মুসলিম ইন আমেরিকা-৪ঃ স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডি

মুসলিম ইন আমেরিকা-১
মুসলিম ইন আমেরিকা-২
মুসলিম ইন আমেরিকা-৩

“America was built by the Immigrants”-আমেরিকাতে এই উক্তিটি বহুল আলোচিত এবং সর্বজনবিদিত। আমেরিকাকে গড়ার ক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব অভিবাসীদেরই কম-বেশি অবদান রয়েছে। নতুন অভিবাসী হিসেবে এখানে যারাই এসেছে, তাদের সবাইকেই এখানে প্রথম প্রথম একটি সংকটময় সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। ১৬০০ এবং ১৭০০ শতকের দিকে যারা এখানে আসে, তাদের জন্য প্রধান সংকটসমূহ ছিলঃ জাতিগত দাঙ্গা, অভাব, অজানা ভূমি, রোগ-বালাই ইত্যাদি। ১৯০০ শতকের পরে এখানে যারা আসে, তাদের জন্য অন্যতম প্রধান সমস্যা হলঃ জাতিগত/বর্ণগত বৈষম্য (racial discrimination) এবং stereotyping, এবং ৯/১১ এর পরবর্তী সময়ে আমেরিকান মুসলিমদেরকে এই সমস্যা দুটিকে সবথেকে প্রকটভাবে ফেইস করতে হয়েছে। যদিও আমেরিকাতে বসবাসকারী বেশিরভাগ মুসলিমই শান্তিপ্রিয় এবং দায়িত্ববান, তথাপি মুসলিম নামধারী কোনো লোক কোথাও একটি অঘটন ঘটালে তার রেশ ধরে আমেরিকার বেশিরভাগ মুসলমানকে সেই অঘটনের জন্য দায়ী করার একটি প্রবনতা র‌য়েছে অনেক আমেরিকানদের মধ্যে…অবশ্য আমি তাদেরকে খুব একটা দোষারোপ করব না এই জ়ন্য যে, ব্যক্তিগত ভাবে আমি যদি নন-মুসলিম হতাম এবং মুসলিমদের ব্যপারে যদি আমার একমাত্র জ্ঞানের উৎস হত FOX news আর CNN, তবে আমার দৃষ্টিভঙ্গিও হয়ত তাদের মতই হত…

আমেরিকানদের মন থেকে এই মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব দূরিকরনের একটি প্রধান উপায় হলঃ পারস্পরিক সচেতনতা বৃ্দ্বি, আর এই লক্ষ্যটি অর্জনের জন্য একদল আমেরিকান মুসলিম বেছে নিয়েছে স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডিকে। বৈষম্য দূর করতে স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডির ব্যবহার এই প্রথম নয়। আমেরিকাতে আগত আগের অনেক অভিবাসী জনগষ্ঠীই একে ব্যবহার করে এসেছে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকে দূর করতে। একজন স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডিয়ানের এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হল মানুষকে হাসানো, আর মানুষ যখন হাসে তখন তাদের মনের দরজা উন্মুক্ত হয় বেশি, আর এমতাবস্থায় তাদের কাছে একটি পজিটিভ মেসেজ কনভে করা সহজতর হয়। তো আর কথা না বাড়িয়ে আমেরিকার কয়েকটি স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডি দলের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেইঃ

আল্লাহ মেইড মি ফানিঃ

তিন সদস্যের এই গ্রুপটি ইতিমধ্যে কমেডি দুনিয়াতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, এবং আমেরিকার বিভিন্ন বড় বড় শহর ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্যুর করেছে। এই গ্রুপটির মূলত কমেডির মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকে আমেরিকান মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন, আমেরিকার পোষ্ট ৯/১১ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী ইত্যাদি। এই গ্রুপটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট হলঃ বাচ্চা-বুড়ো সবাই তাদের কমেডি উপভোগ করতে পারে…কারন তাদের কমেডিতে অশ্লিল শব্দের (F-words) ব্যবহার নেই-যা কিনা অন্যান্য স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডিয়ানদের ক্ষেত্রে একটি অতি সাধারন ব্যাপার। এই গ্রুপটির প্রধান দুটি কমেডি ট্যুর এর ট্রেইলার দেখতে পারেন এইখানেঃ এবং
আল্লাহ মেইড মি ফানি এর একটি পূর্নাংগ শো দেখতে পারবেন এইখানে
এই গ্রুপটির তিনজন সদস্য হলেনঃ
আজহার উসমানঃ (ইউটিউব লিঙ্কঃ , )ইন্ডিয়ান বংশদ্ভুত আজহার উসমানের ল-এর উপর ডিগ্রী থাকলেও বর্তমানে স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডিই তার ফুল টাইম পেশা। কমেডিয়ান হিসেবে তার লক্ষ্যঃ “হাস্যরসের মাধ্যমে শান্তির আগমন (waging peace through humor)”. আল্লাহ মেইড মি ফানি ছাড়াও তার উল্লেখযোগ্য অন্যান্য প্রযেক্টগুলো হলঃ যিউইশ রেবাই বব আল্পারে সাথে “One Muslim. One Jew. One stage. Two very funny guy” এবং রাজিব সাত্তায়ালের সাথে “Make chai, Not war.”

প্রিচার মসঃ (ইউটিউব লিঙ্কঃ , )
আফ্রিকান-আমেরিকান বংশদ্ভুত প্রিচার মস হলেন একজন কনভার্ট মুসলিম এবং আল্লাহ মেইড মি ফানির প্রধান উদ্যোক্তা। এই শো ছাড়াও তিনি আরো তিনটি জনপ্রিয় টিভি প্রোগ্রামের লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেগুলো হলঃ সেটারডে নাইট লাইভ, জর্জ লপেজ শো, ইন লিভিং কালার-মাই ওয়াইফ এন্ড কিডস। সমসাময়িক কালের সমাজের গুরুত্বপূর্ন ইস্যুগলো হাস্যরসের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা তার কমেডির অন্যতম স্টাইল। কমেডি ছাড়াও তিনি মানুষিক বিকারগ্রস্থদের স্কুলে শিক্ষক হিসেবে আট বছর দায়িত্ব পালন করেছেন।

মো আমেরঃ(ইউটিউব লিঙ্কঃ , ) উনিভার্সিটি স্টুডেন্টদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় মো আমের প্যালেস্টাইনের বংশদ্ভুত হলেও তার জন্ম কুয়েতে। পারস্য গালফ ওয়ারের সময় তিনি তার পরিবারের সাথে রেফিউজি হিসেবে আসেন টেক্সাসে। ২০০৪ সালে সারা আমেরিকা থেকে বাছাইকৃত ১২ জন কমেডিয়ানের মধ্যে তিনি একজন যাদের লাস ভেগাস কমেডি ফেস্টিভেলে পারফর্ম করার সুযোগ হয়। আমেরিকা ছাড়াও তিনি পারফর্ম করেছেন ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং সাইথ আফ্রিকাতে।

দি মুসলিম ফানিমেন্টালিস্ট

এই কমেডি গ্রুপটি তুলনামুলকভাবে নতুন হলেও, এই গ্রুপের তিনজন সদস্যের কেউই কমেডি দুনিয়াতে নতুন নন। এই গ্রুপটির অন্যতম বৈশিষ্ট হল, এদের কমডিগুলোতে দর্শকরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে। আল্লাহ মেইড মি ফানির মত এদের শোতেও অশ্লিল শব্দের (F-words) ব্যবহার নেই এবং বাচ্চা-বুড়ো সবাই তাদের কমেডি উপভোগ করতে পারে। এদের ট্যুরের একটি ট্রেইলর দেখতে পারে এইখান

এই গ্রুপের তিনজন সদস্য হলেনঃ
আমান আলীঃ (ইউটিউব ভিডিও লিঙ্কঃ ,, ) ইন্ডিয়ান বংশদ্ভুত আমান আলী সাধারনত নিউ-ইয়র্কের বিভিন্ন কমেডি ক্লাব এবং কলেজ ক্যাম্পাসগুলোতে পারফরম করে থাকেন। বর্তমানে কমেডি তার পেশা হলেও, তিনি জার্নালিজম এর উপর পড়াশোনা করেছেন, এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে ক্যাপিটল হিলের রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছেন।

আসিফ আলীঃ শিকাগোর বাসিন্দা আসিফ আলী আমেরিকার নামকরা কমেডি ক্লাবগুলোতে পারফরম করে থাকেন। কমেডিয়ান হিসেবে তার অন্যান্য সাফল্যগুলো হলঃ ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়ে কমেডি ফেস্টিভেলে ১ম স্থান এবং এইচবিও এর “লাকি-২১” কমেডি কম্পিটিশনের ফাইনালিস্ট।

বাবা আলিঃ দি মুসলিম ফানিমেন্টালিস্ট গ্রুপের সবথেকে জনপ্রিয় কমেডিয়ান হলেন বাবা আলী। তিনি মূলত তার জনপ্রিয়তা পেয়েছেন ইউটিউব ভিডিও ব্লগিং এর মাধ্যমে। তার ইউটিউব চ্যানেলের নাম উম্মাহ ফিল্মস (পৃথক ওয়েবসাইট)। পশ্চিমা বিশ্বের মানুষদের মন থেকে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারনার অবসান এবং এইখানকার মুসলিম সম্প্রদায়কে ইসলামী জীবনযাপনে উব্দুদ্ধ করা তার ভিডিও ব্লগিং এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বাবা আলীর ইউটিউব ভিডিও ব্লগ সিরিজগুলো পশ্চিমা বিশ্বের তরুন মুসলিমদের কাছে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। তার ইউটিউব ভিডিও সিরিজ “The Reminder” এর ৫ মিলিয়ন ভিউ কাউন্ট রয়েছে। তার ভিডিও ব্লগ গুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখক “ভিউড” ভিডিওগুলো হলঃ ওয়াই ইসলাম, হু হাইজ্যাকড ইসলাম, মুসলিম ওয়াইল ফ্লাইং, জাস্ট ফ্রেন্ড (মাস্রুফ স্পেশাল!!), রেসিজম এন্ড প্রাইড, হারাম পুলিস। তার কমেডির কাজের জন্য নিউ-ইয়র্ক টাইমস, এল-এ টাইমস, ইউ-এস-এ টুডের মত নামকরা নিউজ এজেন্সির প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বর্তমানে তিনি উম্মাহ ফিল্মের দ্বারা নির্মানকৃত পূর্নদৈর্ঘ্য ছবি “Tomorrow never comes” এর শুটিং এর কাজে ব্যস্ত আছেন।

[ডিস্ক্লেইমারঃ
১। দেশে থেকে যারা স্লো নেট কানেকশন দিয়ে সিসিবিতে ঢুকছেন, তাদের ভিডিওগুলো দেখতে সমস্যা হতে পারে, এইজন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। কারন, ভিডিওগুলো ছাড়া এই ব্লগটি পড়ার আনন্দ কিছুটা হ্রাস পাবে।

২। স্ট্যান্ড আপ কমেডি মূলত একটি দেশ/জাতি/গোষ্টির কালচারকে ঘিরে করা হয়ে থাকে, এবং স্ট্যান্ড আপ কমেডিকে পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে সেই কালচার সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। সুতরাং, আমেরিকান কালচারের সাথে পরিচিত না থাকলে স্ট্যান্ড আপ কমেডির জোক্সগুলো অনেক ক্ষেত্রে রসহীন মনে হতে পারে।]

|

১৮ টি মন্তব্য : “মুসলিম ইন আমেরিকা-৪ঃ স্ট্যান্ড-আপ্ কমেডি”

  1. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    এরকম আরো একটি অসাধারণ স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো দেখেছিলাম প্যালেস্টাইন বংশদ্ভূত ওমর আব্দাল্লাহ, সম্ভবত সৌদি বংশোদ্ভূত আহমাদ আহমাহ এবং এরকম আর দুজন স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানের আমেরিকা টুর ভিডিওতে-যেটা ৯/১১ এর পরপর করা হয়েছিল।গোটা ভিডিওটাই এত মজার যে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে যাবার কথা(ওখানে অবশ্য অশ্লীল জোক এবং এফ শব্দের ব্যবহার কিঞ্চিৎ ছিল)।

    বিমানে বোমা সন্দেহে তরল পদার্থ বহন নিষেধ দেখে ওমর আবদুল্লাহ ওই কমেডিতে বলেছিলেনঃ আচ্ছা, মনে করুন প্লেনে বসে কেউ বোমা বানাবে।সে তার ব্যাগ থেকে তরল পদার্থ,টেস্ট টিউব, বুনসেন বার্নার ইত্যাদি বের করে প্লেন উড়ন্ত অবস্থাতেই বোমা বানানো শুরু করল।এই এত সরঞ্জাম নিয়ে আয়োজন করে কেউ যখন বোমা বানাতে যাবে-আপনার কি মনে হয়না এই ব্যাপারটা তার পাশের যাত্রীর/এয়ারহোস্টেসের চোখে "কিঞ্চিৎ" সন্দেহজনক মনে হবে?

    ভদ্রলোকের বলার ভঙ্গী দেখে হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে উলটে পড়ার মত অবস্থা হয়েছিল।আবিদ ভাই-সম্ভব হলে একটু খোঁজ করে দেখে নিয়েন।

    জবাব দিন
    • শাহেদ_৯৭-০৩

      খাইতে খাইতে নিজের ক্লাসমেটদের নামও খাইয়া ফালাইতেছছ??? শাহেদ আর আবিদ নামের মইধ্যে গোলমাল কেম্নে লাগাইস এইটা তো আমার মাথায় খেলতেছে না...

      axis of evil এর সাথে আমার ভালই পরিচয় আসে...ওদের নিয়ে লিখতে গিয়েও লিখি নাই...কারন...আমার দেখায় তারা তাদের মুস্লিম-আমেরিকান পরিচয় থেকে তাদের আরব-আমেরিকান পরিচয় টাকেই বেশী প্রাধান্য দেয়...(হ্যা...দুইটার মধ্যে পার্থক্য আছে) + তাদের কমেডিতে F-word এর ব্যবহারও তাদের নিয়ে না লেখার একটি কারন...

      জবাব দিন
  2. মাসরুফ (১৯৯৭-২০০৩)

    কমেডি শো টার নাম এ্যাক্সিস অফ ইভিল কমেডি টুর।জর্জ বুশ যাদের এ্যাক্সিস অফ ইভিল বলেছেন-সেই ইরাক,ইরান আর নর্থ কোরিয়ার একজন করে বংশোদ্ভূত আমেরিকান স্ট্যান্ড আপ কমেডিয়ানদের নিয়ে এই শো-টেররিস্ট গ্রুপ এবং তাদের নিয়ে আমেরিকানদের ধারণা,সাধারণ মুসলিমরা কিভাবে এই স্টেরিওটাইপের শিকার হয়-এ সব কিছু নিয়ে মোতামুটি ক্লাসিক পর্যায়ের কমেডি করে এই গ্রুপটি।

    জবাব দিন
  3. ওয়াহিদা নূর আফজা (৮৫-৯১)

    শহিদ পোস্ট খুব ভালো লেগেছে। এই বিষয়টা সবাইকে জানানোর জন্য সেই সাথে উপভোগ করার জন্য লিংকগুলো যোগ করার বিশেষ ধন্যবাদ।


    “We write to taste life twice, in the moment and in retrospect.”
    ― Anaïs Nin

    জবাব দিন
  4. আন্দালিব (৯৬-০২)

    দারুণ পোস্ট। আমি নিজে স্ট্যান্ড-আপ কমেডির খুব বড়ো ভক্ত। আমার নিজের ফেভারিট হলো জর্জ কার্লিন আর রিকি জারভেইস। যদিও রিকি মূলত ব্রিটিশ অভিনেতা, তবে তার অল্প কয়েকটা শো'র প্রত্যেকটাই ভালো লেগেছে!

    এই কমেডিয়ানদের মাঝে কারোর সাথেই তেমন পরিচয় ছিলো না। ধীরে ধীরে নামিয়ে দেখবো ভিডিওগুলো। অনেক ধন্যবাদ, শাহেদ! :clap:

    জবাব দিন

মন্তব্য করুন

দয়া করে বাংলায় মন্তব্য করুন। ইংরেজীতে প্রদানকৃত মন্তব্য প্রকাশ অথবা প্রদর্শনের নিশ্চয়তা আপনাকে দেয়া হচ্ছেনা।

:) :( :P :D :)) :(( =)) :clap: ;) B-) :-? :grr: :boss: :shy: x-( more »

ফেসবুক মন্তব্য