিজ্ঞান। এবার বিজ্ঞান হিসাবে তার প্রচার-প্রসার করা যাবে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।

গবেষণায় গণিতের গুরুত্বঃ
রাশিয়ার সাথে মহাকাশযুদ্ধে একের পর এক পরাজয়ের পর আমেরিকার বিজ্ঞানে ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশাল পরিবর্তন আসলো। এ প্রসঙ্গে চমস্কি বলেছেনঃ
“এই বিশাল পরিবর্তন ঘটলো অনেকটা ১৯৬০ সালের দিকে দেশে বিজ্ঞান ও গণিতে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে। স্পুটনিক স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষায় বেশ পরিমাণ সম্পৃক্ততার সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এম, আই, টি-তে এমন সব ছাত্র আসতে শুরু করলো যারা অনেক বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এই সময়েই এম, আই, টি-তে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। চিরায়ত প্রকৌশল শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয় শুরু হয়ে গেলো। যে প্রকৌশল বিভাগগুলো পিছনে পড়ে ছিলো তারা সাধারণত বিজ্ঞানশিক্ষাসূচীকে হুবুহু নকল করা শুরু করলো। সুতরাং বিদ্যুৎ প্রকৌশল বিভাগে আপনি কিভাবে বিদ্যুৎবর্তনী একত্র করতে হয় তা আর শিখবেন না, আপনি শিখবেন প্রয়োজনীয় পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিত যা পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিত বিভাগে শিখানো হয় তার থেকে খুব আলাদা নয়। একই কথা সত্য বিমান চালনা ও যন্ত্রকৌশল সম্পর্কেও। এটা তাই একটা বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেলো, প্রকৌশলভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় আর নয়।”

গণিত নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান তবে গণিতের জন্ম প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের জন্মের অনেক আগে। এই কারণে গণিতকে অনেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান বলে। ঐ দৃষ্টিকোণে গণিত হল আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান আর প্রাকৃতিক বিজ্ঞান হল পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞান। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে গণিতের মিল-অমিল উভয়ই রয়েছে। গণিত একদিক থেকে পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, উভয়টিই একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পদ্ধতিগত অধ্যয়ন করে। আর পার্থক্য হচ্ছে, পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানে পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করা হলেও গণিতে কোন কিছু প্রতিপাদন করা হয় আগের একটি সূত্রের (প্রায়োরি) উপর নির্ভর করে। এই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান, যার মধ্যে পরিসংখ্যান এবং যুক্তিবিদ্যাও পড়ে, অনেক সময়ই পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানে উন্নতি করতে হলে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানের প্রসার আবশ্যক। কিভাবে কোন কিছু কাজ করে (প্রাকৃতিক বিজ্ঞান) তা বুঝতে হলে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানের কাছে হাত পাতা ছাড়া উপায় নেই। ব্যবসা সংক্রান্ত গবেষণায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে () গণিতের কোন বিকল্প নেই। এ কারণে গবেষণায় গণিতের গুরুত্ব অপরিসীম।

বিজ্ঞান একটি প্রস্তাবিত মডেল নিয়ে কাজ করে। এই মডেলটি হতে পারে সিমুলেশন, গাণিতিক বা রাসায়নিক সূত্র । বিজ্ঞান এবং গণিত উভয়েই মডেল, অভ্যন্তরীণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং falsifiable (disproof করতে সক্ষম) হতে হবে । গণিতে, একটি বিবৃতি () প্রমাণিত নাও হতে পারে, সেই পর্যায়ে তাকে বলা হয় অনুমান (); কিন্ত যখনই বিবৃতিটি প্রমাণিত হবে তখনই তা অমরত্ব পাবে। কিছু কিছু গণিতবিদ এই কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন।

গাণিতিক কাজ এবং বৈজ্ঞানিক কাজ একে অপরকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সময়ের প্রযুক্তিগত ধারণা বিজ্ঞানে উদ্ভুত হয়েছিলো, এবং সময়হীনতা (timelessness) ছিলএকটি গাণিতিক বিষয়। কিন্তু আজ, Poincaré conjecture প্রমাণিত হয়েছে সময়কে গাণিতিক ধারণা হিসাবে ব্যবহার করে।
গাণিতিক পদ্ধতি ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান পদ্ধতি দ্বয়ের মধ্যে মিল-অমিল নিচের টেবিলে দেখানো হলো।
Mathematical method
১। বোঝা (Understanding)
২। বিশ্লেষণ (Analysis)
৩। সংশ্লেষ (Synthesis)
৪। (পর্যালোচনা / প্রসারিত করা)
Review/Extend

Scientific method
১। অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে চরিত্রায়ন (Characterization from experience and observation)
২। হাইপোথিসিস: প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা (Hypothesis: a proposed explanation)
৩। সিদ্ধান্তগ্রহণ: হাইপোথিসিস থেকে ভবিষ্যদ্বাণী (Deduction: prediction from the hypothesis)
৪। টেস্ট এবং পরীক্ষা (Test and experiment)

গবেষণায় পরিসংখ্যানের গুরুত্বঃ
পরিসংখ্যান হলো সেই বিজ্ঞান যে অনিশ্চয়তার জগৎে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। আমরা বসবাসই করি মোটামুটিভাবে অনিশ্চয়তার জগৎে। আর ভবিষ্যৎ পুরোটাই অনিশ্চিত। অথচ নিয়তি এমনই যে আমরা প্রতিনিয়ত ভবিষ্যৎের দিকেই এগিয়ে চলছি। তাই এই যেকোন গবেষণার ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিসংখ্যানের কোন বিকল্প নেই।

উপাত্ত সংগ্রহ, তার বিন্যাস ও উপস্থাপন ছাড়া গবেষণা করা সম্ভব না। আবার যেকোন হাইপোথিসিস তৈরি করে তা আবার টেস্ট করাও প্রয়োজন। এ’সবই পরিসংখ্যান। তদুপরি গবেষণার একটি শর্ত হলো বর্ণনা। বর্ণনা কোন একটি বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে সাহায্য করে। এই বর্ণনার ক্ষেত্রে বর্ণনামূলক পরিসংখ্যান (Descriptive Statistics) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রের ইতিহাসঃ
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য। প্রাচীন মিশরীয় নথি ঘেটে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্রে প্রায়োগিক পদ্ধতির ব্যব হারের বর্ণনা পাওয়া যায়। খ্রীষ্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীর , ব্যবিলনের রাজা Nebuchadnezzar একটি ইহুদি বন্দী ছিলো ড্যানিয়েল নামে। তিনি একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিলেন, যেখানে ছিলো হাইপোথিসিস , একটি নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ (control group), একটি প্রয়োগ দল (treatment group), এবং একটি উপসংহার। পরীক্ষা শেষে ড্যানিয়েল এর অনুমান সত্য প্রমাণিত হয়।

খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক থালেস (thales)প্রাকৃতিক ঘটনাবলি ( natural phenomena)র ব্যাখ্যায় অতিপ্রাকৃত ধর্মীয় বা পৌরাণিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। দার্শনিক প্লেটো কর্তৃক বিকশিত deductive reasoning ছিলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (scientific method) প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যতদূর জানা যায় অভিজ্ঞতালদ্ধতা (Empiricism) অ্যারিস্টট্ল দ্বারা প্রাথমিকভাবে বিধিবদ্ধ হয়েছে। অ্যারিস্টট্ল বিশ্বাস করতেন যে, ধ্রুব সত্য (universal truth) কেবল মাত্র induction-এর মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। তবে সত্যিকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বিকাশের ক্ষেত্রে অ্যারিস্টট্লকে কৃতিত্ব দেয়া যাবেনা। উনার লিখিত “On the Heavens” এবং “Physics”-এ সংশোধনযোগ্য ত্রুটি ছিলো।

গাণিতিক গবেষণায় ভারত উপমহাদেশের আর্যভট্ট, বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাষ্কর ও শ্রীধরের নাম উল্লেখযোগ্য।

৬১০ খ্রীষ্টাব্দে নবীজি (সঃ)-র নবুওত প্রাপ্তির সাথে সাথে শুরু হয় ইসলামের স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age)। ইসলামিক ডক্ট্রাইনে প্রভাবিত ও উৎসাহিত হয়ে মুসলমানরা শুরু করে নতুন ধারার জ্ঞান চর্চা। সারা পৃথিবীর জ্ঞান সংগ্রহ করে তারা তা বিকশিত করতে শুরু করে। খ্যাতিমান মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী আল হাইয়াম (Alhazen) আলোকবিজ্ঞান ও শরীরবিজ্ঞান নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। আলোকবিজ্ঞান সংক্রান্ত তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম অপটিক্স (Optics ), যা ১০২১ সালে রচিত। এইভাবে তিনিই হয়ে ওঠেন বৈজ্ঞানিক মেথড (scientific method)-এর পথপ্রদর্শক। তিনি বুঝতে পারেন যে পরীক্ষা এবং পরিমাপের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের প্রয়োজন আছে, যা একটি উচ্চমান সম্পন্ন উপসংহারে পৌছাতে সাহায্য করবে। কোন তত্ত্বকে পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণে (empirically)-র বিষয়টি মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রথম চালু করেন। এর ফলে অতীতের অনেক তত্ত্বই বাতিল হয়ে যায়। একই যুগের অন্যান্য মুসলিম polymathগণ গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও রসায়ন ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো আল বিরুণী, আল খাওয়ারিজিমী, ওমর খৈয়াম, আল কিন্দি, ইবনে সিনা, তকি আল দ্বীন, ইবনে সাহিল, আল তুসি, প্রমূখ।

এর আরও কয়েক শতাব্দী পরে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইউরোপের রজার বেকন, রেঁনে দেকার্ত, গ্যালিলিও, ও ফ্রান্সিস বেকনের নাম উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞান ও গবেষণায় নব্যযুগের সূচনা হয় স্যার আইজাক নিউটনের পদার্থবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

গবেষকের মূল্যায়নঃ
শিক্ষকদের অবহেলা করে যেমন শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়, তেমনি গবেষকের মূল্যায়ন না করে গবেষণা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে যে, যথেষ্ট মেধা ছাড়া গবেষণা করা অসম্ভব। যে দেশ বা প্রতিষ্ঠান গবেষণা করতে চাইবে তাকে পর্যাপ্ত নজর দিতে হবে গবেষকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করনে। কেবলমাত্র তখনই মেধাবীরা এই পেশায় আসতে উৎসাহী হবে। পাশাপাশি একজন গবেষককে আরও যা দিতে হবে, তা হলো

১। গবেষকের অবাধ স্বাধীনতা, ২। সতীর্থ বিজ্ঞানীদের সাথে নিবীড় সম্পর্ক (cross-functional team work), ৩। বিজ্ঞান শিক্ষা ও গণিত শিক্ষার গভীর সম্পৃক্ততা (the power of mathematics and natural science).

উল্লেখ্য যে, উন্নত সবগুলো দেশই তার নিজ দেশ তো বটেই উপরন্তু পৃথিবীর সব দেশ থেকেই মেধাবী গবেষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের দেশে টেনে আনে।

বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশে গবেষণাঃ
একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেই যে নিজের লিমিটেশন বোঝে।’ অনুরূপভাবে বলবো বুদ্ধিমান দেশ সেই যে গবেষণার গুরুত্ব বোঝে। উন্নত যেকোন দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে যখনই দেশটি গবেষণায় ব্যাপক মনযোগ দিয়েছে তখনই ঐ দেশটি তরতর করে উপরে উঠে গিয়েছে। উন্নত সবগুলো দেশই গবেষণা ও গবেষকের যথাযথ মূল্যায়ন করে থাকে। গএকথা সত্য যে এক্ষেত্রে কোন কোন দেশ ফলিত গবেষণায় (applied research) অধিক গুরুত্ব দেয়, কোন কোন দেশ মৌলিক গবেষণায় (basic research) অধিক গুরুত্ব দেয়, আবার কোন কোন দেশ যে কোন প্রকার গবেষণাকেই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে (যেমন রাশিয়া, জার্মানী, জাপান)। গবেষণায় যে সকল রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যায় করে থাকে এমন টপ টেন রাষ্ট্রের তালিকা নিচে দেয়া হলো।

(Expenditure in billion USD)
1 United States 405.3 2.7% 2011 [2]
2 China 296.8 1.97% 2012 [3]
3 Japan 160.3 3.67% 2011 [4]
4 Germany 69.5 2.3% 2011 [2]
5 South Korea 55.8 3.74% 2011 [4]
6 France 42.2 1.9% 2011 [2]
7 United Kingdom 38.4 1.7% 2011 [2]
8 India 36.1 0.9% 2011 [2]
9 Canada 24.3 1.8% 2011 [2] 1
0 Russia 23.8n1 1.0% 2011

এমন ৭২টি দেশের তালিকায় ভারত ও পাকিস্তানের নাম থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই।

উপসংহারঃ
উপসংহারে বলবো যে, গবেষণার উদ্দেশ্য প্রকৃত সত্য উদঘাটন। সেই গবেষণা সব সময়ই হতে হবে উচ্চমান সম্পন্ন ও উপকারী। একটি সার্থক গবেষণা কেবলমাত্র তখনই সম্ভব যখন গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকবে। গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রই এই পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান দিতে সক্ষম।

৮,৪০২ বার দেখা হয়েছে

১৩ টি মন্তব্য : “গবেষণা পদ্ধতি শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা”

    • ড. রমিত আজাদ (৮২-৮৮)

      আমিও সন্ধি বিচ্ছেদ পড়েছিলাম, গবেষণা = গো + এষণা। তখনই সন্দেহ হয়েছিলো। প্রশ্ন করে সদুত্তর পাইনি। কয়েক বছর আগে আমাদের ক্যডেট কলেজের এক শিক্ষককে প্রশ্ন করে গবেষণা = গবেষ + অণ + আ এটা পেয়েছি। সম্ভবত হরিচরণ অভিধানে এটা আছে। এখন তোমার কাছ থেকে আরো একটা সন্ধি বিচ্ছেদ 'গবেষ' = search for আর 'এষণা' = desire পেলাম নূপুর। অনেক ধন্যবাদ।

      জবাব দিন
    • পন্ডিত মাঠে গরু চড়াতে গেলে ছাত্ররা তার কাছে শিক্ষা নিতো।সন্ধায় গরু হারিয়ে গেলে ছাত্ররা অন্বেষনে বের হত।পন্ডিত বলতেন ভেবে দেখ কোথায় আছে,পুনঃপুনঃ,খুজে আনতেই হবে,যত কস্ট হোক।ছাত্রদের দ্বারা শ্রদ্ধেয় সুপারভাইজার যেভাবে।গবেষণাতো গো অন্বেষণ ই।গবেষনা হলো গো+এষনা।

      জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য